নাজিব রাজাকের বিচার শুরু: পাহাড় সমান দুর্নীতির খতিয়ান

নাজিব রাজাক
ছবির ক্যাপশান, নাজিব রাজাক
Published

মালয়েশিয়ার যে দুর্নীতির কেলেঙ্কারি বিশ্বজুড়ে ঝড় তুলেছে, তার প্রধান আসামী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিচার শুরু হয়েছে।

মি রাজাকের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ যে তিনি রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে কমপক্ষে ৬৮১ মিলিয়ন ডলার নিজের পকেটে ঢুকিয়েছেন।

ঐ তহবিল থেকে পাচার হওয়া টাকায় সুপার-ইয়ট বা প্রমোদ তরী কেনা হয়েছে। এমনকি হলিউডে একটি ছবি তৈরিতেও খরচ করা হয়েছে।। সুপার-ইয়ট বা প্রমোদ তরীটির দাম ছিল ২৫ কোটি ডলার।

মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতি আনার লক্ষ্যে তৈরি ওয়ান এমডিবি (মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাড) নামে ঐ তহবিল গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ব্যক্তিগত বিলাস বৈভবে রাষ্ট্রীয় সেই টাকা খরচ করেছেন তিনি।

মালয়েশিয়ার বর্তমান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান শ্যাকসের বিরুদ্ধেও অপরাধের মামলা করেছে। ঐ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ - ওয়ান এমিডিবি তহবিলের জন্য বন্ড বিক্রি করে টাকা তুলে বিনিয়োগকারীদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে।

বুধবার শুনানির প্রথম দিনে নাজিব রাজাক অবশ্য সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গোল্ডম্যান শ্যাকসও বলেছে তারা প্রতারণার মামলাটি লড়বে।

মি নাজিবের বিরুদ্ধে মোট ৪২টি অভিযোগ যার প্রথমটিতে বুধবার বিচার শুরু হয়।

কেলেঙ্কারির প্রথম তদন্ত হয় যুক্তরাষ্ট্রে।
ছবির ক্যাপশান, কেলেঙ্কারির প্রথম তদন্ত হয় যুক্তরাষ্ট্রে। তখন বলা হয় জনৈক `অফিসিয়ার ওয়ান' বহু টাকা পাচার করেছেন। পরে বেরিয়ে পড়ে ঐ অফিসিয়ালই নাজিব রাজাক।

পটভূমিকা

প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ২০০৯ সালে মি. নাজিব ওয়ান এমডিবি প্রতিষ্ঠা করেন।

২০১৫ সালে প্রথম এই তহবিল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে যখন বিভিন্ন ব্যাংকের এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থাৎ বন্ড ক্রেতাদের পাওনা শোধে বিলম্ব হওয়া শুরু হয়।

এরপর এমডিবি থেকে টাকা পাচারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে এক তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগ ছিল - মালয়েশীয় এই তহবিল থেকে ৪৫০ কোটি ডলার বেশ কজন ব্যক্তির পকেটে গেছে।

মার্কিন কৌসুলিরা তখন বলেন 'মালয়েশিয়ার একজন কর্মকর্তা' ওয়ান এমডিবি থেকে ৬৮১ মিলিয়ন ডলার নিয়েছেন বলে তাদের কাছে অভিযোগ রয়েছে। পরে প্রকাশিত হয় যে ঐ কর্মকর্তা নাজিব রাজাক।

তবে যেহেতু তিনি তখনও প্রধানমন্ত্রী, দেশের ভেতর এক তদন্তে তাকে অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

২০১৮ সালের নির্বাচনে তার পরাজয়েরে পেছনে ঐ দুর্নীতির অভিযোগ প্রধান ভূমিকা রাখে।

নতুন সরকার এসেই ওয়ান এমডিবি কেলেঙ্কারি নিয়ে তদন্ত শুরু করে। পুলিশ জানায় মি রাজাকের বাড়ি থেকে তারা প্রচুর বিলাসী দ্রব্য এবং নগদ টাকা উদ্ধার করেছে। মি রাজাককে গ্রেপ্তার করা হয়, যদিও তিনি জামিনে মুক্তি পান।

দুর্নীতির অভিযোগের কারণে গত বছর নির্বাচনে হারেন মি নাজিব
ছবির ক্যাপশান, দুর্নীতির অভিযোগের কারণে গত বছর নির্বাচনে হারেন মি নাজিব

আর কে কে জড়িত

তদন্তের অন্যতম প্রধান একজন টার্গেট হলেন মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ী রো তায়েক ঝো। দেশে তিনি ঝো লো নামে পরিচিতি।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ - তিনি এবং তার কজন সহযোগী রাষ্ট্রীয় ঐ তহবিল থেকে প্রচুর টাকা সরিয়েছেন যার একটি অংশ দিয়ে তিনি ২৫০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে ইকোয়ানামিটি নামে একটি সুপার ইয়ট বা প্রমোদতরী কেনেন।

গত বছর ঐ প্রমোদ তরীটি সরকার বাজেয়াপ্ত করে। আজ (বুধবার) মালয়েশিয়ারই একটি ক্যাসিনো কোম্পানির কাছে ঐ প্রমোদ তরীটি ১২৬ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করে দেয়ার এক চুক্তি সরকার অনুমোদন করেছে।

বারাক ওবামার সাথে গল্ফ খেলছেন মি নাজিব
ছবির ক্যাপশান, বারাক ওবামার সাথে গল্ফ খেলছেন মি নাজিব

ঝো লো এখন পলাতক।

ওয়ান এমডিবি তহবিল থেকে টাকা পাচার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং সিঙ্গাপুর সহ কমপক্ষে ছটি দেশে তদন্ত হচ্ছে।

এই কেলেঙ্কারিতে ভালোভাবেই জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান শ্যাকস।

মালয়েশিয়ার সরকার এই ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

গোল্ডম্যান শ্যাকসের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অপারেশসনসের প্রধান টিম লেইসনার ঘুষ এবং টাকা পাচারের ভূমিকা রাখার কথা স্বীকার করেছেন।

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ডেভিড সলোমন এই কেলেঙ্কারিতে মি লেসনারের সংশ্লিষ্টতার জন্য মালয়েশিয়ার জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু তিনি দাবি করেছেন যে তার ব্যাংকও প্রতারিত হয়েছে।