বাংলাদেশে প্রচলিত এবং ইসলামী ধারার ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য কী

ইসলামী ধারার ব্যাংকে টাকা বিনিয়োগ করতে চান অনেকে
ছবির ক্যাপশান, ইসলামী ধারার ব্যাংকে টাকা বিনিয়োগ করতে চান অনেকে
    • Author, ফারহানা পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

বাংলাদেশে এতদিন প্রচলিত ধারার ব্যাংকিং করছিল এমন একটি ব্যাংক তার নাম পরিবর্তন করে ইসলামী ধারার ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছে।

নতুন বছরের শুরু থেকে পূর্ণাঙ্গ শরীয়াহভিত্তিক ইসলামিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছে এনআরবি গ্লোবাল নামের এই ব্যাংকটি। তাদের নতুন নাম হয়েছে 'গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক।'

সম্প্রতি এরকম দু'টি ব্যাংক ইসলামী ধারার ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করায় বাংলাদেশে এ ধরনের ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে ১০-এ উঠেছে।

ইসলামী ব্যাংক এবং প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য কী?

বাংলাদেশে সম্প্রতি প্রচলিত ধারার বেশ কিছু ব্যাংকে ইসলামী ধারার ব্যাংকের একটি 'উইণ্ডো' খোলা হয়েছে।

এদের মূল পার্থক্যটা কী - জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষক তাসনিমা খান বলছিলেন, মূল পার্থক্যের জায়গাটা হচ্ছে সুদ এবং মুনাফার হিসেবের ক্ষেত্রে।

তিনি বলছিলেন "মূল ধারার ব্যাংকিং এ সুদের বা ইন্টারেস্টের বিষয়টা থাকে। আমরা যখন ব্যাংকে টাকা জমা রাখি তখন একটা নির্দিষ্ট হারে সুদ দেয়াই হচ্ছে। সেখানে ব্যাংকের লাভ বা ক্ষতি হোক আমরা যারা টাকা জমা রাখছি আমাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় হয় না। কিন্তু ইসলামে যেহেতু সুদকে হারাম বলা হয়ে থাকে তাই এটা অনেকের কাছে অনেকটা গ্যাম্বলিং এর মত"।

মূল পার্থক্য সুদ ও লভ্যাংশের

তাসনিমা খান বলছিলেন "ইসলামের ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে এটা একটা শেয়ারিং মেথড হবে। 'প্রফিট-লস-শেয়ারিং' অর্থাৎ ব্যাংক যেহেতু আমার কাছ থেকে আমানত রাখছে, ব্যাংকের যদি লাভ হয় তাহলে আমার আমানতের উপর আমি লভ্যাংশ পেতে পারি। কিন্তু ব্যাংকের যদি ক্ষতি হয় তাহলে আমি লভ্যাংশ পাওয়ার জন্য যোগ্য হব না। এটাই প্রচলিত এবং ইসলামী ধারা ব্যাংকের মধ্যে মূল পার্থক্য"।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ঢাকায় ব্যাংক পাড়া বলে পরিচিত মতিঝিল এলাকা
ছবির ক্যাপশান, ঢাকায় ব্যাংক পাড়া বলে পরিচিত মতিঝিল এলাকা

ইসলামী ধারার ব্যাংক পিএলএস অর্থাৎ'প্রফিট-লস-শেয়ারিং' এ চলে কিন্তু ট্র্যাডিশনাল ব্যাংক বা প্রচলিত ব্যাংকে এটা একটা স্টেটেড রেট থাকে।

একই ব্যবস্থা দেখা যায় ব্যাংক থেকে ঋণের ক্ষেত্রেও।

"ঋণ করলে সেই টাকা আমি লাভজনক ভাবে কোথাও ব্যবহার করতে পারছি কিনা সেটা কিন্তু প্রচলিত ব্যাংক দেখবে না। তারা একটা নির্দিষ্ট হারে সুদ কেটে নেবে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকগুলোতে সেই ব্যবস্থা নেই" বলছিলেন তিনি।

মূলধারার ব্যাংকে প্রফিট মেকিং বা মুনাফা করাই মূল উদ্দেশ্য।

কিন্তু ইসলামী ব্যাংকগুলোতে প্রফিটের বিষয়টা সেভাবে প্রাধান্য দেয়া হয় না।

বিশ্বের যেসব দেশে ইসলামী ধারার ব্যাংকিং ব্যবস্থা আছে তারা এভাবেই পরিচালনা করে।

ইসলামী ধারার ব্যাংকিংএর কয়েকটি দিক

মুদারাবা কনসেপ্ট- মুনাফার অংশীদারি

মুরাবাহা- লাভে বিক্রি (লোনের ক্ষেত্রে)

মুসারাকা- লাভ লোকসানের ভাগাভাগি

আর এই লাভ লোকসানের ভাগাভাগির ক্ষেত্রে ইসলামী ধারা মানা হয় না বলে মনে করেন অনেকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি নুরুল আমিন বলছিলেন, দুই ধারার ব্যাংকের একটা মিল হল তাদের কর্তৃপক্ষ বা রেগুলেটরি এক অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোথাও ইসলামী কোন উইং নেই।

মি. আমিন বলছিলেন, "ইসলামী ধারা ব্যাংকে লাভ বা ক্ষতির উপর মুনাফার অংশ হেরফের হতে পারে। আগে থেকে কোন কিছু নির্দিষ্ট থাকবে না। কিন্তু আমাদের দেশে ইসলামী ব্যাংকে আগে থেকেই জানা যায় রেট, যে আমানতকারী কত শতাংশ মুনাফা পাবে"।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

কেন জনপ্রিয় হচ্ছে ইসলামী ধারার ব্যাংক

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে যেভাবে ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা করা হয়ে থাকে সেটা উদ্বেগের।

বাংলাদেশে এগুলো যেভাবে পরিচালিত হয় সেখানে পূর্ণাঙ্গ ভাবে ইসলামী ধারায় পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে - বলছেন তারা।

আমাদের দেশের যারা ইসলামী চিন্তা ধারায় বিশ্বাস করেন, তাদের কাছ মনে হতে পারে ব্যাংকে টাকা রাখা হারাম।

তাসনিমা খান বলছিলেন "বেশির ভাগ মানুষের যে চিন্তাধারা সেটাতে তারা মনে করে এই টাকাটা বিনিয়োগ করা হচ্ছে এবং সেখান থেকে রিটার্ন পাচ্ছেন। অর্থাৎ তারা এটাকে গ্যাম্বলিং মনে করেন না। সেই অর্থটাকে তারা বৈধ হিসেবে মনে করে। "

:"এটাতে তাদের একটা স্বস্তির জায়গা তৈরি করে। এর ফলেই প্রচলিত ব্যাংকগুলো তাদের ইসলামী উইনডো ও শাখা রাখছে ইসলামী ব্যাংকের"।

বাংলাদেশে যে দশটি ইসলামী ব্যাংক রয়েছে

ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটিজ ইসলামী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক। এর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করেছে।

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক নাম পরিবর্তন করে আজ থেকে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক করা হয়েছে।

নতুন বছরের শুরু থেকে পূর্ণাঙ্গ শরীয়াহভিত্তিক ইসলামিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করছে ব্যাংকটি।

পাশাপাশি ইসলামি ধারার সেবার জন্য প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ৮০টির মতো শাখা ও উইন্ডো রয়েছে।