ঘূর্ণিঝড়ের ফণী নামটি কোথা থেকে এলো?

ঘূর্ণিঝড়টি এখন কক্সবাজার থেকে ১২৭০ কিলোমিটার আর মংলা থেকে ১১৯০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে।
ছবির ক্যাপশান, ঘূর্ণিঝড়টি এখন কক্সবাজার থেকে ১২৭০ কিলোমিটার আর মংলা থেকে ১১৯০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে।
    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

ঘূর্ণিঝড় 'ফণী' আরো জমাট বেধে এখন বড় ধরণের ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে, যাকে আবহাওয়াবিদরা বর্ণনা করছেন 'সিভিয়ার সাইক্লোন' হিসাবে।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড়টি এখন কক্সবাজার থেকে ১২৭০ কিলোমিটার আর মংলা থেকে ১১৯০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে।

ঝড়ের কেন্দ্রে বাতাসের গতিবেগ ৯৪ কিলোমিটার।

আরো পড়ুন:

তিনি জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় ফণী এখন ওড়িশার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তবে উপকূলের কাছাকাছি গিয়ে একটু ঘুরতে পারে। ঝড়টির বর্তমান গতি হিসাব করলে সেটি আগামী ৩ বা ৪ মে'র দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশের খুলনা সুন্দরবন এলাকা অতিক্রম করতে পারে। বুধবার নাগাদ পরিষ্কার হয়ে যাবে, ঝড়টি কোন দিকে যাচ্ছে।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ জানান, আগামী ১/২ দিনের মধ্যে গরম কমতে শুরু করবে। শুক্রবার থেকে মেঘ বা বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় ২০১৮ সালে ঘূর্ণিঝড়ের মতো বড় ঝড় বেশি হচ্ছে
ছবির ক্যাপশান, বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় ২০১৮ সালে ঘূর্ণিঝড়ের মতো বড় ঝড় বেশি হচ্ছে

কিন্তু ফণী নামটির অর্থ কী?

ঘূর্ণিঝড় 'ফণী' নাম দিয়েছে বাংলাদেশ।

এর অর্থ সাপ বা ফণা তুলতে পারে এমন প্রাণী। ইংরেজিতে (Fani) লেখা হলেও এর উচ্চারণ ফণী।

কিভাবে এই নামটি এলো?

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা আঞ্চলিক কমিটি একেকটি ঝড়ের নামকরণ করে।

যেমন ভারত মহাসাগরের ঝড়গুলোর নামকরণ করে এই সংস্থার আটটি দেশ। দেশগুলো হচ্ছে: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মায়ানমার, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড এবং ওমান, যাদের প্যানেলকে বলা হয় WMO/ESCAP।

এর সময় ঝড়গুলোকে নানা নম্বর দিয়ে সনাক্ত করা হতো। কিন্তু সেসব নম্বর সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য হতো। ফলে সেগুলোর পূর্বাভাস দেয়া, মানুষ বা নৌযানগুলোকে সতর্ক করাও কঠিন মনে হতো।

এ কারণে ২০০৪ সাল থেকে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোয় ঝড়ের নামকরণ শুরু হয়।

সে সময় আটটি দেশ মিলে মোট ৬৪টি নাম প্রস্তাব করে। সেসব ঝড়ের নামের মধ্যে এখন 'ফণী' ঝড়কে বাদ দিলে আর সাতটি নাম বাকী রয়েছে।

এর আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বা অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলে ঝড়ের নামকরণ করা হতো।

ভারত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়কে সাইক্লোন বলা হলেও আটলান্টিক মহাসাগরীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়কে বলা হয় হারিকেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বলা হয় টাইফুন।

ঘূর্ণিঝড় তিতলির সময় নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের একটি পরিবার
ছবির ক্যাপশান, ঘূর্ণিঝড় তিতলির সময় নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের একটি পরিবার

ঝড়ের নামের তালিকা

বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগর উপকূলের আটটি দেশের প্রস্তাব অনুসারে একটি তালিকা থেকে একটির পর একটি ঝড়ের নামকরণ করা হয়।

আঞ্চলিক এই আটটি দেশ একেকবারে আটটি করে ঝড়ের নাম প্রস্তাব করেছে। প্রথম দফায় মোট ৬৪টি নাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

যেমন ফণী নামটি বাংলাদেশের দেয়া। এরপরের ঝড়ের নাম হবে ভারতের প্রস্তাব অনুযায়ী ভায়ু। তারপরে আরো ছয়টি ঝড়ের জন্য এখনো নাম তালিকায় রয়েছে।

সেগুলো হলো হিক্কা, কায়ার, মাহা, বুলবুল, পাউয়ান এবং আম্ফান।

এই নামগুলো শেষ হয়ে যাওয়ার পর তারা আবার বৈঠকে বসে নতুন নামকরণ করবে।

ফণীর মাধ্যমে শেষ সাইকেল শুরু হলো। এরপরে আরো সাতটি ঝড়ের পর বাংলাদেশ আবার চারটি ঝড়ের জন্য নাম দেবে।

এর আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা নামগুলো ছিল হেলেন, চাপালা ও অক্ষি।

তবে বেশির ক্ষেত্রে ঝড়ের নামকরণে মেয়েদের নামের প্রাধান্য দেখা গেছে।

ঘূর্ণিঝড় মোরায় ক্ষতিগ্রস্ত কক্সবাজারের একটি পরিবার
ছবির ক্যাপশান, ঘূর্ণিঝড় মোরায় ক্ষতিগ্রস্ত কক্সবাজারের একটি পরিবার

ফণী নামটি কোথা থেকে এলো?

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলছেন, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার বৈঠকে বাংলাদেশের এক বা একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অংশ নিয়ে থাকেন। আগে থেকে তারা আলোচনা করে নেন যে, কি নাম হবে।

আবহাওয়া দপ্তরের সাবেক পরিচালক শাহ আলম বলছেন, ''এখন ঝড়ের যেসব নাম আসছে, সেগুলো অনেক আগে ঠিক করা হয়েছিল। এমনকি আমি যতদিন দায়িত্বে ছিলাম, তখন আমাদের কোন নাম প্রস্তাব করতে হয়নি। আগে ঠিক হওয়া নামগুলোই এখনো শেষ হয়নি।''

তিনি জানান, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক বা সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল অংশ নিয়ে থাকে। তারা ঝড়ের নামগুলো করে থাকেন।

পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে সেই তালিকা থেকে ঝড়ের নাম বাছাই করা হয়।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলছেন, ঝড়ের নাম বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা হয়, যাতে সেটি ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা সামাজিক ভাবে কোনরকম বিতর্ক বা ক্ষোভ তৈরি না করে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ২০১৩ সালে একটি ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেয়া হয়েছিল 'মহাসেন।' নামটি প্রস্তাব করেছিল শ্রীলঙ্কাই।

কিন্তু সেখানকার সাবেক একজন রাজার নাম ছিল 'মহাসেন', যিনি ওই দ্বীপে সমৃদ্ধি নিয়ে এসেছিলেন। ফলে এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এমনকি শ্রীলঙ্কার সংবাদমাধ্যমে সেটিকে নামহীন ঝড় বলে বর্ণনা করা হয়। পরবর্তীতে রেকর্ডপত্রে ঝড়টির নতুন নাম নির্ধারণ করা হয় 'ভিয়ারু'।

বাংলাদেশে ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে লণ্ডভণ্ড একটি গ্রাম
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে লণ্ডভণ্ড একটি গ্রাম

কিভাবে ঝড় তৈরি হয়?

সমুদ্রের উষ্ণ পানির কারণে বায়ু উত্তপ্ত হঠাৎ করে এসব ঝড়ের তৈরি হয়।

তখন তুলনামূলক উষ্ণ বাতাস হালকা হয়ে যাওয়ার কারণে ওপরে উঠে যায়, আর ওপরের বাসা ঠাণ্ডা বাতাস নীচে নেমে আসে। এসে নীচের বায়ুমণ্ডলের বায়ুর চাপ কমে যায়। তখন আশেপাশের এলাকার বাতাসে তারতম্য তৈরি হয়।

সেখানকার বাতাসের চাপ সমান করতে আশেপাশের এলাকা থেকে প্রবল বেগে বাতাস ছুটে আসে। আর এ কারণেই তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড়ের।

এরফলে প্রবল বাতাস ও স্রোতের তৈরি হয়। যখন এসব এই বাতাসের ভেসে ঝড়টি ভূমিতে চলে আসে, তখন বন্যা, ভূমিধ্বস বা জলোচ্ছ্বাসের তৈরি করে।

ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেয়া থাকলে মানুষকে সতর্ক করা সহজ হয়
ছবির ক্যাপশান, ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেয়া থাকলে মানুষকে সতর্ক করা সহজ হয়

সাইক্লোন, হ্যারিকেন আর টাইফুনের মধ্যে পার্থক্য কী?

এর সবগুলো ঝড়। তবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এগুলোকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। যেমন আটলান্টিক, ক্যারিবিয়ান সাগর, মধ্য ও উত্তরপূর্ব মহাসাগরে এসব ঝড়ের নাম হ্যারিকেন।

উত্তর পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সেই ঝড়ের নাম টাইফুন।

বঙ্গোপসাগর, আরব সাগরে এসব ঝড়কে ডাকা হয় সাইক্লোন নামে।

যদি কোন নিম্নচাপ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার গতিবেগ অর্জন করে, তখন সেটি আঞ্চলিক ঝড় বলে মনে করা হয় এবং তখন সেটির নাম দেয়া হয়। কিন্তু সেটি যদি ঘণ্টায় ১১৯ কিলোমিটার (৭৪ মাইল) গতিবেগ অর্জন করে, তখন সেটি হ্যারিকেন, টাইফুন বা সাইক্লোন বলে ডাকা হয়।

এগুলোর পাঁচটি মাত্রা হয়েছে। ঘণ্টায় ২৪৯ কিলোমিটার গতিবেগ অর্জন করলে সেটির সর্বোচ্চ ৫ মাত্রার ঝড় বলে মনে করা হয়। তবে অস্ট্রেলিয়া ঝড়ের মাত্রা নির্ধারণে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে।