ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ: লড়াইয়ের 'কেন্দ্রস্থল' মারিউপোল কে নিয়ন্ত্রণ করছে?

Flowers placed on a grave in Mariupol
ছবির ক্যাপশান, মারিউপোলের একটি গোরস্থান
    • Author, ওলেগ চেরনি
    • Role, বিবিসি ইউক্রেনিয়ান, কিয়েভ
  • Published

আজভ সাগরতীরের ব্যস্ত বন্দর শহর মারিউপোল গত সাত সপ্তাহ ধরে রুশ ও ইউক্রেনীয় বাহিনীর মধ্যেকার এক তিক্ত লড়াইয়ের কেন্দ্রস্থল।

প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনেস্কি শহরটিকে 'এই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু' বলে বর্ণনা করেছেন।

ইউক্রেনের সৈন্যরা অনেক চেষ্টা করেও অবরোধ ভেদ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে সেখানে এখনো প্রায় এক লাখ বাসিন্দা আছে এবং দেড় হাজার ইউক্রেনীয় সেনা আশ্রয় নিয়েছে।

অবরুদ্ধ এই শহরটিতে কী চলছে?

যুদ্ধের আগে

যুদ্ধের আগে মারিউপোলে থাকতেন প্রায় পাঁচ লাখ বাসিন্দা।

এটি ছিল ব্যস্ত এক বন্দর এবং শিল্পনগরী।

রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী অধ্যুষিত এলাকার কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও ২০১৫ সালে পূর্ব ইউক্রেনে সংঘটিত যুদ্ধ সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে গেলে মারিউপোলেও বোমাবর্ষণ করা হয়।

তারপরও শহরটি স্বরূপে ফেরে। শহরটিতে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক বিনিয়োগ আসে।

কিন্তু ২৪শে ফেব্রুয়ারি শহরটিতে রাশিয়ার আক্রমণের পর তাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ফের থমকে গেছে।

Cars destroyed by fire parked in front of a charred building in Mariupol
ছবির ক্যাপশান, একটি বিধ্বস্ত ভবনের সামনে পুড়ে যাওয়া যানবাহন

রাশিয়ার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু

শহরটি রুশ বাহিনীর অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

মানচিত্রের এমন জায়গায় শহরটির অবস্থান, যেটিকে দখল করা গেলে পূর্ব ইউক্রেনের রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী এলাকার সাথে দক্ষিণে ক্রাইমিয়া উপদ্বীপের একটি সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হবে।

দুই হাজার চৌদ্দ সালে রাশিয়া ক্রাইমিয়াকে নিজেদের সাথে যুক্ত করে নেয়, যেটাকে অবৈধ বলে মনে করে পশ্চিমা দেশগুলোসহ অনেকে।

ম্যাটারনিটি হাসপাতাল ও থিয়েটারে আক্রমণ

যুদ্ধ শুরুর পরপরই একটি ম্যাটারনিটি হাসপাতালে এবং তার কিছুদিন পরই শত শত বেসামরিক নাগরিকদের আশ্রয়ে পরিণত হওয়া একটি থিয়েটারে বোমাবর্ষণের পর সেখানকার কিছু ছবি ও ভিডিও এই যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ের উদাহরণে পরিণত হয়।

রাশিয়া দাবি করে আসছিল মারিউপোল তাদের 'প্রায়' নিয়ন্ত্রণে।

এমনকি পূর্ব ইউক্রেনের বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলোর একজন নেতাকে শহরটির নতুন মেয়র হিসেবেও নিয়োগ দেয়া হয়। তবে রুশপন্থী সাবেক এই স্থানীয় কাউন্সিলর তার দায়িত্ব বুঝে নেননি।

তবে ইউক্রেনীয়রা বলছে মারিউপোলকে ঘেরাও করে রাখা রুশ সৈন্যরা এর কিছু কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও শহরটি পুরোপুরি তাদের দখলে যায়নি।

এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেমন- বন্দর এবং আজভস্টাল ইস্পাত কারখানার মতো প্রধান শিল্প এলাকাগুলো এখনও ইউক্রেনের সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণেই আছে।

Russian troops in Mariupol
ছবির ক্যাপশান, মার্চের শুরুর দিকে মারিউপোল অবরোধ শুরু করে রুশ বাহিনী এবং ধীরে ধীরে অবস্থান সংহত করে তারা

মারিউপোলে অনবরত লড়াই ও রুশ গোলাবর্ষণের প্রমাণ মিলছে।

কিন্তু এটাও স্পষ্ট যে ইউক্রেনের সৈন্যদের জন্য রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

অস্ট্রেলিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞ টম কুপার বলছেন, রাশিয়ার নৌবাহিনী বন্দরের অংশবিশেষ দখল নিতে পেরেছে।

"তার মানে ইউক্রেনীয় সেনাদের এক দিকের বদলে তিন দিকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হচ্ছে।"

মি. কুপার বিশ্বাস করেন, রাশিয়ার এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে তাদের নতুন কমান্ডার জেনারেল আলেকজান্দার ভরনিকোভের নিয়োগের সম্পর্ক রয়েছে। তিনি সিরিয়াতেও রুশ বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তবে সিরিয়াতে রাশিয়ার অভিযানের চেয়ে বেশ ভিন্ন মারিউপোল আক্রমণ।

সেখানে বেসামরিক এলাকাতে অনবরত গোলাবর্ষণ করা হচ্ছে।

এমনকি রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারেরও অভিযোগ তুলেছেন শহরটির মেয়র।

এগারোই এপ্রিল রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধরত সেনা, নৌ ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা 'অজানা বিষাক্ত বস্তু'র ব্যবহারের কথা জানান।

মানচিত্রে মারিউপোল অবরোধ

তারা বলেন, ইউক্রেনীয় সেবাদানকারী সংস্থার তিনজন সদস্য বিষাক্ত কিছুর উপস্থিতি টের পান।

যার ফলে তাদের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, গলা ও চোখ শুকিয়ে যাওয়া এবং উচ্চ রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে কি না তা তারা খুঁজে দেখছেন।

কিন্তু ফসফরাস বোমা ব্যবহারের প্রতিক্রিয়ার ফলেও সেবাদানকারী সংস্থার সদস্যদের এমন উপসর্গ দেখা দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানায় তারা।

এদিকে পশ্চিমা গোয়েন্দারা বলছে, রাশিয়া নিষিদ্ধ ফসফরাস বোমা ব্যবহার করেছে।।

তবে রাশিয়া এসব অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। তারা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে বলেছে, এসব বক্তব্য পশ্চিমাদের প্রোপাগান্ডার অংশ।

তারা বিবৃতিতে এও উল্লেখ করে যে, আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে ২০১৭ সালে তারা তাদের সমস্ত রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদ ধ্বংস করেছে।

আজভ রেজিমেন্ট

শহরটিতে ইউক্রেনের যে বাহিনী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে তাদের সঙ্গে আছে আজভ রেজিমেন্ট, ন্যাশনাল গার্ডের একাংশ এবং ইউক্রেন মেরিনের ৩৬তম ব্রিগেড।

তারা ইউক্রেনের বাদবাকি সেনাবাহিনীর কাছে সাহায্য চেয়ে সামাজিক মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছে।

তারা সেখানে লিখেছে, তারা সংখ্যায় খুবই কম, তাদের একজন সৈন্যের বিপরীতে রাশিয়ার দশ জন সৈন্য রয়েছে।

Destroyed Drama Theatre in Mariupol
ছবির ক্যাপশান, মারিউপোলের এই নাট্যশালায় রুশ হামলায় তিন শতাধিক নিহত হয় বলে ধারণা রয়েছে

তারা বলছে, ১৪ হাজার রুশ সৈন্য শহরটির দিকে এগিয়ে আসছে।

অন্যদিকে ইউক্রেনের বাহিনীতে মোটে হাজার দেড়েক সদস্য এখন অবশিষ্ট আছে।

শহরটির ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষের দাবি প্রায় ২২ হাজার বেসামরিক নাগরিক সেখানে মারা গেছে।

কিন্তু বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে মারিউপোল পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে এসব তথ্য স্রেফ ধারণার বেশি কিছু নয়।

শহরটির বেশিরভাগ স্থানেই কোন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ নেই।

যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে গুলি ও বোমার আঘাত ছাড়াও অনেকেই পানিশূন্যতা ও ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করেছে।

'খাবার ফুরিয়ে আসছে'

মারিউপোলে খাবার ও পানি ফুরিয়ে আসার বিষয়টি প্রকাশ্যেই জানিয়েছে সেখানে যুদ্ধরত ইউক্রেনীয় সৈন্যরা।

ইউক্রেনের সেনাপ্রধান সচরাচর জনসমক্ষে কথা বলেন না, কিন্তু এবার তিনি সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান এবং বলে, অবরুদ্ধ সেনাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। আর তাদের সাহায্য করার জন্য 'সব ধরনের সম্ভব এবং অসম্ভব' কাজ বাকি সেনাবাহিনী চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে সামরিক বিষয় সবার সামনে আলাপ করা উচিৎ না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

A view of the sea fishing port near Azovstal factory in Mariupol, Ukraine. Photo: 9 April 2022
ছবির ক্যাপশান, ধারণা করা হয় ইউক্রেনের সৈন্যরা পশ্চাদপসরণ করে বন্দর এলাকা এবং আজভস্তাল লৌহ ও ইস্পাত কারখানার দিকে অবস্থান নিয়েছে।

ইউক্রেনের কাছে অবরোধ ভেদ করার মতো যথেষ্ট অস্ত্র নেই বলে সম্প্রতি স্বীকার করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনেস্কি।

এক বার্তায় তিনি বলেন, "দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে অনুপ্রবেশ করা শত্রুদের ধ্বংস করে দ্রুততার সঙ্গে যুদ্ধটি শেষ করার জন্য যথেষ্ট গোলাবারুদ আমরা পাচ্ছি না"।

ইউক্রেনের চাহিদামত সব ধরনের গোলাবারুদ না দেয়ায় বৈদেশিক শক্তিদের উদ্দেশ্যেই তার এই পরোক্ষ ভর্ৎসনা।

কিছু বেসামরিক নাগরিক গত কয়েক সপ্তাহে মারিউপোল ছেড়ে পালাতে পেরেছেন।

কিন্তু এটিও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ, কেননা নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত যে সড়কগুলো দিয়ে গাড়িতে কিংবা পায়ে হেঁটে নাগরিকরা যাচ্ছেন সেখানেও আগুন দেখা গেছে।

মারিউপোলে থাকা ইউক্রেনীয় সেনাদের জন্য পালিয়ে আসা আরও কঠিন হবে।

ইউক্রেনীয় সামরিক বিশেষজ্ঞ ওলেক্সি মেলনিক বলেন, অবরোধের মধ্যে যদি সামান্য অংশও খুলে দেয়া হয় তবুও সামরিক ব্যক্তিদের হেলিকপ্টারে উদ্ধার কার্যক্রম খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হবে। কেননা উদ্ধারকারী দলের উপর গুলি করার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি থাকবে।

রাশিয়া বলছে, গত কয়েক সপ্তাহে অবরুদ্ধ শহরটিতে গুলি করে বেশ কিছু ইউক্রেনীয় হেলিকপ্টার ধ্বংস করা হয়েছে।

খবরগুলো কি সত্য?

এসব খবর নিয়ে কোন মন্তব্য করেনি ইউক্রেনের সেনাসদর। আর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিবিসিকে বলেছেন, তিনি এসব খবর নিশ্চিতও করছেন না, আবার অস্বীকারও করছেন।

A Mariupol street with damaged buildings and rubble strewn across the ground
ছবির ক্যাপশান, রুশ হামলায় মারিউপোলের বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

"যুদ্ধের সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা এবং সরঞ্জামের তথ্য রাষ্ট্রীয় গোপনীয় বিষয়", বলছেন তিনি।

তবে প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কির একজন উপদেষ্টা একই সময়ে বলেছেন, মারিউপোলে হেলিকপ্টারে সাহায্য পৌঁছানোর চেষ্টা করা হলে রাশিয়া সেগুলো উদ্দেশ্য করে গুলি করছে।

ওলেক্সি মেলনিক বলেন, রাশিয়ান বিমানবাহিনী মারিউপোলের আকাশের দিকে নজর রাখছে। যার ফলে কোন অভিযান করা খুবই বিপজ্জনক এবং হলেও তার সাফল্যের সম্ভাবনা কম।

তিনি বলেন, মারিউপোল যুদ্ধের অন্যতম প্রধান একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

দুই পক্ষের জন্যই এটি গুরুত্বপূর্ণ শহর।

সামরিক ও বেসামরিক দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হবার পরও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহরটি ইউক্রেনের জন্য বীরত্বের প্রতীক।

সড়কপথে যোগাযোগ স্থাপন

মি. মেলেনিক বলেন, মারিউপোলের শতভাগ দখলের মাধ্যমে ক্রাইমিয়ার সঙ্গে সড়ক পথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে রাশিয়া, যা তাদের এই যুদ্ধে সত্যিকার অর্থেই একটি অর্জনের সুযোগ করে দেবে।

প্রায়শই রাশিয়ার অসমর্থিত এবং পরস্পরবিরোধী খবর আসে, যেখানে বলা হয় রুশ সৈন্যদের কাছে ইউক্রেনের মেরিনরা আত্মসমর্পণ করেছে।

People walking along a street with burnt out vehicles, carrying possessions in bags.
ছবির ক্যাপশান, মারিউপোলের রাস্তা দিয়ে বাসিন্দারা হেঁটে যাচ্ছে, দুপাশে দেখা যাচ্ছে পুড়ে যাওয়া যানবাহন

আবার এমন অসমর্থিত খবরও আসে, যেখানে বলা হয়, ইউক্রেনের মেরিন সেনারা অবরোধ ভেদ করে শহরে ঢুকে পড়ে বড়সড় একটি কন্টিনজেন্ট গড়ে তুলেছে, যাতে তারা দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিরোধ ধরে রাখতে পারে।

যদিও মনে হচ্ছে রাশিয়ার বিশাল বাহিনীর বিপরীতে খর্ব শক্তির ইউক্রেন সৈন্যরা খুব বেশি সময় প্রতিরোধ ধরে রাখতে পারবে না।

কিন্তু জয়ের ব্যাপারে এখনো আশাবাদী প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কিসহ কিছু ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা এবং দেশটির অনেক বাসিন্দা।

"সব কিছু সত্ত্বেও মারিউপোলের হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়নি। আমরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা শক্তিশালী।"