টাইফুন হাগিবিস: আবহাওয়া ভূমিকা রেখেছিল যে পাঁচটি বড় খেলার আসরে

ফাইনাল খেলার দিনে প্রবল বজ্রপাত এবং বৃষ্টির কারণে পেরুজিয়ার স্টাডিও রেনাটো কুরি আক্ষরিক অর্থেই ভিজে ছুপছুপে হয়ে গিয়েছিল।
ছবির ক্যাপশান, ফাইনাল খেলার দিনে প্রবল বজ্রপাত এবং বৃষ্টির কারণে পেরুজিয়ার স্টাডিও রেনাটো কুরি আক্ষরিক অর্থেই ভিজে ছুপছুপে হয়ে গিয়েছিল।
Published

টাইফুন হাগিবিসের কারণে রাগবি ওয়ার্ল্ড কাপের দুইটি খেলা স্থগিত করা হয়েছে আর রবিবারের অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাপানের গ্রাঁ প্রিঁ'ও হুমকির মুখে পড়েছে। কিন্তু ঝড় বা আবহাওয়ার কারণে খেলার কোন আসর পণ্ড হওয়ার মতো ঘটনা এবারই প্রথম নয়।

এখানে আমরা অতীতের এমন কিছু ঘটনার দিকে ফিরে তাকিয়েছি, আবহাওয়ার যেসব খেলার আসরে জটিল ভূমিকা রেখেছিল।

২০০২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ফাইনাল

২০০২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ফাইনাল দুইবারের চেষ্টাই কলম্বোর আবহাওয়ার কারণে বাতিল হয়ে যায়। ফলে শিরোপা পায় উভয় দলই
ছবির ক্যাপশান, ২০০২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ফাইনাল দুইবারের চেষ্টাই কলম্বোর আবহাওয়ার কারণে বাতিল হয়ে যায়। ফলে শিরোপা পায় উভয় দলই

''এটা একেবারেই বোকার মতো একটা ব্যাপার,'' ২০০২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে ঘোষণা দিয়েছিলেন ভারতীয় সাবেক উইকেট কিপার ফারোখ ইঞ্জিনিয়ার।

স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ভারতের দুইটি ফাইনাল খেলার চেষ্টার ব্যর্থতার পর তিনি বাস্তবিকই বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। দুইবারের চেষ্টাই কলম্বোর আবহাওয়ার কারণে বাতিল হয়ে যায়।

দুই বারেই শ্রীলঙ্কা দুইশর বেশি রান তুলেছিল। প্রথমবারে পাঁচ উইকেটে ২৪৪ রান, পরের বারে ৭ উইকেটে ২২২ রান। কিন্তু দুইবারের প্রবল বৃষ্টির কারণে কয়েক ওভার খেলার পর আর ভারত সেই রানের জবাব দিতে পারেনি।

ওই সময়ে আইন ছিল যে, কোন ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে বিবেচনা করতে হলে, উভয় তরফে অন্তত ২৫ ওভার খেলা হতে হবে। ফলে ওই ফাইনাল খেলাটি শেষ পর্যন্ত বাতিল বলে ঘোষণা করা হয় এবং উভয় দলকেই শিরোপা দেয়া হয়। যা দুই দলের জন্যই হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিরক্তির আর নিরুপায় একটা ব্যাপার।

১৯৯৯-২০০০ সিরি আ ক্লাইম্যাক্স

আরো পড়তে পারেন:

এতো পানি জমে গিয়েছিল যে, বল যেন মাঠে গড়াতেই চাইছিল না।
ছবির ক্যাপশান, এতো পানি জমে গিয়েছিল যে, বল যেন মাঠে গড়াতেই চাইছিল না।

১৯৯৯-২০০০ মৌসুমের শেষ আট পর্বে যাওয়ার দৌড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী লাজিওর চেয়ে ইতালির শীর্ষ ক্লাব ইউভেন্তুস নয় পয়েন্ট এগিয়ে ছিল।

কিন্তু এরপরেই উল্টো ঘটনা ঘটতে শুরু করলো।

ইউভেন্তুসের কাছে প্রথম মিলানের পরাজয়, লাজিও এবং হেলাস ভেরোনার পরাজয়ের পর ধারণা করা হচ্ছিল শিরোপা নেয়াটা শুধুমাত্র চূড়ান্ত দিনের জন্য অপেক্ষা মাত্র। কারণ লাজিও যত চেষ্টাই করুক না কেন, পেরুজিয়ায় জয় অনেকটা নিশ্চিত।

কিন্তু ফাইনাল খেলার দিনে প্রবল বজ্রপাত এবং বৃষ্টির কারণে পেরুজিয়ার স্টেডিয়াম স্টাডিও রেনাটো কুরি আক্ষরিক অর্থেই ভিজে ছুপছুপে হয়ে গিয়েছিল।

এতো পানি জমে গিয়েছিল যে, বল যেন মাঠে গড়াতেই চাইছিল না। ইউভেন্তুসের তারকা জিনেদিন জিদান, আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো এবং এডগার ডেভিডস তাদের স্বাভাবিক পাসিং গেম খেলার কোন সুযোগই পাননি।

''প্রবল বৃষ্টি, শিলাপাত, গর্জন আর বজ্রপাতের মধ্যে ইতালির পেরুজিয়ার কোথাও ফুটবল খেলা হচ্ছে বলে আর মনে হয়নি'' লিখেছিল নিউইয়র্ক টাইমস।

চাপ সহ্য করতে না পেরে তারা ১-০ গোলে হেরে যায়। স্ভেন গোরান এরিকসনের নেতৃত্বে লাজিওরা পরে রেজিনা ৩-০ গোলে হারিয়ে তাদের দ্বিতীয় শিরোপা জয় করে।

২০১০ সালের শীতকালীন অলিম্পিক

২০১০ সালের ভ্যাঙ্কুভার অলিম্পিকে তুষার এবং বরফের ওপর নির্ভর করে যে খেলাগুলো হয়, সেগুলোর আয়োজন করা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
ছবির ক্যাপশান, ২০১০ সালের ভ্যাঙ্কুভারে শীতকালীন অলিম্পিকে তুষার এবং বরফের ওপর নির্ভর করে যে খেলাগুলো হয়, সেগুলোর আয়োজন করা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

ক্যানাডার ভ্যাঙ্কুভারে ২০১০ সালের শীতকালীন অলিম্পিকে খারাপ আবহাওয়া সমস্যা হয়ে আসেনি, বরং বিষয়টি যেন ছিল তার উল্টো।

সে বছর অনেকটা অস্বাভাবিকভাবে শীতের সময়েও ক্যানাডার ঐ শহরটির তাপমাত্রা ছিল শূন্যের সাত ডিগ্রি সেলসিয়াস ওপরে।

এর ফলে তুষার এবং বরফের ওপর নির্ভর করে যে খেলাগুলো হয়, সেগুলোর আয়োজন করা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

তখন তিন ঘণ্টার দূরত্ব থেকে বিমানে করে তুষার এনে ফেলা হতে থাকে, কামানে করে বরফ এবং পানি ছিটানো হয়।

যতই খেলার সময় ঘনিয়ে আসছিল, আরো অনেক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। যার মধ্যে ছিল হাজার হাজার পরিমাণে খড়ের বেল নিয়ে পর্বতের ঢালুতে বিছানো এবং সেগুলো কৃত্রিম তুষার দিয়ে ঢেকে দেয়া।

এসব পদক্ষেপে যদিও কাজ হয়েছিল, কিন্তু এর ফলে স্থানীয়দের মধ্যে বেশ কিছু রসিকতার জন্ম হয়েছিল।

২০০১ সালের উইম্বলডন

বৃষ্টি নসাৎ করে দিয়েছিল ব্রিটিশ হেনম্যানের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন
ছবির ক্যাপশান, বৃষ্টি নসাৎ করে দিয়েছিল ব্রিটিশ টিম হেনম্যানের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন

১৯৩৬ সালে ফ্রেড পেরির পর ব্রিটেনের বাসিন্দারা আশা করছিল যে, টিম হেনম্যান আবার উইম্বলডনের পুরুষদের শিরোপা এনে দেবেন।

কিন্তু ১৯৯৮ এবং ১৯৯৯ সালে তিনি আমেরিকান তারকা পিট সাম্প্রাসের কাছে সেমি ফাইনালে হেরে যান।

তবে ২০০১ সালে সাম্প্রাস প্রথমদিকেই ছিটকে যান। ফলে ফাইনালের জন্য তার সামনে একমাত্র চ্যালেঞ্জ ছিল ওয়াইল্ড কার্ড নিয়ে খেলতে আসা গোরান ইভানিসেভিচ। এরপরে সামনে থাকে একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্যাট্রিক রাফটার।

যদিও প্রথম সেটে কিছুটা নার্ভাস হেনম্যান ৫-৭ পয়েন্টে হেরে যান, কিন্তু বিরতির পরে তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ান।

এরপরে তিনি তৃতীয় সেটে ৬-০ আধিপত্য ধরে রাখেন। পরের পনেরো মিনিটেই তিনি চতুর্থ সেটে চলে আসেন।

কিন্তু যখন তিনি খেলায় ২-১ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন, তখন দীর্ঘমেয়াদি বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। তখন সেন্টার কোর্টের ওপরে কোন ছাদ ছিল না।

ফলে খেলোয়াড়দের কোর্ট ছাড়তে হয় এবং পরদিনেও তারা আর সেখানে ফিরতে পারেননি। এই সময়ের মধ্যে ইভানিসেভিচ নিজেকে গুছিয়ে নেন, মনোযোগী হয়ে ওঠেন এবং হেনম্যানের সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে যায়।

ইভানিসেভিচ তার খেলা গুছিয়ে নেন। চতুর্থ সেটে টাই-ব্রেক জয় পান আর পঞ্চম সেটে ৬-৩ পয়েন্টে হেনম্যানকে পরাস্ত করেন।

এটাই ছিল ব্রিটিশ হেনম্যানের জন্য শিরোপার সবচেয়ে কাছাকাছি আসা।

এরপরে ব্রিটেনকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।ঐ বছর অ্যান্ডি মারে পুরুষ এককের শিরোপা জয় করেন।

১৯৭৬ জাপানিজ গ্রাঁ প্রিঁ

১৯৭৬ সালের জাপানিজ গ্র্যান্ড প্রিক্স ছিল নাটকীয়তায় পূর্ণ
ছবির ক্যাপশান, ১৯৭৬ সালের জাপানিজ গ্র্যান্ড প্রিক্স ছিল নাটকীয়তায় পূর্ণ

টাইফুন হাগিবিস এ সপ্তাহে জাপানে আঘাত করলেও, এটাই প্রথম নয় যে জাপানের কোন খেলার আয়োজন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে

২০০৪ এবং ২০১০ সালে বৃষ্টির কারণে জাপানিজ গ্রাঁ প্রিঁ'র (গাড়ির রেস) বাছাই পর্বের খেলা স্থগিত করতে হয়েছিল।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছে ১৯৭৬ সালে, যখন একটি ঝড় ফুজি সার্কিটে আঘাত করেছিল। কিন্তু সেই সময় ফর্মুলা ওয়ানের চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় লড়াই জমে উঠেছিল।

জার্মান গ্রাঁ প্রিঁ দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আগুনে পোড়ার পরেও আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন চ্যাম্পিয়নশিপ লিডার নিকি লাউদা। তিনি তৃতীয় রাউন্ডে টিকে ছিলেন, যার এক ধাপ সামনে ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী জেমস হান্ট।

প্রতিযোগিতার দিনে যে শুধুমাত্র ভারি বৃষ্টিই ছিল তাই নয়, প্রচণ্ড কুয়াশাও ছিল। তা সত্ত্বেও প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়।

কিন্তু একটি মাত্র চক্কর কাটার পরেই একজন রেসার ট্র্যাক থেকে বেরিয়ে যান এবং তার গাড়ি পার্ক করেন। আগুনের ক্ষতের কারণে চোখে জমে থাকা পানি সরাতে চোখের পলক ফেলতে পারছিলেন না, ফলে পরিষ্কারভাবে দেখতেও পারছিলেন না।

''কোন শিরোপার চেয়ে আমার জীবনের মূল্য অনেক বেশী,'' লাউদা নামেরঐ রেসার বলেন সেসময়।

মুকুট জয় করার জন্য হান্টের তখন চতুর্থ স্থানটি দরকার। তিনি গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলেন।

কিন্তু আবহাওয়ার তখনো আরো কিছু খেলা দেখানোর বাকি ছিল।

যখন ট্র্যাক চূড়ান্তভাবে শুকিয়ে যেতে শুরু করলো, হান্ট তখন পিছলে নামতে শুরু করলেন। তিনি সাধ্যমত চেষ্টা করলেন, কিন্তু গাড়ির টায়ারের সমস্যা তাকে পঞ্চম অবস্থানে নিয়ে গেল।

হান্ট এতোটাই রেগে গিয়েছিলেন যে, তিনি একবারও খেয়াল করেন নি, দুইজন চালককে তিনি অতিক্রম করে যাচ্ছেন, তৃতীয় জনকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন এবং ১৯৭৬ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ।