যুক্তরাষ্ট্রে মদ নিষিদ্ধ করার একশো বছর: যেভাবেই এই উদ্যোগ বিফল হয়েছিল

১৯৩৩ সালে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রে মদপানের অভ্যাসটি এখনো বেশ বিতর্কিত।
ছবির ক্যাপশান, ১৯৩৩ সালে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রে মদপানের অভ্যাসটি এখনো বেশ বিতর্কিত।
Published

যুক্তরাষ্ট্রে মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে।

১৯২০ হতে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধানের ১৮ তম সংশোধনীর মাধ্যমে মদ তৈরি, বিপনন, আমদানি এবং পরিবহন পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল । যুক্তরাষ্ট্রে এই সময়কাল 'প্রহিবিশন যুগ' বলে বর্ণনা করা হয়।

কিন্তু যে উদ্দেশ্যে সরকার এই কাজ করেছিল, কার্যত তার উল্টো ফল হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর অ্যালকোহলের উৎপাদন, বিপনন, বিক্রি পুরোটাই চলে যায় অপরাধী চক্রের হাতে, আর সরকার বঞ্চিত হয় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে।

যার ফলে ১৯৩৩ সালে মাত্র ১৩ বছরের মাথায় এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে মদ নিষিদ্ধ করার সেই উদ্যোগ এভাবেই বিফল হয়। ওই ঘটনার পর আজ পর্যন্ত কোনো প্রধান রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী মদ নিষিদ্ধ করার দাবি আর তোলেনি। আর এরকম একটা ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে মানুষের সমর্থনও একেবারেই নেই।

কিন্তু তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের মদপানের ব্যাপারটি এখনো বেশ বিতর্কিত।

বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে মদপানের জন্য সর্বনিম্ন বয়সসীমা যথেষ্ট উপরে। ২১ বছরের কমবয়সীরা আইনত মদ পান করতে পারে না, তাদের কাছে অ্যালকোহল বিক্রি নিষিদ্ধ।

ইউরোপ বা অন্য অনেক দেশের তুলনায় মদপানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মনোভাবও বেশি রক্ষণশীল। গ্যালপ পোল সম্প্রতি এক জরিপ চালিয়ে দেখেছে এখনো দেশটির প্রতি পাঁচ জনের একজন মনে করে মদ পান নৈতিকভাবে খারাপ।

তবে 'প্রহিবিশন যুগে'র ব্যর্থ চেষ্টা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে এখনো কিছু গোষ্ঠী সক্রিয়ভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে মদ পান নিষিদ্ধ করার জন্য।

'প্রহিবিশন পার্টি' হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল। অনেকের ধারণা, এই দলের মৃত্যু ঘটেছে অনেক আগে। কিন্তু আসলে তা নয়, এটি এখনো সক্রিয়।

জিম হেজেস হচ্ছেন এই দলের কোষাধ্যক্ষ।

ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলনরত নারীরা মদ পান নিষিদ্ধ করারও পক্ষে ছিলেন।
ছবির ক্যাপশান, ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলনরত নারীরা মদ পান নিষিদ্ধ করারও পক্ষে ছিলেন।

'আমরা এই ধারণা এবং এই ইতিহাসকে জীবন্ত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি', বলছেন তিনি। তবে খুব শিগগিরই যে তাদের এই আন্দোলনের পক্ষে বড়সড় জনসমর্থন পাওয়া সম্ভব হবে, সেটা স্বীকার করছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র মদ্যপান নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের গোড়ার দিকে। আন্দোলনকারীরা মূলত মদ্যপানকে অনৈতিক এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করতেন।

মেথডিস্ট চার্চের অনুসারীরা এবং আরও কিছু সংগঠন মদ পান নিষিদ্ধ করার আইনের পক্ষে জনমত গঠনে সহায়তা করে।

মদ নিষিদ্ধ করার আন্দোলনে নারী সমাজ:

ডক্টর জুলিয়া গারনেরি কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির মার্কিন ইতিহাসের সিনিয়র লেকচারার।

তিনি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে এই মদ্যপান বিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রে নারী সমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে উইমেন্স ক্রিশ্চিয়ান টেম্পারেন্স ইউনিয়ন বা ডাব্লিউসিটিইউ বলে সংগঠনটির।

"ওরা মনে করত যে লোকজন কাজ করে যে বেতন পায়, সেটা পরিবারের পর্যন্ত আসে না, তার আগেই ওরা পানশালায় মদ খেয়ে সেই টাকা উড়িয়ে দেয়।"

মদ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত বেশ অজনপ্রিয় হয়ে উঠলো। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার দাবিতে শুরু হলো আন্দোলন।
ছবির ক্যাপশান, মদ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত বেশ অজনপ্রিয় হয়ে উঠলো। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার দাবিতে শুরু হলো আন্দোলন।

মদ খেয়ে বাড়ি আসা স্বামীর হাতে স্ত্রী এবং সন্তানদের নির্যাতিত হওয়ার ঘটনাও ছিল সেসময়ের এক বড় সমস্যা।

যুক্তরাষ্ট্রে মদ নিষিদ্ধ করা আর নারীদের ভোটাধিকারের আন্দোলন চলছিল একই সঙ্গে। প্রহিবিশন আইন পাশ হওয়ার কিছুদিন পরই ১৯ তম সংশোধনীও পাশ হয় যাতে মেয়েদের ভোটাধিকারের সুরক্ষা দেয়া হয়। যে নারীরা সেসময় ভোটাধিকারের পক্ষে আন্দোলন করছিলেন, তারা একই সঙ্গে মদ পান নিষিদ্ধ করারও পক্ষে ছিলেন। কারণ তারা মনে করতেন, নারীদের নির্যাতিত হওয়ার পেছনে পুরুষদের মদের নেশাও ছিল একটি কারণ।

ডক্টর গারনেরির মতে, এই দুটি আইনের মধ্যে অনেক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ডাব্লিউসিটিইউর মতো সংগঠন মনে করতো, পরিবারের সুখ-শান্তি এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য মদ নিষিদ্ধ করার দরকার আছে।

উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের গোড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল সংখ্যায় অভিবাসী আসছিল। এদের মধ্যে ছিল প্রচুর ক্যাথলিক এবং ইহুদি ধর্মাবলম্বী যারা এসেছিল মূলত দক্ষিণ এবং পূর্ব ইউরোপ থেকে। এই অভিবাসীদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ ছিল। ইউরোপ থেকে আসা এই নতুন অভিবাসীদের মধ্যে মদ পানের অভ্যাস ছিল। এরা যেভাবে বিয়ার পান করতো, তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মাবলম্বীদের কাছে ছিল খুবই অস্বাভাবিক ঠেকতো। ক্যাথলিক এবং ইহুদীদের ধর্মীয় রীতি-নীতির মধ্যেই মদ্যপানের ব্যাপার আছে। যদিও সেসব রীতি-নীতি পালনে বাধা দেয়া হতো না, তারপরও মদ পান নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে আসলে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণেরও একটা চেষ্টা ছিল।

নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার দাবিতে আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠলে ১৮তম সংশোধনী বাতিল করতে হয়।
ছবির ক্যাপশান, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার দাবিতে আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠলে ১৮তম সংশোধনী বাতিল করতে হয়।

মদ্যপান নিষিদ্ধ করার ব্যাপারটি কেন ব্যর্থ হয়েছিল

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ যখন শুরু হলো তখন এই মদ্যপান নিষিদ্ধ করার আন্দোলনটি আরো শক্তিশালী হয়। যারা আন্দোলন করছিলেন তারা যুক্তি দিয়েছিলেন যে উৎপাদিত শস্য মদ তৈরি করার চাইতে বরং যুদ্ধের কাজে লাগানোটাই বেশি দরকার। অন্যদিকে যেসব ভাটিখানায় বিয়ার তৈরি করা হতো, সেগুলোর মালিক ছিল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জার্মান অভিবাসী বা তাদের বংশধররা। কাজেই অ্যালকোল তৈরি বা পান করা, সেটাকে 'আমেরিকা-বিরোধী' বলে চিত্রিত করা খুব সহজ ছিল।

কিন্তু মদপান নিষিদ্ধ করার এই উদ্যোগ একেবারেই ব্যর্থ হয়েছিল।

কারণ শুরু থেকেই এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষ, বিশেষ করে যারা সচ্ছল এবং সুবিধাভোগী, তারা এই আইন একেবারেই মানতো না। এমনকি প্রেসিডেন্ট ওয়ারেন হার্ডিং নিজেও নাকি হোয়াইট হাউজে প্রকাশ্যে মদ পরিবেশন করতেন।

শেষ পর্যন্ত দেখা গেল মদ নিষিদ্ধ করার ব্যাপারটি বেশ অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

১৯২০ এর দশকে নিউ ইয়র্কে জব্দ করা বিয়ার নর্দমায় ফেলে নষ্ট করা হচ্ছে।
ছবির ক্যাপশান, ১৯২০ এর দশকে নিউ ইয়র্কে জব্দ করা বিয়ার নর্দমায় ফেলে নষ্ট করা হচ্ছে।

অন্যদিকে যেরকম বেআইনিভাবে মদ কেনাবেচা হচ্ছিল তাতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে শুরু করল।

১৯৩০ সালে ওয়াল স্ট্রীটের শেয়ার বাজারে ধস নামলো, শুরু হলো মহামন্দা। ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়েই প্রতিশ্রুতি দিলেন যে তিনি নির্বাচিত হলে মদের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন। ১৯৩২ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার এক বছর পরই তিনি তুলে নিলেন এই নিষেধাজ্ঞা।

তবে সেই বিফল চেষ্টার শত বছর পরও যুক্তরাষ্ট্রে কিছু মানুষ এখনো স্বপ্ন দেখেন, কোন একদিন মদ আবার নিষিদ্ধ হবে।

মদ্যপান নিষিদ্ধ করার পক্ষে সবচেয়ে সক্রিয় যে দলটি, সেই প্রহিবিশন পার্টির ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন জিম হেজেস। তিনি ৫ হাজার ৬শ ভোট পান। এর আগে ২০১২ সালের নির্বাচনে পাওয়া ৫১৮ ভোটের চেয়ে অনেক বেশি, বলছেন তিনি।

তবে মিস্টার হেজেস স্বীকার করছেন যে যুক্তরাষ্ট্রে যদি আবার মদ্যপান নিষিদ্ধ করতে হয় জনমতে একটা পরিবর্তন আসতে হবে।

তিনি বলেন, "যদি আমরা মানুষের সমর্থন ছাড়া উপর থেকে এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেই, এটা আসলে কার্যকর করা যাবে না।"