রানি এলিজাবেথ: পুরো রাজত্বকালে তিনবার গিয়েছিলেন ভারত সফরে

দিল্লি বিমানবন্দরে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে স্বাগত জানাচ্ছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী
ছবির ক্যাপশান, দিল্লি বিমানবন্দরে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে স্বাগত জানাচ্ছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি, কলকাতা
  • Published

১৯৬১ সাল। ২১ জানুয়ারি। দিন পনেরোর পাকিস্তান সফর শেষ করে রানি এলিজাবেথ আর তার স্বামী প্রিন্স ফিলিপকে নিয়ে রাজকীয় বিমান নেমেছিল দিল্লির মাটিতে।

স্বাধীন ভারতে সেই প্রথম পা রেখেছিলেন যুক্তরাজ্যের রানি, যে দেশ ছেড়ে ইংরেজরা চলে গিয়েছিল তার ১৪ বছর আগে।

তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে হাজির হয়েছিলেন ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ, উপরাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন আর প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু।

আরও পড়তে পারেন:

১৯৬১র প্রথম ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ
ছবির ক্যাপশান, ১৯৬১ সালে প্রথম ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ

দিল্লির রাস্তায় দশ লক্ষ মানুষ

সেবছর তিনিই ছিলেন ২৬শে জানুয়ারিতে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রধান অতিথি।

পুরনো সংবাদপত্র প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে বিমানবন্দর থেকে রাষ্ট্রপতি ভবন পর্যন্ত রাস্তার দু'দিকে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন রানিকে দেখতে।

সেই জমায়েত দেখে নিউ ইয়র্ক টাইমস তার প্রতিবেদনে লিখেছিল, "ভারতীয়রা তাদের সব সমস্যার কথা এই সপ্তাহে ভুলে গেছে।"

দিল্লিতে একটি প্রদর্শনীতে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ
ছবির ক্যাপশান, দিল্লিতে একটি প্রদর্শনীতে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ

টাইমস পত্রিকাটি লিখেছিল ট্রেন, বাস এমনকি গরুর গাড়িতে চেপেও সেদিন মানুষ দিল্লি এসেছিলেন। রাস্তাঘাট, বাগান বাগিচাগুলোতে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, যদি একবার রাজকীয় দম্পতিকে চোখের দেখা দেখা যায়।

দিল্লির রামলীলা ময়দানে যে হাজার হাজার মানুষ হাজির হয়েছিলেন, তারা অবশ্য দেখা পেয়েছিলেন রানি এলিজাবেথের। প্রধানমন্ত্রী নেহরু সেই ময়দানেই আয়োজন করেছিলেন রানি এলিজাবেথ ও প্রিন্স ফিলিপের জন্য এক নাগরিক সম্বর্ধনার।

দ্বিতীয় গন্তব্য কলকাতা

ছয় সপ্তাহের সেই ভারত ভ্রমণে রানির দ্বিতীয় গন্তব্য ছিল কলকাতা।

কলকাতা বিমানবন্দর থেকে লাখ লাখ মানুষের সামনে দিয়ে এই রাজভবনে পৌঁছেছিলেন রানি এলিজাবেথ।
ছবির ক্যাপশান, কলকাতা বিমানবন্দর থেকে লাখ লাখ মানুষের সামনে দিয়ে এই রাজভবনে পৌঁছেছিলেন রানি এলিজাবেথ।

যে কলকাতাকে একসময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর বলা হত, যে শহরটা ছিল তার পূর্বসূরিদের আমলে ভারতের রাজধানীও।

'ব্রিটিশ পাথে' নামের একটি ভিডিও সংগ্রহশালায় রানির কলকাতা সফরের বেশ কিছু ভিডিও রয়েছে।

সেই সময়কার একটি নিউজ রিলের নেপথ্য ভাষণে বলা হচ্ছে, "রানির সবথেকে বড় গণ-অভ্যর্থনা সম্ভবত দিয়েছিল কলকাতার মানুষই। ৩০ লক্ষ জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই সেদিন বিমানবন্দর থেকে গভর্নরের আবাস রাজভবন পর্যন্ত রাস্তার দু'দিকে জড়ো হয়েছিলেন।"

সেই ভিড়ে হাজির ছিলেন সেসময় বছর দশেক-বয়সী অমর মিত্রও। আজ তিনি নামকরা সাহিত্যিক।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন রানির আসার খবর পাওয়ার পর থেকেই তিনি খুব উত্তেজিত ছিলেন।

"তখন বালক বয়স। রাজা রানিদের গল্প বইতেই পড়েছি। কোনদিন তো চাক্ষুষ দেখি নি। সেসময়ে আমরা যে অঞ্চলে থাকতাম তার পাশ দিয়েই সব ভিভিআইপিরা কলকাতা শহরে আসতেন। বিমানবন্দর থেকে শহরে ঢোকার তখন ওটাই রুট ছিল," বলেন মি. মিত্র।

তার কথায়, "বেলগাছিয়া ব্রিজের কাছে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল কোনও দাদা। লোকে লোকারণ্য রাস্তার দু'দিক। মাঝে মাঝে পুলিশের গাড়ি আর মোটরসাইকেল ঘুরছিল। অবশেষে দেখা দিল রানির গাড়ি। আজকাল তো ভিভিআইপিদের নিরাপত্তার এত কড়াকড়ি যে সাধারণ মানুষ তাদের চোখে দেখতেই পান না। তবে রানির গাড়ি ছিল হুড-খোলা। তাঁর হাতে সাদা গ্লাভস ছিল আর রাস্তায় দাঁড়ানো মানুষের দিকে তিনি সমানে হাত নাড়ছিলেন।"

এই ছবি ধরা রয়েছে 'ব্রিটিশ পাথে'র ভিডিওটিতেও।

ভিডিওর ক্যাপশান, অল্পবয়সে অপ্রত্যাশিতভাবে রানির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন দ্বিতীয় এলিজাবেথ

কলকাতার শ্যামবাজার, সেন্ট্রাল এভিনিউ হয়ে রানির গাড়ি পৌঁছেছিল রাজভবনে। কলকাতা যখন দেশের রাজধানী ছিল, এই প্রাসাদটিই ছিল ভারতের ভাইসরয় বা বড় লাটের আবাস।

কলকাতার রেস কোর্সে রানি

ইতিহাস বলছে তার পূর্বসূরিদের তৈরি করা রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব, আর সি টি সি বা লোকমুখে যেটি রেসকোর্স সেখানে একটি ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। সেই ঘোড়দৌড়ের নামও ছিল রানির নামেই - কুইন এলিজাবেথ ২ কাপ টুর্নামেন্ট।

কলকাতা রেস কোর্সে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ
ছবির ক্যাপশান, কলকাতা রেস কোর্সে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ

আর সি টি সির তথ্য বলছে সেই প্রতিযোগিতায় যে ঘোড়াটি জয়ী হয়েছিল, তার মালিক ছিলেন গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল, যা এখন ললিত গ্রেট ইস্টার্ন, তারই পরিচালনা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান এ এল বিলিমোরিয়া। তার স্ত্রী রানির হাত থেকে সেই কাপ নিয়েছিলেন।

আর সেই কাপটির একটি প্রতিরূপ এখনও ললিত গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে রাখা আছে।

কলকাতা থেকেই রাজ-দম্পতি গিয়েছিলেন এখনকার ব্যস্ত শিল্প শহর দূর্গাপুরে। সেখানে ব্রিটিশ সহায়তায় তখন সবে গড়ে উঠছে অতি বৃহৎ ইস্পাত কারখানা দূর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট।

সেই প্রথম ভারত সফরে রানি এলিজাবেথ ও তার স্বামী প্রিন্স ফিলিপ চেন্নাই আর মুম্বাইতেও গিয়েছিলেন। ওই শহর দুটির নাম অবশ্য তখন ছিল যথাক্রমে ম্যাড্রাস আর বম্বে। আর গিয়েছিলেন রাজস্থানের জয়পুর। দেখেছিলেন আগ্রার তাজমহল আর বেনারসে গঙ্গার ঘাটগুলিও।

এর পরে আবারও রানি এলিজাবেথ ভারত সফরে এসেছিলেন - ১৯৮৩ সালে।

দ্বিতীয়বার রানি এলিজাবেথ ভারত সফরে আসেন ১৯৮৩ সালে
ছবির ক্যাপশান, দ্বিতীয়বার রানি এলিজাবেথ ভারত সফরে আসেন ১৯৮৩ সালে

কিন্তু সেবার কলকাতায় তিনি আর না গেলেও ওই সফরের সঙ্গে কলকাতার যোগ একটা ছিল বই কি!

১৯৮৩ সালের দ্বিতীয় ভারত সফরে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ দিল্লিতে মাদার টেরিজার হাতে তুলে দিয়েছিলেন 'অর্ডার অফ মেরিট' সম্মান। মাদার টেরিজার কাজের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কলকাতা।

ভারতের মানুষ স্মরণ করছে রানিকে

প্রয়াণের পরে ভারতবাসী নানাভাবে স্মরণ করছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ঊর্বী দাশ বলেন, "ভারত যখন স্বাধীন হল, তারপর থেকে বিশ্বে ভারতকে সমমর্যাদা দিয়ে এসেছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ভারতকে উন্নয়নের সাথী মনে করেছেন তিনি। কখনই ভারতকে নিপীড়িত দেশ হিসাবে দেখেন নি তারা।"

তিনি বলেন, এই কূটনৈতিক অবস্থান ছাড়াও রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে ভারতবাসী মনে করে একজন বিনয়ী, রানি হয়েও যিনি বিশ্বের নানা দেশে অনেক সেবামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত থেকেছেন, সেটাও নিশ্চয়ই মনে রাখবে ভারতের মানুষ।

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তার তৃতীয় এবং শেষ সফরে ভারতে এসেছিলেন ১৯৯৭ সালে। তবে রানিকে ছাড়া প্রিন্স ফিলিপ একবার একা এসেছিলেন ভারতে।

বিবিসি বাংলায় আরও খবর: