লিফট দুর্ঘটনা থেকে আতঙ্ক: আসলে কতটা উদ্বেগজনক?

A lift shaft
ছবির ক্যাপশান, লিফটে চড়া নিয়ে অনেকেরই থাকে আতঙ্ক
Published

লিফটের মাঝে আটকে থাকার চিন্তা যে কাউকে আতঙ্কিত করে তোলে, যদিও প্রতিদিন যতবার লিফটে চড়তে হয় তার বিবেচনায় লিফট পতনের হার খুব কমই ঘটে।

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর চতুর্থ বৃহৎ ভবনের লিফটের তার ছিঁড়ে গেলে ৮৪তলার নিচে লিফট পড়ে যায়, ছয় জনকে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হয় এবং আটকা থাকতে হয়।

যদিও সৌভাগ্যবশত ওই তার এখনো ওই অবস্থাতেই আছে যার ফলে লিফট মাটিতে গিয়ে আঘাত থেকে রক্ষা করেছে এবং লিফটটিকে নিচে থেকে ১১তলা ওপর পর্যন্ত ধরে রেখেছে। আর সেখান থেকে ওই আতঙ্কিত গ্রুপটিকে তিন ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হয়।

বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক বছরে লিফট দুর্ঘটনার বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে।

ক্ষয়ক্ষতি

প্যাসেঞ্জার লিফট অর্থাৎ মানুষকে বহনকারী লিফটের যাত্রা শুরু হয় ১৫০ বছর আগে। এবং আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একেবারে বেজমেন্টের তলায় লিফট পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই সামান্য।

প্রায়শই যেটা হয়, লিফট দুর্ঘটনাগুলোতে লিফট একেবারে ছিঁড়ে পরার তুলনায় লিফটের স্বয়ংক্রিয় দরজায় আটকা পরে অঙ্গহানি ঘটে এবং যা প্রায়ই মারাত্মক পরিণতিও ডেকে আনে।

কোন কোন ক্ষেত্রে লিফট দুর্ঘটনা ঘটে যখন একটি লিফট কত দ্রুত ওঠানামা করে এবং একাধিক ফ্লোরে হঠাৎ থামে।

The former John Hancock Center and Chicago's skyline
ছবির ক্যাপশান, লিফট সংক্রান্ত সর্বশেষ দুর্ঘটনাটি ঘটে আমেরিকার শিকাগোতে।

২০০৩ সালে লন্ডনে একজন নারী মারা গিয়েছিলন যখন লিফটি অর্ধেক মেঝে থেকে হঠাৎ ওপরে থেমে যায় এবং তিনি তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। সে লিফটের ভেতর আটকা পড়ে এবং লিফট পড়ে যায়।

এলিভেটর এবং এস্কেলেটর সংক্রান্ত দুর্ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ত্রিশ জন প্রাণ হারান এবং গুরুতর আহত হন প্রায় ১৭,০০০ মানুষ- ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিকটিস'এর তথ্য তেমনটাই বলছে।।

এই সংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ এলিভেটর কিংবা এসকেলেটরের ব্যবস্থাপনা কিংবা নির্মাণের সাথে জড়িত।

নির্মাণ শ্রমিকরা উঁচু ভবন নির্মাণের কাজের সময় অস্থায়ী লিফট ব্যবহার করে থাকেন যা দ্রুত উন্নয়নের পথে থাকা দেশগেলোতে উদ্বেগের কারণ। যেমন চীন এবং ভারত।

বেরেনবার্গ ব্যাংকের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স বলে, চীনে ৪০ লাখ লিফট রয়েছে যেখানে আমেরিকাতে আছে নয় লাখ ।

Rescuers open the lift door to reach those trapped, on 16 November 2018
ছবির ক্যাপশান, শিকাগোতে লিফটে আটকে পড়া ব্যক্তিদের বের করে আনতে দেয়াল ভাঙতে হয় উদ্ধারকর্মীদের

কিন্তু এটি দেশের প্রাচীনতম সরঞ্জাম বিশেষ করে হংকং-এ, যা নিয়ে উদ্বেগের কারণ আছে। এবছরের শুরুর দিকে সেখানে এক দম্পতি লিফটে ওঠার পর তাদের বহনকারী লিফটটি থামতে ব্যর্থ হয় এবং ৪৬তলা ভবনের ওপর থেকে আছড়ে পড়লে মাথা ও ঘাড়ের দুর্ঘটনার শিকার হন ওই দম্পতি।

দু'হাজার তের সালেও হংকং-এ তিনজন ব্যক্তি গুরুতর আহত হন যখন তাদের বহনকারী লিফটের চারটি তারই একই সময়ে ছিঁড়ে যায়। জরুরি ব্রেকও সেসময় কাজ করেনি।

দু'হাজার ষোল সালে একজন নারীর নিখোঁজ হওয়ার একমাস পর জীয়ানের একটি লিফটের ভেতর মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

যারা লিফট ব্যবস্থাপনার কাজ করছিলেন তারা ভেতরে কেউ আছেন কিনা তা নিশ্চিত না হয়েই পাওয়ার অফ করে দিলে এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল। কর্তৃপক্ষের সন্দেহ সে পানিশূন্যতায় কিংবা অনাহারে মারা গেছেন।

লিফট কতটা নিরাপদ?

আঠারশো সালে সেফটি ব্রেক উদ্ভাবনের পর থেকে লিফটের উন্নয়নের কাজকে তরান্বিত করে এবং আজকের উন্নত ধরনের লিফটকে আমরা দেখছি। এগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে ।

প্রতিটি লিফট কক্ষের ভেতর আলাদা স্টিলের কেবল থাকে যেটি ভেতরে সতর্কতামূলক বানীতে যে পরিমাণ ওজনের কথা বলা আছে তার চেয়ে অনেক বেশি ভার বহনে সাহায্য করে। এর ফলে তারের ওপর চাপ কম পড়ে।

এগুলো আধুনিক যুগের লিফটের কিছু সাধারণ নিরাপত্তা মূলক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তারপরও অনেকের মাঝে থাকে লিফট ছিড়ে পড়ার আতঙ্ক। কেন?

ডক্টর শেরি জ্যাকবসন মনে করেন বেশিরভাগ আতঙ্ক কিছুটা আদিম বিপদ আশঙ্কা থেকে আসে এবং আমাদের মনের মধ্যে গেঁথে বসে। সবচেয়ে সাধারণ ভয় হল ভেতরে আটকে পড়ার এবং উঁচুতে ওঠার পর পরে যাবার ভয়- যে দুটিই লিফটে চড়ার সময় প্রভাব রাখে।

তিনি আরও মনে করেন বিরল লিফট দুর্ঘটনাগুলোর সংবাদ প্রচার এই ধরনের ভীতি বাড়িয়ে দেয়, তা যতই অস্বাভাবিক হোক না কেন।

এলিভেটরের ভেতর সবেচেয়ে বেশি সময় আটকা থাকার পরও এক নারীর বেঁচে থাকার খবর গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ জায়গা পেয়েছে। নিউ ইয়র্কের এমপায়ার স্টেট বিল্ডিং এ লিফট অপারেটর ছিলেন বেটি লৌ অলিভার।

Betty Lou Oliver with her husband on 28 November 1945
ছবির ক্যাপশান, এলিভেটরের ভেতর সবেচেয়ে বেশি সময় আটকা থাকার পরও এক নারীর (বেটি লৌ অলিভার) বেঁচে থাকার খবর গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ জায়গা পেয়েছে।

কুয়াশাভরা এক সকালে একটি বি-টুয়েন্টি ফাইভ বোমারু বিমান ভবনটির ওপর দিয়ে ব্যাপক শব্দে উড়ে যাবার সময় এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারীরা পাইলটকে অবতরণ করার নির্দেশ দেন কিন্তু তা মানেনি পাইলট। এরপর সেটি ম্যানহাটন ল্যান্ডমার্কের ৭৪ তলার ওপর বিধ্বস্ত হয় এবং ১১৪ জন নিহত হয়।

আশি তলার ওপর বেটি লৌ মারাত্মক ইনজুরির শিকার হন এবং তাকের জরুরি চিকিৎসা দেয়ার পর আরেকটি লিফটে করে অ্যাম্বুলেন্সের উদ্দেশ্যে গ্রাউন্ড ফ্লোরে রওনা হয়েছিল।

যাই হোক, লিফটের সেফটি কেবল মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়েছিল এবং তাকে নিয়ে সেটি মাটিতে ছিঁড়ে পড়ে। কয়েক সেকেন্ডর মধ্যে লিফট কারটি বেজমেন্টে বিধ্বস্ত হয়। অথচ বেটি লৌ আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে যান।