করোনাভাইরাস: চীনে চুল রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক সঙ্কটে পশ্চিমবঙ্গের যে এলাকা

স্বামীর সঙ্গে মিলে পরচুলার কাজ করছেন পুতুল বেরা।
ছবির ক্যাপশান, স্বামীর সঙ্গে মিলে পরচুলার কাজ করছেন পুতুল বেরা।
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা
  • Published

কলকাতা থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ভগবানপুর এলাকা। সৈকত শহর দীঘা যাওয়ার পথের প্রায় ১৩ কিলোমিটার ভেতরে।

আর চীনের উহান প্রদেশ থেকে এই জায়গাটার দূরত্ব ঠিক ২ হাজার ৭৯৯ কিলোমিটার।

তবে উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের প্রভাব সরাসরি এসে পড়েছে ভগবানপুরেরই বাসিন্দা দুই গৃহবধু - পুতুল বেরা আর রীতা মাইতিদের ঘরে।

"আমরা তা বুঝি নি যে ভাইরাস হবে। প্রায় এক লাখ টাকার চুল কিনে ফেলেছি। এভাবে ডুবতে বসব বুঝি নি," বলছিলেন রীতা মাইতি।

আর পুতুল বেরার ৪০ হাজার টাকার কাঁচামাল, অর্থাৎ চুল বাড়িতে কেনা রয়েছে, তৈরি করে বড় ব্যবসায়ীদের কাছে দিয়েছেন এক লক্ষ টাকার মাল।

"সেই টাকা এখনও পাই নি। তারা চীনে মাল বিক্রি করতে পারলে তবে আমাদের টাকা দেবে," বলছিলেন মিসেস বেরা।

এদের মতোই এই এলাকার কয়েক লাখ মানুষ মাথার চুল থেকে পরচুলা বানানোর পেশায় যুক্ত।

চীনে রফতানির জন্য তৈরি পরচুলা
ছবির ক্যাপশান, চীনে রফতানির জন্য তৈরি পরচুলা

আঁচড়ানোর সময়ে চিরুনিতে যে চুল উঠে আসে, সেটাই কিনে নেয় ব্যবসায়ীরা।

ভারতের নানা জায়গা থেকে ট্রেন বা বিমানে সেই চুল পৌঁছায় ভগবানপুর বা চন্ডীপুরের গৃহস্থের ঘরে বা কারখানায়। সবথেকে বেশি দামী চুল আসে পাঞ্জাব আর কাশ্মীর থেকে।

ওই চুল পরিষ্কার করে, আঁচড়িয়ে, ধুয়ে, রোদে শুকিয়ে, মাপ মতো কেটে তা গোছা করে তৈরি হয় রফতানির জন্য।

আর সবটাই রফতানি হত চীনে। কিন্তু সেই ব্যবসা এখন সম্পূর্ণ বন্ধ।

ভগবানপুর বাস স্ট্যান্ডেই চুলের ব্যবসায়ী শেখ হাসিফুর রহমানের অফিস আর কারখানা।

বিশাল বড় একটি হলঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল খাঁ খাঁ করছে অন্য সময়ে গম গম করতে থাকা ঘরটা - ওটাই মি. রহমানের কারখানা, যেখানে ঝাড়াই বাছাই করে চীনের রফতানি করার জন্য স্তূপ করে রাখা রয়েছে নানা মাপের চুলের বান্ডিল - ৬ ইঞ্চি থেকে ২৬ ইঞ্চি পর্যন্ত।

ভারতের নানা প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করে আনা চুল বাছাই করে তৈরি করা হয় পরচুলার জন্য
ছবির ক্যাপশান, ভারতের নানা প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করে আনা চুল বাছাই করে তৈরি করা হয় পরচুলার জন্য

মি. রহমানের কথায়, "করোনা ভাইরাসের জন্য ব্যবসায়িক যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে চীনের সঙ্গে। সেখান থেকে কেউ আসছেন না। যার ফলে এখানকার ৮০ শতাংশ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। আমি সংস্থার মালিক ঠিকই, কিন্তু আমারও ব্যবসা সম্পূর্ণ বন্ধ।"

মি. রহমানের যেমন বড় ব্যবসা, তেমনই মানুষের চুল নিয়েই কিছুটা ছোট কারবার করেন গণেশ পট্টনায়ক।

"করোনা ভাইরাসের ফলে টাকা পয়সা সবই আটকে আছে, কোনও পেমেন্ট দিতে পারছে না কেউ। ব্যবসাও প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখে। বলছে তো ১৫ - ২০ তারিখের মধ্যে বাকি টাকা পাওয়া যাবে। জানি না ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে কী হবে," বলছিলেন মি. পট্টনায়ক।

চুলের ব্যবসাই ভগবানপুরের মতো এলকাগুলিতে আয়ের প্রধান উপায়। আর সেই ব্যবসা চীনে করোনাভাইরাসে প্রকোপ শুরু হওয়ার পরে অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে ।

ভগবানপুর বাজারেই এক দোকানী শেখ সিকান্দারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল।

তিনি বললেন, "আমার তো ছোট পান বিড়ির দোকান। তাতেও ব্যবসা খারাপ হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন ধরে। চুলের ব্যবসা মার খেলে এখানকার সব ব্যবসা - সব দোকানেই তার প্রভাব পড়ছে।"

মানুষের চুল রফতানির ব্যবসা করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকে এলাকার অর্থনীতিতে কতটা বিরূপ প্রভাব ফেলেছে সেটা বোঝাছিলেন প্রজ্জ্বল মাইতি, যিনি একটি রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কের হয়ে সাধারণ মানুষকে আর্থিক লেনদেনে সহায়তা করেন, একজন ব্যাঙ্ক-মিত্র হিসাবে।

পরচুলা তৈরি হয় এই কারখানায়। রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন কারখানা ফাঁকা।
ছবির ক্যাপশান, পরচুলা তৈরি হয় এই কারখানায়। রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন কারখানা ফাঁকা।

মি. মাইতির কথায়, "ভাইরাসের প্রভাব চুল ব্যবসায়ে যেভাবে পড়েছে, তাতে আমাদের লেনদেনও দশভাগের একভাগ হয়ে গেছে। আগে যেখানে দিনে লাখ দশেক টাকার লেনদেন হত - টাকা তোলা, টাকা জমা মিলিয়ে, তা এখন লাখখানেকে এসে ঠেকেছে।"

এলাকার নানা গ্রামে চিকিৎসা করতে যান স্থানীয় ডাক্তার অনুপম সরকার। তিনি বলছিলেন, তার অনেক রোগীই অনুরোধ করছে ডাক্তারের ফি পরে যদি দেওয়া যায় - এতটাই অর্থের অভাব শুরু হয়েছে ভগবানপুর আর লাগোয়া এলাকায়।

কোথায় চীনের উহান প্রদেশ আর কোথায় ভগবানপুর বাজার থেকে আরও বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরের পাজনকুল গ্রাম।

কিন্তু উহানের প্রভাব এই গ্রামেরও ঘরে ঘরে।

এক বস্তা মাথার চুল নিয়ে ঘরে বসেই সেগুলি আলগা করছিলেন রেনুকা মাইতি।

আরও পড়ুন:

জানতে চেয়েছিলাম.. ব্যবসা তো বন্ধ - তবুও চুল ছাড়াচ্ছেন কেন..

জবাব দিলেন, "কেনা হয়ে গেছে চুল। রেখে দিলে তো নষ্ট। তাই বসে না থেকে ছাড়িয়েই রাখি। যদি আবার বাজার খোলে!"

বছরভর এই অঞ্চলে চীনা চুল আমদানিকারকদের ভীড় লেগেই থাকে।

এখান থেকে সরাসরি চুল কিনে নিয়ে যান তারা।

চীনা নববর্ষের আগে সেই যে তারা দেশে ফিরে গেছেন, তারপর আর কেউ আসেন নি।

আর তখন থেকেই রেনুকা মাইতির মতো পূর্ব মেদিনীপুরের এই অঞ্চলের কয়েক লক্ষ মানুষ আশায় দিন গুনছেন যদি আবারও চুলের বাজার চালু হয়।