মুরাদনগরে হিন্দু বাড়িঘরে হামলা: ধর্ম অবমাননা নাকি রাজনীতি?

হামলার শিকার একটি বাড়ি
ছবির ক্যাপশান, হামলার শিকার একটি বাড়ি
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

ঢাকার কাছে কুমিল্লার মুরাদনগরের সম্প্রতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি ঘর, উপাসনালয়ে হামলা এবং ভাংচুর নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে।

বলা হচ্ছে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়াকে কেন্দ্র করে এই হামলা হয়েছে, যে স্ট্যাটাসকে ইসলাম ধর্মের অবমাননা হিসেবে দেখেছেন হামলাকারীরা।

কিন্তু মুরাদনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান তালুকদার বলছেন, এখন পর্যন্ত যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে তাতে ধর্ম অবমাননার বিষয় নেই বরং স্থানীয় রাজনীতির উপাদান আছে। তবে পূর্নাঙ্গ তদন্ত শেষেই বলা যাবে কি হয়েছিলো বা কেনো হয়েছিলো।

মি. তালুকদার জানান, রবিবার সংঘটিত ওই ঘটনার সাথে জড়িত পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে এবং পুরো ঘটনার তদন্ত চলছে।

কী ঘটেছিল রোববার:

ঘটনাস্থল মুরাদনগর উপজেলার পূর্ব ধইর ইউনিয়নের কোরবানপুর গ্রামে সোমবার গিয়েছিলেন কুমিল্লার সাংবাদিক গাজীউল হক সোহাগ।

মি. হক বলছেন, ওই গ্রামের অধিবাসী কিশোর দেবনাথ কিষান, যিনি ফ্রান্সে বসবাস করছেন, তিনি গতস শনিবার দুপুরে ফেসবুকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে সমর্থন করে স্ট্যাটাস দেন। ওই স্ট্যাটাসে একমত পোষণ করে মন্তব্য করেন তার প্রতিবেশী শংকর ও অনিল নামে দু ব্যক্তি।

এতে আপত্তি জানিয়ে স্থানীয়রা সেখানে বিক্ষোভ মিছিল করে। রাতেই শংকর ও অনিলকে আটক করে পুলিশ। পরদিন রোববার তাদের আদালতে পাঠানো হয়।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

আরেকটি বাড়ি
ছবির ক্যাপশান, আরেকটি বাড়ি

পরিস্থিতি শান্ত করতে মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গুরা থানার ওসি রোববার বিকেলে কোরবানপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সম্প্রীতি সমাবেশ ডাকেন, যেখানে স্থানীয় ইসলাম ধর্মের নেতৃস্থানীয়রা উপস্থিত ছিলেন।

সেই সমাবেশ থেকেই একদল লোক উঠে গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বনকুমার শিবের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে।

আরেকটি দল শংকর দেবনাথের বাড়িতে গিয়ে হামলা ও মন্দিরে আক্রমণ করে।

পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন গিয়ে চেয়ারম্যানের বাড়ির আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

গাজীউল হক বলছেন, রবিবারের হামলায় ৮/১০ টি বাড়িঘর ভাংচুর করা হয়।

পরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পক্ষ থেকে তিনটি মামলা হয়, যেখানে ২৯৬ জনকে আসামী করা হয়।

বেশ কয়েকটি বাড়িতে হামলা হয়
ছবির ক্যাপশান, বেশ কয়েকটি বাড়িতে হামলা হয়

কী লিখেছিলেন কিশোর দেবনাথ

কিশোর দেবনাথ কিষান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ফ্রান্সে যেদিন একজন শিক্ষককে জবাই করে হত্যার ঘটনা ঘটে, সেদিন ফরাসি প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন 'ফ্রান্সের ইতিহাস ও সংস্কৃতি যারা মানতে পারবে তারাই থাকবে। বাক স্বাধীনতার ওপর হামলা যারা করবে তাদের ওপর কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি'। আমি সেটিকে সমর্থন করে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম ফেসবুকে"।

কিশোর দেবনাথ জানাচ্ছেন, তার ওই স্ট্যাটাসের সাথে একমত হয়ে সেখানে মন্তব্য করেন তার দূরসম্পর্কের কাকা শংকর দেবনাথ।

মি. দেবনাথ বলছেন, শুক্রবার থেকেই তিনি ফোন পেতে শুরু করেন এবং তাকে জানানো হয় যে তার নাম এলাকায় ভাইরাল হয়ে গেছে।

কিশোর দেবনাথের ফেসবুক পোস্টেই নানা ধরণের হুমকি ধামকি দিয়ে নানা মন্তব্য আসতে থাকেন তারই দীর্ঘদিন পরিচিত অনেকের কাছ থেকে।

"যারা হুমকি দিচ্ছিলো এমন কয়েকজনকে আমি ইনবক্সে অনুরোধও করেছিলাম যে ভাই তোমরা এটা করোনা। আমি ফ্রান্সে থাকি, ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছি। কিন্তু তারা তাদের প্রচার চালাতেই থাকে", বলছিলেন মি. দেবনাথ।

তবে কাদের সাথে তার এই কথা হয়েছে তাদের কারও নাম তিনি প্রকাশ করতে রাজী হননি।

যেভাবে ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে

পুলিশ ও স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি (যারা নাম প্রকাশ করতে রাজী হননি) জানিয়েছেন, মূলত কিশোর দেবনাথেরই এক বন্ধু প্রথমে তার ফেসবুক পোস্টে কমেন্ট করেন ও পরে আরও অনেককে ট্যাগ করেন।

এভাবেই এলাকার অনেককে ট্যাগ করে শেয়ার করতে থাকেন যে, ইসলামের নবীর অবমাননাকে সমর্থন করছেন কিশোর দেবনাথ, যা নিয়ে ওই এলাকা সরগরম হয়ে ওঠে ।

যদিও পরে তারা তাদের ফেসবুক থেকে সব মুছেও ফেলেন। কিন্তু এর মধ্যে আরেকদল ব্যক্তি মিছিল আয়োজন করেন।

তাদেরই একটি অংশ সরাসরি ওই হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলো বলে অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে গ্রামটি হিন্দু অধ্যুষিত এবং ভোটারদের বেশিরভাগও হিন্দু ফলে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেও দু দফায় চেয়ারম্যান হয়েছেন বনকুমার শিব।

এটিই তার বাড়িতে হামলার একটি কারণ বলে মনে করছেন কেউ কেউ, যদিও পুলিশ বলছে তদন্ত শেষ হলেই তারা এসব বিষয়ে মন্তব্য করতে পারবেন।