সংসদ নির্বাচন: বিএনপির নেতারা বলছেন, 'সরকারি ইচ্ছা অনুযায়ী' মনোনয়ন বাতিল হচ্ছে

বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৩০শে ডিসেম্বর
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৩০শে ডিসেম্বর
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

বাংলাদেশের বিরোধীদল বিএনপি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে বলেছেন, তাদের ভাষায় 'সরকারের ইচ্ছে অনুসারেই' কমিশন তাদের দলের ৮০ জনের মতো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে।

নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

রোববার নির্বাচনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের শেষ দিনে বিএনপিরই সবচেয়ে বেশি প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে দলের নেত্রী খালেদা জিয়াও রয়েছেন।

দুর্নীতির মামলায় সাজা হবার ফলে বিএনপির শীর্ষ নেত্রী খালেদা জিয়া যেহেতু জেলে - তাই দলটির মহাসচিবের স্বাক্ষরে তাদের দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়া হয়।

'মনোনয়নপত্রে সেই স্বাক্ষর মিলছে না', এই অভিযোগে ঢাকা-১ আসনে দোহার এলাকার বিএনপির প্রার্থী ফাহিমা আকতারের মনোনয়নপ্রত্র বাতিল করা হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেছেন,একটা ইস্যু তুলে একতরফাভাবে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে
ছবির ক্যাপশান, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে

"আমাকে বিএনপি মহাসচিব দল থেকে মনোনয়ন দিয়েছেন। তার স্বাক্ষর আছে। আমাকে বলা হয়, এই স্বাক্ষর মিলছে না। আমি বললাম, আপনি মহাসচিবের সাথে কথা বলেন টেলিফোনে। রিটার্নিং কর্মকর্তা বললেন, তিনি কথা বলবেন না। তিনি আমাকে আপিল করতে বললেন। আসলে উনারা কোন কথাই শুনলেন না" - বলেন ফাহিমা আকতার।

তবে সোমবার বিএনপির আরও কয়েকজনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয় দলীয় মহাসচিবের স্বাক্ষর না মেলার অভিযোগে।

দলটির নেতারা অভিযোগ করছেন - সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোর্শেদ খান, মীর নাসিরের মতো তাদের 'হেভিওয়েট প্রার্থীদের' একটা বড় অংশকে 'টার্গেট করে' মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, সাজা থাকার বিষয় ছাড়াও ছোটখাটো বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তাদের অনেক নেতা কর্মীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

তিনি বলেন, "নির্বাচন কমিশন সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আমাদের সন্দেহ আরও বাড়ছে।"

নির্বাচন কমিশন বিএনপির এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, মনোনয়নপত্র বাতিলের ক্ষেত্রে আইন মেনেই তারা কাজ করেছে, এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পক্ষপাতের প্রশ্নই ওঠে না।

মনোনয়নপত্র বাতিলের কারণে কয়েকটি নির্বাচনী এলাকায় এখন বিএনপির কোন প্রার্থী নেই।
ছবির ক্যাপশান, মনোনয়নপত্র বাতিলের কারণে কয়েকটি নির্বাচনী এলাকায় এখন বিএনপির কোন প্রার্থী নেই।

দুনীতির মামলায় সাজা থাকার কারণে খালেদা জিয়াসহ বিএনপির বেশ কয়েকজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। খালেদা জিয়ার একটি আসন বগুড়া-৭ সহ ছয়টি আসনে দলটির মূল প্রার্থী এবং বিকল্প প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় এখন বিএনপির কোন প্রার্থীই নেই।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে পরিচিত কারও মনোনয়ন পত্র বাতিলের খবর পাওয়া যায়নি।

তবে দলটির সূত্রে জানা গেছে, তাদের ৭০ জনের বেশি বিদ্রোহী প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন ৪০টি আসন থেকে। এই বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে ৩৫ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এমনই একজন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়েও হবিগঞ্জ-১ আসনে প্রার্থী হন কেয়া চৌধুরী। তিনি বলছিলেন, তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার কারণ তিনি বুঝতে পারছেন না।

"আমার সাজা নেই। আমি ঋণ বা বিল খেলাপী নই। আমার মনোনয়ন বাতিল হবে কেন? তারা বলেছে, মনোনয়নপত্রে বেশ কয়েকটি স্বাক্ষরের জায়গায় আমার একটি স্বাক্ষর কম আছে।"

তবে নির্বাচন কমিশন বলছে, মনোনয়নপত্র বাতিল করার ক্ষেত্রে আইনের বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। কমিশনের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলছিলেন, বিষয়গুলো আপিলে এলে সব অভিযোগ বা প্রশ্নের জবাব মিলবে।

"যদি আমাদের কাছে আপিল করে, তখন আমরা বুঝতে পারব যে, কোন রিটার্নিং অফিসার কি কারণে কার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন।"

"নির্বাচন কমিশন আইনগত ভিত্তির ওপর চলে। এখানে আবেগ বা রাজনৈতিক বিবেচনার কোন অবকাশই নেই।"

বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, যাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে, তাদের মধ্যে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা বেশি। সেটি একটি প্যাটার্ন হিসেবে চোখে পড়ছে এবং সেকারণে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠছে।

ঢাকায় বিএনপির অফিসের সামনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ভিড়
ছবির ক্যাপশান, ঢাকায় বিএনপির অফিসের সামনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ভিড়

সাবেক একজন নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন বলছিলেন, বাদ পড়া প্রার্থীদের আপিলের আবেদনের শুনানিতে বিষয়গুলো পরিস্কার হবে বলে তিনি মনে করেন।

"এটা একটা প্যাটার্নের কারণে বিরোধীদল থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে। আপিলে বোঝা যাবে, এই প্যাটার্নটা কেন ঘটলো? কিন্তু বাতিল হওয়াটা সারপ্রাইজ বা অস্বাভাবিক কিছু না। কারণ ২০০৮ সালেও মোট যতো প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিল, তার মধ্যে ২২.৪৬% বাদ পড়েছিল। আর এখন তিন হাজারের বেশি প্রার্থীর মধ্যে ২৫.৪০% এর মতো বাদ পড়েছে।"

বিএনপিসহ সব দলের বাদ পড়া প্রার্থীরাই নির্বাচন কমিশনে আপিল করছেন। ৩রা ডিসেম্বর সোমবার থেকে ৫ই ডিসেম্বর বুধবার পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে আপিল করা যাবে।

এরপর কমিশন ৬ই ডিসেম্বর থেকে তিনদিন শুনানি করে আপিলগুলো নিস্পত্তি করবে।

আরো পড়ুন: