শার্লটসভিল সহিংসতা: বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হারানোর ইঙ্গিত

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ছবির ক্যাপশান, সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সাথে যেন বাকযুদ্ধে নেমেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
    • Author, কেটি কে
    • Role, উপস্থাপক, বিবিসি ওয়ার্ল্ড নিউজ
  • Published

ইউরোপে কয়েক সপ্তাহ কাটিয়ে মাত্রই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরলাম। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের গত ২০ বছরের মধ্যে বিদেশ থেকে ফিরে এমন হতাশ, কিংবা এতটা ভেঙ্গে পড়া দেশ আমি কখনোই দেখিনি।

এমনকি ইরাকে আক্রমণ এবং অর্থনৈতিক ধসের সময়েও মার্কিনত্ব-বিরোধী যে মনোভাব কাজ করছিল তখনও এমনটা ছিল না।

হতাশা!

২০০৪ এবং ২০০৮ সালে আমেরিকানরা ঐক্যবদ্ধ ছিল, অন্তত এতটা ক্ষুব্ধভাবে বিভক্ত ছিল না। অনেকেই হয়তো ধারণা করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় নাৎসিদের 'সোয়াস্তিকা' চিহ্ন দেখে মানুষ দ্বিধাহীনভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠবে। কিন্তু তা হয়নি।

দেশ এতটাই রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে যে নাৎসিদের চিহ্নও এখন রাজনৈতিক চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যদি সেটির নিন্দা না জানালে কেউ রাজনৈতিক সুবিধা পায়।

আর যে মানুষটি দেশ চালাচ্ছেন তিনি সক্রিয়ভাবে সেই বিভক্তিকে উস্কে দিচ্ছেন।

শার্লটসভিলে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের মিছিলে কিছু 'ভাল মানুষও' ছিল বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে যুক্তি খুঁজে বের করার চেষ্টা অনর্থক। আমার ধারণা তিনি নিজেও কোন যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করেননি।

আমার সন্দেহ হয় সংবাদ সম্মেলনে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটা তার জাতিগত মনোভাব থেকে যতটা না এসেছে, তার চেয়ে বেশি এসেছে তার প্রাথমিক বক্তব্যের পর বাক্যবাণে জর্জরিত হওয়ার কারণে দুঃখ এবং ক্ষোভ থেকে।

তবে বর্ণবাদী এবং উগ্র-ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে স্পষ্টভাবে নিন্দা জানাতে মি. ট্রাম্পের ব্যর্থতা তাদেরকে নতুন করে অক্সিজেন দিয়েছে এবং মার্কিন পরিচয়ের একদম বুকে আঘাত হেনেছে।

ট্রাম্প টাওয়ার
ছবির ক্যাপশান, মি. ট্রাম্প তার ১৭ দিনের ছুটির মদ্যে তার নিউ ইয়র্কের বাসভবনে এসে সংবাদ সম্মেলন করেন।

মার্কিন গর্বের মূলে রয়েছে তাদের মধ্যপন্থী মনোভাব, যেটা ইউরোপীয়দের মত উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সাথে অম্লমধুর সম্পর্ক নয়।

সুপরিচিত রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা আমাকে প্রায় সময় বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় কেন্দ্রীয় অবস্থানের দিকেই ধাবিত হয়। কিন্তু শার্লটসভিলের ঘটনায় তা মোটেও মনে হয়নি - জার্মানি, ইতালি বা স্পেনও একই কথাই বলবে।

কিন্তু অন্য সব দেশের চেয়ে আরো বেশি অস্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রও যদি অন্য সব দেশের অবস্থার দিকেই যেতে থাকে, তাহলে বিশ্ব যে তাদের মতামত পুনর্বিবেচনা করবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

মার্কিনীরা যেভাবে নিজেদের বিশেষ এবং অনন্য একটি দেশ হিসেবে বর্ণনা করে, তা আমার কাছে প্রায় সময়ই বেশ বাগাড়ম্বরপূর্ণ মনে হয়েছে। ফরাসী, ব্রিটিশ কিংবা অস্ট্রেলিয়ানদের কখনো নিজেদের সম্পর্কে এভাবে বলতে শোনা যায় না - যদিও তারাও হয়তো এমনটাই ভাবে।

তবে কখনও কখনও হয়তো সেই অনন্যতার ক্ষয়ই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সেটা কতটা বাস্তব ছিল এবং বিশ্ব তার ওপর কতটা নির্ভর করতো।

ট্রাম্প টাওয়ার
ছবির ক্যাপশান, ট্রাম্প টাওয়ারের সামনে বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ড।

এই গ্রীষ্ম আমি কাটিয়েছি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং স্পেনে।

তিনটি দেশের নেতারাই এখন ভাবছে জলবায়ু পরিবর্তন বা বাণিজ্যের মত বিষয়ে মার্কিন নেতৃত্ব ছাড়াই কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায়। সেসব দেশের জনগণের মনেও এখন যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্ব দিন দিন ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

বিষয়টা আর কৌতুক হিসেবেও দেখা হচ্ছে না, যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থানের পতন সেখানকার মানুষকে আসলেই দুঃখিত করছে।

ইউরোপীয়দের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সব সময়ই ছিল একটি জটিল এবং অনেকটা নিরাপত্তাহীন সম্পর্ক - কিছুটা প্রশংসার দৃষ্টি, কিছুটা হিংসা, কিছুটা বিরক্তি। কিন্তু এই বছর যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ইউরোপের প্রতিক্রিয়া বেশ ভিন্ন মনে হয়েছে।

ইউরোপ এখন আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী - অর্থনীতিও ভালো করছে এবং উগ্র-ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো ব্যালটবাক্সে পরাজিত হচ্ছে। এমনকি ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ততটা সাড়া পাচ্ছেনা - ফ্রান্স এবং জার্মানির কাছে ব্রেক্সিটও এখন পুরনো খবর।

নতুন এই আত্মবিশ্বাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের অকার্যকারিতা একসাথে মিশে মার্কিন নেতৃত্বকে উড়িয়ে দেয়ার একটি মনোভাব তৈরি হতেই পারে। ইউরোপীয়দের কাছে, বহির্বিশ্বের অনেকের কাছেই ট্রাম্প একটি প্রদর্শনী, যেন স্টেরয়েড দেয়া একটি রিয়েলিটি শো। বর্তমানে আমেরিকার প্রতি ইউরোপের আগ্রহ এটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

কংগ্রেসেও কোন কিছু ঠিকভাবে হচ্ছে না - মার্কিনীদের মনোকষ্টের কারণ বোঝাটা খুব কঠিন নয়।

বিশ্ব যে এখন তাদের বৈশ্বিক পরাশক্তি ছাড়াই কীভাবে কাজ করতে হয়, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে - তাতেও অবাক হবার কিছু নেই।