ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের তদন্ত: তার স্ত্রী বন্যা আহমেদ বলছেন, 'ওরা যে নাটক করছে সেটা না করলেও আমি অবাক হতাম না'

ব্লগার অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বন্যা আহমেদ।
ছবির ক্যাপশান, ব্লগার অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বন্যা আহমেদ।
Published

বাংলাদেশে জঙ্গিদের হামলায় নিহত লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বলেছেন, তার স্বামীর হত্যাকাণ্ডের বিচারে সরকার কিছুই করেনি এবং এবিষয়ে তিনি তাদের কাছে কিছু আশাও করেন না।

হামলার জন্যে ছ'জনকে অভিযুক্ত করে পুলিশ যে চার্জশিট দিয়েছে তাকেও তিনি 'নাটক' বলে উল্লেখ করেছেন।

অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের চার বছর পূর্তিতে তার স্ত্রী বন্যা আহমেদ বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার, পুলিশ বা গোয়েন্দা বিভাগের কেউ কখনও তার সাথে যোগাযোগও করেনি।

তবে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের যৌথ নাগরিকত্ব থাকায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এর মাধ্যমে দু'একবার তার কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

চার বছর আগে ২০১৫ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি একুশে বইমেলা চলাকালে বাংলা একাডেমির কাছেই একদল লোক ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে অভিজিৎ রায়কে হত্যা করে।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকার বলছে, এই মামলাটিকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। সেকারণে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।

সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি শামসুল হক টুকু বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "তদন্তের ভিত্তিতে কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এখন বিচারের মাধ্যমে এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচারও জাতি দেখতে পাবে।"

ওই আক্রমণে তার স্ত্রী বন্যা আহমেদও আহত হয়েছিলেন।

এই ঘটনার একজন সাক্ষী হিসেবে তার বক্তব্যের জন্যে পুলিশের পক্ষ থেকে তার কাছে কিছু জানতে চাওয়া হয়েছিল কিনা এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের কাছে তিনি কখনোই কিছু আশা করেন নি।

"আমাদের ওপর আক্রমণের পর থেকেই একের পর এক শুনে এসেছি, ওহ আমরা ধরে ফেলেছি, এরাই ছিল আসল আক্রমণকারী। কিন্তু তার কয়েক মাস পরই সেই গল্প বদলে যায়।"

"পুলিশেরই মতে মেজর জিয়া এবং আরো একজন যে প্রধান তাদেরকে তারা ধরতে পারেনি। যাকে মাস্টারমাইন্ড বলা হচ্ছিল তাকেও পুলিশ হেফাজতে রেখে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হয়েছে," বলেন তিনি।

ব্লগার অভিজিৎ রায়।
ছবির ক্যাপশান, ব্লগার অভিজিৎ রায়।

আরো পড়তে পারেন:

পুলিশ বলছে, অভিজিৎ রায়ের ওপর এই আক্রমণ চালিয়েছে ১১ জন। তাদের মধ্যে ছ'জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে তিনজনকে। বাকিরা কে কোথায় আছে সেটাও পুলিশ জানতে পারেনি।

এই বিষয়টা তাকে কতোটা উদ্বিগ্ন করে জানতে চাইলে বন্যা আহমেদ বলেন, "এই তিনজনকে নিয়ে ওরা যে নাটক করছে ওটা না করলেও আমি অবাক হতাম না। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে জয় বলেছিল যে এথিস্ট ব্লগারদের তারা নিরাপত্তা দিচ্ছে এধরনের কিছু তারা প্রকাশ্যে জানাতে চায় না। কারণ তাহলে এটা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হবে।"

"আওয়ামী লীগ হোক আর বিএনপি হোক বাংলাদেশ সরকারের কাছে এ সবকিছুই হচ্ছে রাজনৈতিক খেলার অংশ। ওরা কখন ওই খেলার অংশ হিসেবে কীভাবে জিনিসটা সাজিয়ে দেখাবে সেটা নিয়ে আমি কখনোই চিন্তিত ছিলাম না।"

কিন্তু ন্যায় বিচারের ব্যাপারে অভিজিৎ রায়ের পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করে শামসুল হক টুকু বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার এই ঘটনার বিচার করবে।

"অপরাধীরা সবসময় নিজেদেরকে আত্মগোপনে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। কিন্তু এটুকু আশ্বস্ত করতে চাই যে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে সরকার তাতে কোন আসামী ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে না। সময় লাগতে পারে। তবে বিচারের মুখোমুখি তাদের হতে হবে ইনশাল্লাহ।"

এই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, প্রথমে অভিজিৎ রায় ও তাঁর স্ত্রী হাঁটছেন, তাঁদের পেছনেই এক ব্যক্তি যাচ্ছেন।
ছবির ক্যাপশান, এই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, প্রথমে অভিজিৎ রায় ও তাঁর স্ত্রী হাঁটছেন, তাঁদের পেছনেই এক ব্যক্তি যাচ্ছেন।

বন্যা আহমেদ বলেন, "আইজি এবং প্রধানমন্ত্রী দুজনেই বলেছিলেন আমরা এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে সমর্থন করি না। কিন্তু যারা এসব নিয়ে লিখছে তাদেরও এসব ধর্ম নিয়ে লেখালেখি করা ঠিক না। ফলে এবিষয়ে কোন প্রতিকার করার ইচ্ছা তাদের কখনোই ছিল না। এটা রাজনৈতিক কারণেই। তারা মনে করে এটা তাদের বিরুদ্ধে যাবে।"

এই হামলার পরপরই অনেকে অভিজিৎ রায়ের ওপর আক্রমণকে মুক্তচিন্তার ওপর আক্রমণ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এরপর আরো কয়েকজন ব্লগারের ওপর হামলাও হয়েছে। দেশ থেকেও অনেক ব্লগার বিদেশে পালিয়েও গেছেন। সরকারের জঙ্গিবিরোধী তৎপরতাও জোরদার হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে বহু জঙ্গি নিহতও হয়েছে।

"হলি আর্টিজান বেকারিতে আক্রমণের পর তাদের হাতে আর কোন উপায় ছিল না বলেই তারা সেটা করেছে। তখন তো এতো আন্তর্জাতিক চাপ দেওয়া হচ্ছিল যে থলের বেড়াল বেরিয়ে গিয়েছিল। সেকারণে তারা এই কাজটা না করে পারেনি। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত একটার পর একটা খুন হয়ে গেছে। তখনও কিন্তু কোন কিছুই করা হয়নি।"

অভিজিতের স্ত্রী বন্যা আহমেদ বলছেন, এতো কিছুর পরেও তার মনে হয় না যে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ব্লগারদের জন্যে আগের চেয়ে নিরাপদ হয়েছে।

"পরিস্থিতি অবশ্যই খারাপ হয়েছে। বাক স্বাধীনতা অনেক পরের কথা, বাংলাদেশে এখন কেউ সরকারের বিরুদ্ধে একটা টু শব্দ করতে পারে না। ক্রসফায়ার বলেন, যেকোনো সময়ে তাকে উঠিয়ে নিয়ে হুমকি দেওয়া বলেন, চুপ করিয়ে দেওয়া বলেন, সেটা শুধু আজকে ধর্ম নিয়ে কথার বলার মধ্যেই সীমিত নয়, রাজনৈতিকভাবেও একটা টু শব্দ করতে পারবেন না।"

এই স্থানেই হামলা চালানো হয় অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রীর ওপর।
ছবির ক্যাপশান, এই স্থানেই হামলা চালানো হয় অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রীর ওপর।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ শুধু লেখক আর ব্লগারদেরই জন্যেই নয়, কারোরই আসলে কোন নিরাপত্তা নেই।

"শুধুমাত্র আপনি যদি সরকারের কিম্বা সরকারের কাছের লোক হয়ে থাকেন তাহলেই হয়তো আপনার এই নিরাপত্তাটা থাকতে পারে। এছাড়া নেই।"

কিন্তু শামসুল হক টুকু এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সেরকম কোন পরিবেশ নেই বাংলাদেশে। তিনি বলেন, "এখন যে কোন লেখক যে কোন গবেষক যে কোন অবস্থায় যে কোন কথা বলতে পারে।"

আরো পড়তে পারেন: