রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ: রাশিয়া কি রাসায়নিক হামলা চালাতে পারে? রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্রের মধ্যে পার্থক্য কী

গ্যাস মাস্ক।
ছবির ক্যাপশান, গ্যাস মাস্ক।
    • Author, ফ্রাঙ্ক গার্ডনার
    • Role, বিবিসি সিকিউরিটি করেসপন্ডেন্ট
  • Published

রাশিয়া দাবি করছে যে ইউক্রেন জীবাণু অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছে এবং এ বিষয়ে আলোচনার জন্য আজ শুক্রবারই নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি সভাও হয়েছে রাশিয়ার অনুরোধে।

যদিও এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে ইউক্রেন বলছে এটি হলো রাশিয়ার নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেনে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনাকে প্রাসঙ্গিক করে তোলা।

ইউক্রেনের ল্যাবরেটরি আছে এবং সেগুলো বৈধ। দেশটির সরকার বলছে তাদের বিজ্ঞানীরা কোভিডের মতো নানা মহামারি থেকে জনগণকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য এসব ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করে।

কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশটিতে এখন যুদ্ধ চলছে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইউক্রেনকে বলেছে যে তাদের ল্যাবরেটরিতে কোন বিপজ্জনক জীবন্ত উপাদান থাকলে সেগুলো ধ্বংস করতে।

তাহলে রাসায়নিক অস্ত্র আসলে কী এবং জীবাণু অস্ত্রের চেয়ে সেটা কীভাবে আলাদা করা যাবে।

রাসায়নিক অস্ত্র হলো এমন ধরণের যুদ্ধাস্ত্র যা টক্সিন বা রাসায়নিক পদার্থ যা মানুষের শরীরের সিস্টেমগুলোতে আক্রমণ করে।

বিভিন্ন ক্যাটাগরির রাসায়নিক অস্ত্র আছে। একটা আছে চোকিং এজেন্ট- যা ফুসফুস ও রেসপিরেটরি সিস্টেমে আক্রমণ করে ফুসফুসকে অচল করে দেয়। আবার ব্লিস্টার এজেন্ট হিসেবে আছে মাস্টার্ড গ্যাস। এটা শরীরের চামড়া পুড়িয়ে দেয় ও মানুষকে অন্ধ করে দেয়।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

সোভিয়েত আমলে বিপুল জীবাণূ অস্ত্র ছিলো রাশিয়ার।
ছবির ক্যাপশান, সোভিয়েত আমলে বিপুল জীবাণূ অস্ত্র ছিলো রাশিয়ার।

কিছু আছে মারণাস্ত্র ধরণের। যেমন নার্ভ এজেন্ট যা মস্তিষ্কে ও শরীরের পেশীতে ঢুকে পড়ে। এর ক্ষুদ্র কণা পরিমাণও প্রাণঘাতী হতে পারে। আধা মিলিগ্রাম ভিএক্স নার্ভ এজেন্ট একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট।

আর এসব কথিত রাসায়নিক উপাদান যুদ্ধ ক্ষেত্রে কামানের গোলা, বোমা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রেও ব্যবহার করা সম্ভব। কিন্তু এসবই ১৯৯৭ সালে কেমিক্যাল উইপন কনভেনশনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক অর্গানাইজেশন ফর দা প্রহিবিশন অফ কেমিক্যাল উইপনস বা ওপিসিডব্লিউ এ বিষয়ে বৈশ্বিক মনিটরিং প্রতিষ্ঠান।

তারা মূলত এসব অস্ত্রের বেআইনি ব্যবহার ও বিস্তার প্রতিরোধে বিষয়ে কাজ করে।

এসব অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে, ইরাক-ইরান যুদ্ধে এবং সম্প্রতি সিরিয়ায়।

রাশিয়া জানিয়েছে তারা ২০১৭ সালে তাদের রাসায়নিক অস্ত্রের সর্বশেষ সম্ভার ধ্বংস করেছে। যদিও এরপর অন্তত দুটি রাসায়নিক হামলার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করা হয়।

সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
ছবির ক্যাপশান, সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

সীমা অতিক্রম

২০১৮ সালের মার্চে সলসবারিতে প্রথম ঘটনা ঘটে। সেখানে সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা সের্গেই স্ক্রিপল ও তার কন্যা নার্ভ এজেন্টের শিকার হন। রাশিয়া এর দায় অস্বীকার করে। কিন্তু তদন্তকারীরা বলছে এটা রাশিয়ান দুজন সামরিক গোয়েন্দার কাজ। পরে এর জের ধরে বিভিন্ন দেশ থেকে ১২৮ জন রাশিয়ান গুপ্তচর ও কূটনীতিককে বহিষ্কার করা হয়।

এরপর ২০২০ সালের অগাস্টে রাশিয়ার বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনি নভিচক এজেন্টে আক্রান্ত হন। তবে তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান।

তাহলে রাশিয়া কী ইউক্রেনে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে?

যদি রাশিয়া যুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে বিষাক্ত কোন গ্যাস ব্যবহার করে তাহলে সেটি হবে বড় ধরণের সীমা লঙ্ঘন। যা পশ্চিমা বিশ্বকে আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে।

সিরিয়ায় রাশিয়া এ ধরণের অস্ত্র ব্যবহার করেছে এমন কোন প্রমাণ নেই কিন্তু তারা বাশার আল আসাদের সরকারকে ব্যাপক সহযোগিতা করেছিলো যুদ্ধে, যে সরকারের বিরুদ্ধে অন্তত এক ডজন রাসায়নিক হামলার অভিযোগ আছে।

বাস্তবতা হলো যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে সেখানে আক্রমণকারী মিলিটারি জয় অর্জনের জন্য এটিকে কার্যকর পথ ভাবতে পারে।

সেটাই সিরিয়া করছিলো আলেপ্পোতে।

সিরিয়ার ইস্টার্ণ গৌতায় সন্দেহভাজন রাসায়নিক হামলার শিকার এই শিশু।
ছবির ক্যাপশান, সিরিয়ার ইস্টার্ণ গৌতায় সন্দেহভাজন রাসায়নিক হামলার শিকার এই শিশু।

জীবাণু অস্ত্র রাসায়নিক অস্ত্র থেকে আলাদা

সমস্যা হলো ক্ষতিকর সজীব জীবাণু থেকে জনগণকে রক্ষার পাশাপাশি গোপনে এটাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মাঝে একটি গ্রে এরিয়া থাকে।

রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছে তাতে এ ধরণের গ্রে এরিয়ার কোন প্রমাণ দেয়া হয়নি।

রাশিয়া যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিলো তখন সত্যিকার অর্থেই দেশটির হাতে বিপুল জীবাণু অস্ত্র কর্মসূচির নিয়ন্ত্রণ ছিলো।

বায়োপ্রিপেরাট নামের একটি সংস্থা তা পরিচালনা করতো যাতে কাজ করতো প্রায় সত্তর হাজার মানুষ।

স্নায়ু যুদ্ধের অবসানের পর বিজ্ঞানীরা এগুলো ধ্বংস করতে গিয়েছিলেন।

তারা দেখেছেন যে সোভিয়েত ইউনিয়ন অ্যানথ্রাক্স, স্মলপক্স ও অন্য রোগের উপাদান মিশ্রিত বিপুল অস্ত্র উৎপাদন করেছে যা দক্ষিণ রাশিয়ার একটি দ্বীপে জীবন্ত বানরের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে।

আন্ত:মহাদেশীয় মিসাইলগুলোতে ভর্তি ছিলো অ্যানথ্রাক্স।

এমনকি ছিলো ডার্টি বম্ব- যেগুলোতে সাধারণ বিস্ফোরকের সাথে মিশানো ছিলো তেজস্ক্রিয়, যা আরডিডি হিসেবে পরিচিত।

একটি সাধারণ বোমার চেয়ে বেশি মানুষ হত্যার ক্ষমতা এটির নেই, কিন্তু এর একটি বোমাই পুরো লন্ডনের মতো এলাকাকে পুরোপুরি দূষিত করে দিতে পারে কয়েক সপ্তাহে।

ডার্টি বোম্ব হলো একধরণের সাইকোলজিক্যাল অস্ত্র যা জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে ও মনোবল ভেঙ্গে দেয়।

যুদ্ধে এটার ব্যবহার দেখা যায়নি। এর কারণ হলো হামলাকারীর জন্যও এটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এই বোমা ব্যবহার করা বেশ কঠিন ।