ইতিহাসের সাক্ষী: গাদ্দাফির যে ছেলে খেলেছেন ইতালির ফুটবল ক্লাবে

ফুটবল মাঠে সাদি আল গাদ্দাফি।
ছবির ক্যাপশান, ফুটবল মাঠে সাদি আল গাদ্দাফি।
Published

লিবিয়ার স্বৈরশাসক কর্নেল গাদ্দাফির ছেলে আল সাদি গাদ্দাফির সঙ্গে চুক্তি করে সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল ইতালির প্রথম সারির ফুটবল ক্লাব পেরুজা।

ধারণা করা হয় যে ব্যাপক প্রচারণা পাওয়ার জন্যই পেরুজার মালিক লুচিয়ানো গাউচি এই চুক্তিটি করেছিলেন।

ইতালীয় ফুটবল লিগ সেরেয়ার একটি মাত্র খেলায় তাকে নামানো হয়েছিল, তাও বদলি খেলোয়াড় হিসেবে।

তবে খেলার চেয়েও তিনি বেশি আলোচিত হয়েছিলেন মাঠের বাইরে, বিশেষ করে তার প্লেবয় লাইফ-স্টাইল এবং লাগামহীন খরচ করার স্বভাবের কারণে।

সময়টা ছিল ২০০৩ সালের গ্রীষ্মকাল। ইতালির প্রথম সারির ফুটবল ক্লাব পেরুজা মওসুম শুরু হওয়ার আগে তাদের অনুশীলন ক্যাম্প শুরু করেছে। রেলিগেশন এড়ানোর জন্য তারা কঠোর পরিশ্রম করছিল সেসময়। কিন্তু এবছর তাদের টিম ছিল বেশ শক্তিশালী। দলে অভিজ্ঞ ফুটবলার যেমন ছিল তেমনি ছিল বেশ কিছু নতুন খেলোয়াড়ও, যারা আরো বড়ো ক্লাবে যাওয়ার লক্ষ্যে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করতে চাইছিল।

পেরুজার ফরোয়ার্ডে খেলতেন ২১ বছর বয়সী জে বথরয়েড। তিনি গেছেন ইংল্যান্ড থেকে, বলেন, "এই ক্লাবে ভাল ভাল ফুটবলার ছিল। এটা ছিল একটা পরিবার-কেন্দ্রিক ক্লাব। বেশ ভালই ছিল।"

পেরুজার গোলরক্ষক ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার জোকো ক্যালাচ। ক্লাবের সবাই তাকে খুব পছন্দ করতো। তিনি বলেন, "আমরা সবাই খেলছিলাম টিকে থাকার জন্য। সেরিয়াতে টিকে থাকতে পারাটাই আমাদের জন্য ছিল লিগের শিরোপা জেতার মতো বিষয়।"

সেসময় পেরুজায় নতুন একজন ফুটবলার নেওয়া হয়। তার নাম সাদি আল গাদ্দাফি। আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে তাকে দলে নেওয়া ছিল অস্বাভাবিক এক ঘটনা। কারণ তার পিতা তেল সমৃদ্ধ দেশ লিবিয়ার স্বৈরশাসক মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি।

আল সাদি পরিচিত ছিলেন শুধু সাদি নামেই। ফুটবল খেলতে ভালবাসতেন তিনি। ক্লাবে যোগ দেওয়ার অল্প কদিনের মধ্যে তিনি জে বথরয়েডসহ সব ফুটবলারের সঙ্গেই ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছিলেন।

জো বথরয়েড বলেন, "আমরা দুজন ইংরেজিতে কথা বলতাম। তার পিতা লিবিয়ার লোকজনের প্রতি যা করেছেন তার জন্য আমি তার পিতাকে ক্ষমা করতে পারি না। তবে সাদি ছিল মৃদুভাষী। খুব শান্ত এবং উদার প্রকৃতির মানুষ।"

কারগারে আটক সাদি আল গাদ্দাফি।
ছবির ক্যাপশান, কারগারে আটক সাদি আল গাদ্দাফি।

গোলকিপার জোকো ক্যালাচের সঙ্গেও ভাল সম্পর্ক ছিল সাদি আল গাদ্দাফির। তিনি একদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, "সাদি একটা জায়গায় বসেছিল। সে হয়তো ক্লান্ত ছিল কিম্বা তার মেজাজ খারাপ ছিল। আমি জানতে চাইলাম সে এখানে কী করছে।"

"কয়েক ঘণ্টা পর তার দেহরক্ষীরা আমার রুমের দরজায় টোকা দিল। বলল যে সাদি তার রুমে আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। আমি ভাবলাম এখানেই হয়তো আমার জীবনের শেষ। তার সঙ্গে আমার কথাবার্তা হলো। পরে সে বললো যে এই প্রথম কেউ তার সঙ্গে এতোটা খোলামেলা কথা বলেছে। সেদিনের পর থেকে আমরা দুজন ভাল বন্ধু হয়ে গেলাম।"

সাদি আল গাদ্দাফি খুব একটা ভাল ফুটবলার ছিলেন না। তবে নিজেকে উন্নত করার জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করছিলেন।

আরো পড়তে পারেন:

"অনুশীলনের সময় আপনি যদি কারো সামনে পড়ে যান, আপনি হয়তো লাথি খেতে পারেন। তারপরেও আপনি খেলা চালিয়ে যাবেন। সাদিও এটা মেনে নিয়েছিল। অন্যরাও বোকা ছিল না। তারা জানতো যে তার দেহরক্ষীরা কার পার্কে বসে আছে," বলেন জোকো ক্যালাচ।

"সাদি যে লিবিয়ার বাইরে - এটাই ছিল তার জন্য বড় ধরনের স্বাধীনতা। সে একজন স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবন যাপন করতে পারছিল। এবং এমন একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে যার ছিল প্রচুর অর্থ।"

সাদিকে নিয়ে খেলার মাঠে যতটা না আলোচনা ছিল, তার চেয়েও বেশি আলোচনা ছিল মাঠের বাইরে তার কর্মকাণ্ডের জন্য। আর সেটা ছিল তার বিলাস বহুল জীবন যাপনের কারণে।

জে বথরয়েড বলেন, "সে একদিন আমাকে কল করলো। জানতে চাইল আমি তার সঙ্গে শপিং-এ যেতে চাই কিনা। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। আমরা তখন একটা এয়ারপোর্টে চলে যাই। সে তখন বললো কেনাকাটার জন্য সে আজ মিলানে যাবে।"

"তার একটা ব্যক্তিগত জেট ছিল। সেটা দিয়ে আমরা মিলানে চলে গেলাম। সেখানে তার এক বন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। ওই পার্টিতেই আমার স্ত্রীর সঙ্গে প্রথম দেখা। সাদি প্রচুর খরচ করতো। তার সঙ্গে থাকতো একজন সুটকেস-ধারী ব্যক্তি যাতে প্রচুর নগদ অর্থ থাকতো।"

জে বথরয়েডের বিয়ের সব খরচও দিয়েছিলেন সাদি আল গাদ্দাফি।

পেরুজা ক্লাবের অনুশীলনে সাদি গাদ্দাফি।
ছবির ক্যাপশান, পেরুজা ক্লাবের অনুশীলনে সাদি গাদ্দাফি।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিলেন জোকো ক্যালাচও। বললেন,"সেটা ছিল ক্রিসমাসের ছুটির আগে শেষ ম্যাচ। সাদি আমাকে বললো যে খেলার পর আমরা মিলানে চলে যাবো এবং সেখানে কয়েক রাত থাকবো। আমাদের হাতে ছিল দশ দিনের অবসর।"

"আমরা প্লেনে করে মিলানে চলে গেলাম। পরদিন সকালে সে আমাকে বললো চলে বাহামা যাই। আমি বললাম, না না আমি বাহামা যেতে পারবো না, কোন কাপড় চোপড় আনিনি। তখন সে বললো এটা নিয়ে চিন্তা করো না, ওখানে গিয়ে আমরা সবকিছু কিনে ফেলবো।"

আল সাদি কিন্তু তখনও পেরুজার হয়ে কোনো ম্যাচে খেলার সুযোগ পাননি। কিন্তু ২০০৪ সালে পেরুজা যখন ইউভেন্টাসের মুখোমুখি হলো তখন তার জীবনে এলো বড় পরিবর্তন।

পেরুজা এক-শূন্য গোলে এগিয়ে গেল। তার পর ইউভেন্টাসের একজন খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখিয়ে বের করে দেওয়া হলো মাঠের বাইরে। আহত হলেন জে বথরয়েড। তখন সাদিকে মাঠে নামানোর দারুণ সুযোগ পেয়ে গেলেন পেরুজার ম্যানেজার। শেষ পর্যন্ত ওই ম্যাচে তারা জয়ী হলো।

এটাই ছিল পেরুজার হয়ে সাদির একমাত্র ম্যাচ। তবে ক্লাবের অন্যান্য খেলোয়াড়ের জন্য ছিল একটা বোনাসের মতো।

জে বথরয়েড বলেন, "কারো যখন খেলায় অভিষেক হয় তখন সে সবাইকে খাওয়াতে নিয়ে যায়। সাদির অভিষেক হওয়ার পর সে সবাইকে মার্সিডিজ গাড়ি কিনে দিতে চাইল।"

সাদির পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কিন্তু তিনি ইতালির আরো কিছু ক্লাবেও গিয়েছিলেন। কিন্তু খেলতে পেরেছিলেন আরো একটি ম্যাচ। তার পর ২০০৭ সালে তিনি লিবিয়াতে ফিরে যান।

২০১১ সালে গাদ্দাফির পরিবারের ভাগ্য বদলে যেতে শুরু করে। আরব দেশগুলোতে আরব বসন্ত নামে যে আন্দোলন শুরু হয় তাতে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যায় লিবিয়াতে এবং গাদ্দাফি সরকারের পতন ঘটে।

এই পরিবারের ব্যাপক দুর্নীতি আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা চলে আসে আন্তর্জাতিক আলোচনায়। ২০১১ সালে বিবিসির এক অনুসন্ধানে দেখা যায় যে সাদি শত শত প্রতিবাদকারীকে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

ওই প্রতিবেদনে একজন বলেছেন, সাদি আল গাদ্দাফি প্রতিবাদকারীদের আরো একদিন সময় দেওয়ার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন যে এর মধ্যে যদি কোন পরিবর্তন না হয় তখন তাদের ওপর গুলি চালাতে।

পেরুজার হয়ে মাত্র একটি ম্যাচে খেলেন সাদি আল গাদ্দাফি।
ছবির ক্যাপশান, পেরুজার হয়ে মাত্র একটি ম্যাচে খেলেন সাদি আল গাদ্দাফি।

আরো পড়তে পারেন:

বিবিসির রিপোর্টার সাদির সঙ্গেও কথা বলেছিলেন। তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, "তারা পুলিশ স্টেশনে হামলা চালাতে শুরু করে। সেখান থেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যায়। তখন আমাদের জন্য পরিস্থিতি খুব অনিরাপদ হয়ে পড়ে।"

সেসময় সাদি সম্পর্কে যেসব খবর আসতে থাকে বাইরের দুনিয়ায় সেসব সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না তার সতীর্থ খেলোয়াড়দের।

জোকো ক্যালাচ বলেন, "আমি তো সবকিছু জানতাম না। আমি তাকে একজন ব্যক্তি হিসেবে চিনতাম। আমার কাছে সে ছিল বন্ধু।"

পরে গাদ্দাফি সরকারের পতন ঘটে এবং গাদ্দাফি নিহত হন। লিবিয়া থেকে পালিয়ে যান সাদি।

কিন্তু ২০১৪ সালে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয় এবং এর পর থেকে তিনি সেখানেই আটক রয়েছেন। তিনি যে একসময় পেরুজার শার্ট পরে ফুটবল খেলেছেন অনেকের কাছেই এখন তা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা।