লেইপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার পেছনে রাশিয়া, বলছে জার্মানি

পাঁচই অগাস্ট লেইপজিগ বিমানবন্দরে বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করার রোবট নিয়ে পুলিশের তদন্তকারী।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পাঁচই অগাস্ট লেইপজিগ বিমানবন্দরে বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করার রোবট নিয়ে পুলিশের তদন্তকারীরা
    • Author, জেমস গ্রেগরি
    • Author, জেসিকা পার্কার
    • Role, বার্লিন সংবাদদাতা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

জার্মানির দাবি, গত মাসে লেইপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার পেছনে রাশিয়া ছিল।

চৌঠা অগাস্ট পূর্ব জার্মানির লেইপজিগ বা হালে বিমানবন্দরে ইউক্রেনের কার্গো বিমানের কাছে একটি ড্রোন পাওয়া যায়, যেটি বিস্ফোরক বহন করছিলো।

ড্রোনটির ডেটোনেটর বা বিস্ফোরণ ঘটানোর যন্ত্রে ত্রুটি থাকায় সেটি আর বিস্ফোরিত হয়নি।

তদন্তকারীদের সন্দেহ, দ্বিতীয় আরেকটি ড্রোন কাছেই একটি কার্গো বিমানের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল। এর ১০ দিন পর বিমানবন্দরের কাছে তৃতীয় আরেকটি ড্রোন পাওয়া যায়।

জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট বলেন, লেইপজিগ বিমানবন্দরের এই হামলা ইউরোপে রাশিয়ার 'হাইব্রিড অপারেশনের সুপরিচিত ধরন' অনুসরণ করেই চালানো হয়েছে। জার্মানি আবারও এমন হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।

তবে গতকাল মঙ্গলবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অভিযোগ করেন, লাইপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করতে জার্মানি প্রমাণ সাজিয়েছে।

যদিও এই অভিযোগের স্বপক্ষে পুতিন কোনো প্রমাণ দেননি।

অন্যদিকে, জার্মানিতে রাশিয়ার দূতাবাস বলেছে, এই হামলার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করা 'অযৌক্তিক'।

তবে ডোব্রিন্ট বলেন, ওই হামলায় যেসব সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছিলো, সেগুলো পরীক্ষা করে ও গোয়েন্দা তথ্য থেকে এই হামলায় রাশিয়ার সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে।

বার্লিনে এক সংবাদ সম্মেলনে ডোব্রিন্টের পাশে থাকা জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল বলেন, তিনি বনে রাশিয়ার কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দেবেন। একই সঙ্গে বার্লিনে 'রাশিয়ান হাউজ' পরিচালনার চুক্তিও বাতিল করা হবে। কারণ অনেক পর্যবেক্ষকের অভিযোগ, ওই প্রতিষ্ঠানটি গুপ্তচরবৃত্তি এবং রুশ প্রচারণা ছড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।

জার্মান বিমানবন্দরে সন্দেহজনক বস্তু পরীক্ষা করতে রোবট মোতায়েন (ফাইল ছবি)
ছবির ক্যাপশান, জার্মান বিমানবন্দরে সন্দেহজনক বস্তু পরীক্ষা করতে রোবট মোতায়েন (ফাইল ছবি)
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

রুশ নাগরিকদের জার্মানিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ঘোষণাও দেন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি মস্কোর 'শ্যাডো ফ্লিট' বা ছায়া নৌবহরের ওপর চাপ বাড়ানোর কথা জানান তিনি।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

সেই নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তেল পরিবহন ও বিক্রির জন্য পুরোনো তেলবাহী জাহাজের একটি বহর ব্যবহার করে আসছে রাশিয়া, যা 'শ্যাডো ফ্লিট' নামে পরিচিত।

জোহান ওয়াডেফুল জানান, জার্মানিতে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত সের্গেই নেচায়েভকে তলব করা হয়েছে। এই ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই তাকে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রবেশ করতে দেখা যায়।

জার্মানির এসব পদক্ষেপের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেন, জার্মানির নেওয়া পদক্ষেপের জবাবে মস্কোও একই ধরনের ব্যবস্থা নেবে। আর বার্লিনে রুশ দূতাবাস বলেছে, জার্মানির এসব সিদ্ধান্ত রাশিয়া-জার্মানি সম্পর্ককে 'নজিরবিহীন অবনতির' দিকে নিয়ে গেছে।

ইউক্রেনকে জার্মানির সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা করার প্রসঙ্গ টেনে জার্মান প্রেস এজেন্সিকে জাখারোভা বলেন, "বার্লিন সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতা করছে।"

এর আগে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল যে জার্মানি রাশিয়ান হাউজ বন্ধ করলে মস্কোয় জার্মান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গ্যেটে-ইনস্টিটিউটের কার্যক্রমও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা আগেই ধারণা করেছিলেন, ঘটনার পেছনে রাশিয়া থাকতে পারে। তবে রাশিয়া বরাবরই এতে জড়িত থাকার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে।

সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে জার্মান সামরিক বাহিনী ও নেটো মিত্ররা পূর্ব জার্মানির লেইপজিগ বা হালে বিমানবন্দরটি ব্যবহার করে। একই সঙ্গে এটি ইউক্রেনের আন্তোনভ এয়ারলাইন্সেরও একটি ঘাঁটি। ইউক্রেনের আকাশপথে পণ্য পরিবহনের বেশিরভাগই এই এয়ারলাইন্স করে থাকে।

নেটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, জার্মানির প্রতি জোটের 'পূর্ণ সংহতি' রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, "প্রমাণ স্পষ্ট। এর জবাবে জার্মানি যেসব ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে, আমি সেগুলোকে স্বাগত জানাই।"

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট রসুলা ভন ডার লিয়েন এক্সে লেখেন, "আমরা রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ। যারা আমাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করবে, তাদের আমরা প্রতিহত করব।"

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, রাশিয়া "পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।"

এদিকে, সোমবার পোল্যান্ডে ড্রোনের যন্ত্রাংশ তৈরির একটি কারখানায় আগুন লাগে। ওই ঘটনায় বিদেশি কোনো গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত ছিল কি না, তা তদন্ত করছে দেশটি।

লেইপজিগে বোমার ঘটনার কয়েক দিন পর জার্মান সামরিক ঘাঁটির ওপর ড্রোন শনাক্ত হয়

ছবির উৎস, Google

ছবির ক্যাপশান, লেইপজিগে বোমার ঘটনার কয়েক দিন পর জার্মান সামরিক ঘাঁটির ওপর ড্রোন শনাক্ত হয়

এছাড়া, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেন, "আমাদের ঐক্য এবং ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার ইচ্ছা দুর্বল করতে রাশিয়ার চেষ্টা কোনো কাজে আসবে না এবং তা ব্যর্থ হবে।"

গত এক বছরে বিমানবন্দর, সামরিক স্থাপনা ও শিল্প এলাকায় ড্রোন দেখার কথা জানিয়েছে জার্মানিসহ নেটোর বেশ কয়েকটি সদস্যরাষ্ট্র।

লেইপজিগের ঘটনার পেছনে কারা থাকতে পারে, তা নিয়ে এতদিন বিস্তারিত কিছু বলেনি বার্লিন। শুধু বলা হয়েছিল, এতে 'বিদেশি শক্তি' জড়িত থাকতে পারে।

মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিলো যে মার্কিন কর্মকর্তারা ঘটনাটির সঙ্গে রাশিয়ার যোগসূত্র পেয়েছেন।

জার্মানি আগেই বলেছে, দেশটি প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের হাইব্রিড হামলার শিকার হচ্ছে।

গত সপ্তাহে দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, যারা জার্মানির বিরুদ্ধে এসব কর্মকাণ্ড চালাবে, তাদের এর পরিণতি ভোগ করতে হবে।

এ ধরনের হুমকি মোকাবিলায় জার্মানি তার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে যে তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দুর্বল।

জার্মানি ইউক্রেনের অন্যতম বড় সমর্থক। দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসও প্রকাশ্যে ইউক্রেনকে জোরালো সমর্থন দিয়ে আসছেন।

তবে মের্ৎসের দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটসের (সিডিইউ) একজন এমপি বলেছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত যা যা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় 'অনেক কম'।

রুশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হলে মস্কো তা নিয়ে 'শুধু হাসে' বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রোডেরিশ কিজেভেটার বলেন, "যে দেশ নিজেকে নেতৃত্বদানকারী হিসেবে দেখে, তার কাছ থেকে আমি সাহস ও দৃঢ় পদক্ষেপ আশা করি, নিজেকে গুটিয়ে রাখা বা আপস করা নয়''।

জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ একটি লজিস্টিকস কেন্দ্রে থাকা ইউক্রেনীয় কার্গো বিমান কেন মস্কোর লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, তা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়।

তবে এমন এক সময়ে এই ঘোষণা এলো, যখন মের্ৎস সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় চলছে।

পূর্ব জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্টে সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন রয়েছে।

এই নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) প্রথমবারের মতো জার্মানির কোনো রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে পারে।

এএফডি বর্তমানে জার্মানির সবচেয়ে বড় বিরোধী দল। তারা চায় ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া বন্ধ করুক জার্মানি এবং তারা রাশিয়ার সঙ্গে আবার সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।

অন্য আরেক ঘটনায় জার্মান পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবার পূর্ব দিকের ব্রান্ডেনবুর্গ রাজ্যের একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে হাতে তৈরি বিস্ফোরক ও আগুন ধরানোর যন্ত্র পাওয়া গেছে।

এই ঘটনার তদন্ত করা করছে জার্মান পুলিশ।

সেখানে একটি বিদ্যুৎ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছু সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। তবে এসব বিস্ফোরক ও যন্ত্র সেখানে কারা রেখেছে, তা এখনো জানা যায়নি।