মেয়াদ শেষে নির্বাচনমূখী বাজেটে যেসব পদক্ষেপ নিল মোদী সরকার

মেয়াদের শেষ বাজেটে যে সব পদক্ষেপ নিল নরেন্দ্র মোদী সরকার
ছবির ক্যাপশান, বাজেট পেশ করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বেরোচ্ছেন নির্মলা সীতারামন। সঙ্গে তাঁর সহকর্মীরা
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
  • Published

ভারতে আগামী অর্থ বছরের বাজেটে মূলধনী খরচে ব্যাপক বৃদ্ধি, মধ্যবিত্তদের আয়করে ছাড় এবং সার্বিক আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য নানা প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে।

দেশের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন আজ বুধবার পার্লামেন্টে আগামী ২০২৩-২৪ আর্থিক বছরের জন্য এই কেন্দ্রীয় বাজেট উপস্থাপন করেন।

ভারতে আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনের আগে এটাই ছিল নরেন্দ্র মোদী সরকারের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট, তাই এবারের বাজেটে বেশ কিছু ‘পপুলিস্ট’ বা জনমোহিনী পদক্ষেপ থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

ভারতে বিবিসির বিজনেস ইউনিট এই বাজেটের মূল চারটি বৈশিষ্ট্যকে নিচে চিহ্নিত করেছে।

অবকাঠামোতে ব্যয় বৃদ্ধি

দু'হাজার চৌদ্দতে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশে সড়ক, মহাসড়ক, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলে আসছে।

সেই নীতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই ভারতের মোট মূলধনী খরচ (‘ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচার’) এবারের ৩৩% বাড়ানো হয়েছে, যা গত বাজেটের অঙ্কের (৩৫.৪%) তুলনায় সামান্য কম।

ভারতের নতুন রেল প্রকল্প
ছবির ক্যাপশান, সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে ভারতের নতুন রেল প্রকল্পগুলো

এই বাজেটে মূলধনী খরচের মোট অঙ্ক ধরা হয়েছে ১২ হাজার ২০০ কোটি ডলার, যা ২০১৯ সালের পরিমাণের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে রেল প্রকল্পগুলো, যে পরিমাণ প্রায় ২৪০০ কোটি ডলার। দেশের কোনও বাজেটে রেল প্রকল্প কখনো এত বরাদ্দ পায়নি।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘কানেক্টিভিটি’ ও আকাশপথে সংযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রী ৫০টি নতুন বিমানবন্দর, এরোড্রোম ও হেলিপোর্ট বানানোর কথাও ঘোষণা করেছেন, যার জন্য সরকার অর্থায়ন করবে।

সাধারণ মানুষের ক্ষমতার নাগালের মধ্যে আবাসন দিতে বিভিন্ন আবাস যোজনাতেও খরচের পরিমাণ প্রায় ৬৬ শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় ১০০০ কোটি ডলার করা হয়েছে।

বাজেট ঘাটতিতে রাশ টানা

সরকার বলেছে যে এবার তাদের লক্ষ্য হল বাজেট ঘাটতি (‘ফিসক্যাল ডেফিসিট’) অন্তত ০.৫ শতাংশ কমানো।

সরকারের মোট আয় ও ব্যয়ের মধ্যে যে ফারাক তাকেই বলে বাজেট ঘাটতি। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে ভারতে এই ঘাটতি ছিল ৬.৪ শতাংশ, এখন সেটাকেই তারা এবছরে ৫.৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায়।

টিভিতে অর্থমন্ত্রীর বাজেট পেশ করা
ছবির ক্যাপশান, টিভিতে অর্থমন্ত্রীর বাজেট পেশ করা দেখছেন সাধারণ মানুষ

মোট খরচের বৃদ্ধিকে সাত শতাংশে বেঁধে রেখে সরকার এই লক্ষ্য পূরণ করতে চাইছে, তবে বিশ্লেষকরা অনেকেই মনে করছেন দেশে সাধারণ নির্বাচনের আগের বছর খরচে এভাবে রাশ টানা যথেষ্ঠ কঠিন।

তবে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের মধ্যে বাজেট ঘাটতিকে আরও কমিয়ে ৪.৫ শতাংশ করার যে মধ্য-মেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা সরকার আগেই ঘোষণা করেছে, অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন তাঁর সেই অঙ্গীকার এদিন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

কোভিড মহামারির সময় ভারতের সাধারণ মানুষকে বিনা পয়সায় ভ্যাকসিন ও গরিব মানুষের মুখে নিখরচায় খাবার জোগাতে গিয়ে ২০২০-২১ অর্থ বছরে ভারতের বাজেট ঘাটতি রেকর্ড ৯.৩ শতাংশে পৌঁছেছিল।

মধ্যবিত্তদের আয়করে রেহাই

চলতি বছরে ভারতের অন্তত ন’টি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন, তারপর সামনের বছরেই দেশের সাধারণ নির্বাচন।

এর ঠিক আগে আজ ভারতের বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য সরকার আয়করে বিরাট ছাড়ের কথা ঘোষণা করেছে।

ব্যক্তিগত আয়কর গণনার জন্য যে নতুন পদ্ধতি ২০২০ সালে চালু করা হয়েছিল, সেই পদ্ধতি যারা গ্রহণ করেছেন সেই নাগরিকদের জন্য করযোগ্য আয়ের ঊর্ধ্বসীমা অনেকটা বাড়ানো হয়েছে।

সরকার চাইছে মধ্যবিত্তর হাতে কেনাকাটার জন্য বেশি অর্থ আসুক
ছবির ক্যাপশান, সরকার চাইছে মধ্যবিত্তর হাতে কেনাকাটার জন্য বেশি অর্থ আসুক

যে ভারতীয়রা বছরে সাত লক্ষ রুপি (প্রায় ৮৫০০ ডলার) পর্যন্ত আয় করবেন, নতুন পদ্ধতিতে গেলে তাদের আর কোনও আয়কর দিতেই হবে না।

ভারতে ব্যক্তিগত আয়করের ওপর যে সর্বোচ্চ হার, সেটাও ৪২ শতাংশ থেকে কার্যত ৩৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে দেশের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত, সবাই আগামী বছর থেকে কম আয়কর দেবেন।

বাজারে পণ্যের বিক্রিবাটা (‘কনজাম্পশন’) বাড়ানোর জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কারণ আয়করে সাশ্রয় হলে ক্রেতাদের হাতে খরচ করার মতো বাড়তি অর্থ আসবে।

অব্যাহত মুদ্রাস্ফীতির কারণে ভারতের সাধারণ মানুষের হাতে খরচ করার মতো অর্থ (‘ডিজপোজেবল ইনকাম’) কমে আসছিল।

অর্থমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, আয়কর গণনার নতুন পদ্ধতিই (যাতে নিজস্ব বিনিয়োগের ওপর করদাতারা বাড়তি কোনও ছাড় দাবি করতে পারেন না) এখন থেকে ‘ডিফল্ট’ পদ্ধতি হিসেবে গণ্য হবে। তবে মানুষ চাইলে পুরনো পদ্ধতিতেও ফিরে যেতে পারবেন।

জনকল্যাণ ও ভর্তুকিতে ছাঁটাই

বাজেটে মধ্যবিত্তদের রেহাই মিললেও দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে তেমন বড়সড় কোনও পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করা হয়নি।

ভারতের গ্রামীণ কর্মসংস্থান বা ‘একশো দিনের কাজে’র প্রকল্প, যেটাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ ‘সামাজিক বাফার’ বলে বিবেচনা করা হয়, সেখানে বরং ৩০ শতাংশ বরাদ্দ ছাঁটাই করা হয়েছে।

গ্রামীণ কর্মসংস্থানের বরাদ্দে ছাঁটাই করা হয়েছে
ছবির ক্যাপশান, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের বরাদ্দে ছাঁটাই করা হয়েছে

ভারতে যখন বেকারত্বের হার খুব চড়া এবং কর্মীদের বেতন ও মজুরি মেটাতে বহু মালিকপক্ষ দেরি করছে, তাতে এই সিদ্ধান্ত সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

কোভিড মহামারির সময় গরিব মানুষকে প্রায় বিনা পয়সায় চাল-গম খাওয়াতে সরকার যে বিশেষ প্রকল্প শুরু করেছিল, সেটাও ইতিমধ্যেই বন্ধ করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

এর ফলে খাদ্য ভর্তুকিতে গত বছরের সংশোধিত হিসেবের তুলনায় সরকারের প্রায় ৩০ শতাংশ অর্থ সাশ্রয় হবে।

এছাড়া দেশের কৃষকদের জন্য সারে যে ভর্তুকি দেওয়া হয়ে থাকে, সেই বরাদ্দেও ২০ শতাংশের বেশি ছাঁটাই করার কথা জানানো হয়েছে।