পাকিস্তান ধর্ম অবমাননা: ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েও দুর্বিষহ জীবন

পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া এই খ্রিস্টান দম্পতির ছবি যাদের প্রাণ দিতে হয়েছিল ২০১৪র নভেম্বরে পাকিস্তানে ক্রুদ্ধ মুসলিম জনতার হাতে
ছবির ক্যাপশান, ক্রিস্টান ধর্মাবলম্বী শামা (বামে) এবং শেজাদ (ডানে) কোরান অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হন এবং উচ্ছৃঙ্খল জনতার হাতে প্রাণ হারান ২০১৪ সালে।
    • Author, সিকান্দার কিরমানি
    • Role, বিবিসি নিউজ, ইসলামাবাদ
  • Published

সাঈমা (আসল নাম নয়) পাকিস্তানের কারাগারে ঘুপচি এক কক্ষে চারবছর একাকী সাজা খাটার স্মৃতি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেন নি।

"এখনও আমার মনে হয় আমি জেলে আছি। আপনি এখনও আমার পায়ে ক্ষত দেখতে পাবেন, যে ক্ষত হয়েছে আমার পায়ে শেকল বেঁধে রাখার কারণে।"

মুসলিমদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেবার কারণে সাঈমাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করে দেয়া রায় প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

তিনি বলছেন তিনি খ্রিস্টান বলে জেল কর্তৃপক্ষ তাকে অনেকসময় খেতে দিত না। "ওরা বলত, 'তুমি আমাদের ধর্মকে অপমান করেছ'," তিনি বিবিসিকে বলেন।

তার বিরুদ্ধে কোরানকে খাটো করা এবং কোরান ব্যবহার করে ঝাড়ফুঁক করার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

তবে সাঈমার দাবি ছিল তার মুসলিম প্রতিবেশির বাচ্চাদের সঙ্গে তার নিজের বাচ্চার ছোটখাট ঝগড়াঝাঁটির পর ওই মুসলিম প্রতিবেশিরা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছিল।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, পাকিস্তানে ব্যক্তিগত কলহের শোধ নিতে ব্লাসফেমি আইন বা ধর্মদ্রোহিতা আইন প্রায়ই ব্যবহার করা হয়।

পাকিস্তানি দণ্ডবিধিতে নবীর অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্তর মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে, এবং "অন্য কোন ধর্ম"র অবমাননায় দোষী সাব্যস্ত হলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ পাঞ্জাবে পুলিশের একজন মুখপাত্র এবছর ধর্মদ্রোহিতা আইনে নথিভুক্ত মামলার পরিসংখ্যান দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

তবে অধিকার সংগঠন সেন্টার ফর সোসাল জাস্টিসের হিসাব অনুযায়ী ১৯৮৭ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত অন্তত ১,৪৭২ জনের বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়েছে।

আর এই ধর্মদ্রোহিতা আইন সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ করা হচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

আসিয়া বিবি
ছবির ক্যাপশান, আসিয়া বিবি

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল খ্রিস্টান নারী আসিয়া বিবির বিরুদ্ধে মামলা। ২০১০ সালে ধর্মদ্রোহিতার দায়ে আসিয়া বিবিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল এবং সম্প্রতি দেশটির সুপ্রিম কোর্ট তাকে খালাস দেয়।

আদালতের রায়ের পর ক্রুদ্ধ প্রতিবাদ হয় পাকিস্তানের পথেঘাটে এবং তার মুক্তির বিরোধিতা করে আনা চূড়ান্ত আইনী চ্যালেঞ্জের শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেশটির গোয়েন্দা বিভাগ এক অজ্ঞাত স্থানে তাকে নিয়ে যায় তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।

কোন কোন রিপোর্ট বলছে পাকিস্তানে ধর্মদ্রোহিতা আইনে মৃত্যু দণ্ডপ্রাপ্ত রয়েছেন আরও প্রায় ৪০জন, যারা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

তবে ধর্মদ্রোহিতার দায়ে সাজাপ্রাপ্ত কাউকে এখনও পর্যন্ত পাকিস্তানে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় নি। কিন্তু অভিযুক্ত অন্তত ৭০ জন ক্রুদ্ধ জনতার হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বলে খবর রয়েছে।

সাঈমা বলছেন কারাগার থেকে মুক্তি পাবার পর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। তিনি নিজের নাম বদলে ফেলেছেন।

"আমি এমনকী আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও দেখা করতে যাই না, যদি তারাও কোন বিপদে পড়েন," সাঈমা বিবিসিকে বলেন।

সেন্টার ফর লিগ্যাল এইড অ্যাসিসটেন্ট নামে লাহোরে একটি আইনী সহায়তা কেন্দ্রের প্রধান জোসেফ ফ্রান্সিস। এই কেন্দ্র ধর্মদ্রোহিতা আইনে অভিযুক্তদের হয়ে মামলা লড়ে।

মি: ফ্রান্সিস বলছেন প্রায় ১২০টি ধর্মদ্রোহিতার মামলায় তিনি জিতেছেন এবং যারা মুক্তি পেয়েছে তাদের বেশিরভাগই এখন বিদেশে থাকেন।

"একবার ধর্মদ্রোহিতা আইনে অভিযুক্ত হলে এরপর পাকিস্তানে বসবাস করা সেই ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব। একমাত্র টিঁকে থাকা সম্ভব যদি তার ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা করা যায়। "

মি: ফ্রান্সিস বলছেন যেমনটা আসিয়া বিবির ঘটনায় দেখা গেছে যে নিম্ন আদালতে এধরনের মামলায় অভিযুক্তদের প্রায়ই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পরে আপিলের পর উচ্চ আদালতে সেসব মামলায় তারা খালাস হয়ে যায়।

তিনি বলছেন এটা হয় কারণ বিচারিক আদালতে ধর্মীয় দলগুলো বিচারকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাপের মুখে রাখে।

গুলাম মুস্তাফা চৌধুরী (মাঝখানে)
ছবির ক্যাপশান, আসিয়া বিবিকে বিচারের কাঠগড়ায় তোলার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা নেন গুলাম মুস্তাফা চৌধুরী (মাঝখানে)

এরকম একজন আইনজীবী গুলাম মুস্তাফা চৌধুরী যার বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতে চাপ সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে। তিনি অবশ্য এ অভিযোগ জোরের সঙ্গে অস্বীকার করেছেন।

তিনি বিবিসিকে বলেছেন, "আমাদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র হলেন নবী। আমরা যা করি তা সবই করি তার সম্মান রক্ষায়।"

ব্যক্তিগত কলহ ও বিবাদ মেটানোর অস্ত্র হিসাবে এই ধর্মদ্রোহিতা আইন ব্যবহার করা হচ্ছে এমন অভিযোগও তিনি উড়িয়ে দিয়েছেন।

"আমি কখনও ব্যক্তিগত স্বার্থে কাউকে এই আইন ব্যবহার করতে দেখিনি। আসিয়া বিবির মামলায় এমন কোন কারণ দেখাতে পারবেন?"

"কোন মুসলমান কখনও ইসলামকে ব্যবহার করে কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনবে না। হয়ত চুরি, ডাকাতি, অপহরণের ক্ষেত্রে মানুষ ভুল করে কারো বিরুদ্ধে দোষারোপ করতে পারে, কিন্তু নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কেউ একাজ করবে না।"

তার উল্টো অভিযোগ, এসব অভিযুক্তরা বিদেশে আশ্রয় পাবার চেষ্টায় ধর্মকে অবমাননার পথ নেয় এবং ইসলাম-বিরোধীদের চোখে 'হিরো' হয়ে উঠতে চায়।

তিনি বলেন আন্তর্জাতিক চাপের কারণেই উচ্চ আদালত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দোষীদের খালাস করে দিচ্ছে।

গুলাম মুস্তাফা চৌধুরী আসিয়া বিবির মামলায় গ্রামের মৌলবীদের পক্ষ নিয়ে মামলা লড়েন। সুপ্রিম কোর্টে আসিয়া বিবির আপিল শুনানিতে তিনি বলেন পাকিস্তানে ধর্মদ্রোহিতার সব মামলায় দেখা গেছে অভিযুক্তরা একইধরনের অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেছে। তার বক্তব্য খ্রিস্টান নেতারা এদের শিখিয়ে দেয় কীধরনের মন্তব্য করলে তাদের বিদেশে আশ্রয় পাওয়া এবং বিদেশি সমর্থন পাওয়া সহজ হবে।

আসিয়া বিবিকে মুক্তি দেবার পর রাস্তায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়
ছবির ক্যাপশান, আসিয়া বিবিকে মুক্তি দেবার পর রাস্তায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়

মি: চৌধুরীর এই দাবি যুক্তিগ্রাহ্য না হলেও পাকিস্তানের মানুষের কাছে এই যুক্তি খুবই গ্রহণযোগ্য, কারণ তাদের অনেকেই মনে করে দেশের ভেতরে ও বাইরে অসাম্প্রদায়িক মহলের চাপে পাকিস্তানে ইসলাম বিপন্ন।

মি: চৌধুরী নিজেকে দেখেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহম্মদ আলি জিন্নাহর আদর্শের একজন উত্তরসূরী হিসাবে। মি: জিন্নাহ ছিলেন একজন আইনজীবী।

লাহোরে আসিয়া বিবির মুক্তির দাবিতে পাকিস্তান ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রাটিক অ্যালায়েন্স-এর বিক্ষোভ
ছবির ক্যাপশান, অন্যদিকে পাকিস্তানে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রাটিক অ্যালায়েন্স আসিয়া বিবির মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করে

পাকিস্তানে ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার সংজ্ঞা নিয়ে অনেক জটিলতাও রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এই আইন সংস্কার বা এই আইন প্রত্যাহারের কোন সম্ভাবনাও খুবই ক্ষীণ।

আইনজীবী গুলাম মুস্তাফা চৌধুরী সহ পাকিস্তানের একটা বড় অংশ মনে করে দেশে এই আইনের প্রয়োজন আছে। এই আইন না থাকলে সহিংসতার আশংকা বাড়বে অনেক বেশি।

কিন্তু মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে চার বছর কারাগারে কাটানো সাঈমা বলছেন এই অভিযোগ তার জীবনকে ছারখার করে দিয়েছে।

"বেঁচে থাকাটা মৃত্যুর মত হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকে আসে - কী ঘটেছিল তা জানতে চায়। আমার এটুকুই ভাল লাগে যে আমার কথা ওরা শুনছে। কিন্তু তারপর কি? সবই আগের মত। জীবনের কিছুই তো বদলায় না।"

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন: