সরকার কেন এখন কলেরার টিকা দিচ্ছে?

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN/AFP via Getty Images
কলেরা প্রতিরোধে টিকা দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। আইসিডিডিআর,বি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির যৌথ সহযোগিতায় শনিবার থেকে শুরু হবে প্রথম ধাপের টিকাদান কর্মসূচি।
২২শে অগাস্ট থেকে ২১শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম ডোজের এবং ২৬শে সেপ্টেম্বর থেকে ২৫শে অক্টোবর পর্যন্ত দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেয়া হবে।
'প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬'র আওতায় উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে দুই দফায় মুখে খাওয়ার এই টিকাটি দেয়া হবে।
বৃহস্পতিবার সকালে টিকা কর্মসূচির উদ্বোধনের পর দেয়া ভাষণে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে 'বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণকে অগ্রাধিকার' দেয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা জানিয়েছে, ভ্যাকসিন বিষয়ক আন্তর্জাতিক জোট গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স সরকারকে এই টিকা অনুদান (donate) দিয়েছে। ফলে কলেরার টিকা প্রদানের জন্য আলাদা করে সরকারকে কোনো বরাদ্দ দিতে হচ্ছে না।
এর আগে ২০১৭ ও ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এই টিকা দেয়া হয়েছিল।
প্রশ্ন উঠছে, এই সময় এসেই কেন কলেরার টিকা দেয়ার এই উদ্যোগ নেয়া হলো? টিকা দেয়ার ক্ষেত্রে কাদেরকে বেছে নেয়া হচ্ছে? আর এই টিকা কার্যকরই বা থাকবে কতদিন?

ছবির উৎস, BSS
এখন কেন কলেরার টিকা দেয়ার উদ্যোগ?
পানিবাহিত রোগ কলেরা প্রতিরোধে গর্ভবতী নারী ছাড়া এক বা তার চেয়ে বেশি বয়সের সব নাগরিককে বিনামূল্যে দেওয়া হবে ইউরিকল প্লাস নামের টিকাটি।
কর্মসূচির আওতায় সারাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ ১৪টি উপজেলা ও থানায় টিকা দেওয়া হবে।
এরমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী ও কামরাঙ্গীরচর থানার ১৭টি ওয়ার্ডের ১৯২টি কেন্দ্রে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে কলেরার টিকা দেওয়া হবে।
এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের শেরেবাংলা নগর, খিলক্ষেত ও তেজগাঁও এবং মুন্সিগঞ্জ সদর, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ, হোসেনপুর ও তাড়াইল, নারায়ণগঞ্জ সদর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও নবীনগরেও এ কর্মসূচি পরিচালিত হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, রোগ হবার আগেই প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

ছবির উৎস, Piyas Biswas/SOPA Images/LightRocket via Getty Images
আগামীকাল থেকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও পাঁচ বছর মেয়াদী কর্ম পরিকল্পনার আওতায় অনেক আগে থেকেই টিকাদানের জন্য সংশ্লিষ্ট কাজগুলো শুরু হয়েছিল।
শুরুতে প্রকল্পের আওতায় ২০২৪ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত এই পাঁচ বছর বাংলাদেশ সরকারকে নির্দিষ্ট সংখ্যক টিকা দেয়ার কথা ছিল গ্যাভির। তবে বৈশ্বিকভাবে দেখা যাওয়া আর্থিক সংকট এবং টিকার চাহিদা ও উৎপাদনের মতো নানা কারণে তা পিছিয়ে যায়।
পরে ২০২৫ সালে অনুমোদন পায় এটি।
অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এটা অনেক আগেরই উদ্যোগ। অনেক আগে থেকেই গ্যাভি ভ্যাকসিন দিয়েছে। এই সময় করতে বলেছে। নতুন করে হঠাৎ করে হয় নাই"।
গত ছয় মাস ধরে টিকা দেয়ার "প্ল্যান, মাইক্রোপ্ল্যান হচ্ছে" বলেও জানান তিনি।
বর্তমানে প্রথম ধাপের টিকাদান চলবে। পরে ধাপে ধাপে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা মোট ১৪৪টি উপজেলায় এই টিকা দেয়ার কথা রয়েছে বলে জানান অধ্যাপক রশিদ। তবে এই মুহূর্তে গ্যাভির তরফ থেকে এক বছরের টিকা দেয়া হয়েছে।
যেভাবে নির্ধারণ হলো টিকা দেয়ার এলাকা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বৃহস্পতিবার কলেরার টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, "এই এলাকাগুলো কোনো অনুমানের ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়নি। বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।"
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, প্রায়োরিটি এরিয়া অব মাল্টিসেক্টোরাল ইন্টারভেনশন, সংক্ষেপে পামি রিসার্চের মাধ্যমে এলাকাগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে।
"গ্লোবাল টাস্কফোর্স অন কলেরা কন্ট্রোলের সঙ্গে মিলে গ্যাভি একটি টুল ডেভলপ করেছে। এগুলোর মাধ্যমে প্রায়োরিটি এরিয়া অব মাল্টিসেক্টোরাল ইন্টারভেনশন, সংক্ষেপে পামি এনালাইসিসের মাধ্যমে কিছু সূচকের ভিত্তিতে ১৪৪টি থানা ও উপজেলা চিহ্নিত করা হয়েছে," বলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার কর্মকর্তা ডা. শামসাদ রব্বানী খান।
প্রথম ধাপে ১৪টি থানা ও উপজেলায় এই কর্মসূচি চালু হয়েছে। দুই ধাপে দেয়া এই টিকার কার্যকর থাকবে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ২৯ লাখ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হন। মারা যায় প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ। এখনও বিশ্বের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ এই রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন, যার অধিকাংশই আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়াকেন্দ্রিক।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি আহমেদ জামশীদ মোহামেদ জানান, বাংলাদেশে কলেরা প্রতিরোধে এক কোটি ৩৫ লাখ টিকার ডোজ নিশ্চিত করা হয়েছে।
"খুবই সহজ মূলনীতির ভিত্তিতে এই কর্মসূচিকে সাজানো হয়েছে, আর তা হলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকেই সবার আগে সুরক্ষা দেওয়া উচিত," বলেন তিনি।
মি. মোহামেদ আরও বলেন, রোগের প্রকোপ, ঝুঁকিপ্রবণতা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, আগে টিকা নেওয়ার ইতিহাস এবং রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি– এসব বিষয় কঠোরভাবে মূল্যায়ন করে অগ্রাধিকার পাওয়া ১৪টি সিটি করপোরেশন এলাকা ও উপজেলা চিহ্নিত করা হয়েছে।

ছবির উৎস, Sazzad Hossain/SOPA Images/LightRocket via Getty Images
এই টিকার কি কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে?
যেকোনো টিকার মতোই কলেরার টিকা নিলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
গ্লোবাল টাস্কফোর্স অন কলেরা কন্ট্রোলসহ প্রকাশিত অন্যান্য গবেষণায় একে সবচেয়ে কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত টিকা হিসেবে দেখা গেছে বলে জানান ডা. রব্বানী।
ভ্যাকসিনটা খেলে কিছুটা বমি ভাব হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডায়রিয়া হতে পারে বলে জানান তিনি।
তবে ২০২২ সালে রাজধানীতে কলেরার যে প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল, সেসময় দেয়া কিংবা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রদান করা একই টিকার অভিজ্ঞতায় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা জানা যায়নি বলেও জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা।
বৃহস্পতিবার ইউনিসেফ বাংলাদেশ এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছে, "কলেরা থেকে সুরক্ষার জন্য দুটি ডোজই নিতে হবে"। কিন্তু ডোজ নেয়া ব্যক্তিদের কেউ যদি সচেতন না থেকে কেবল একটি ডোজই নেন সেক্ষেত্রে কী হবে?
সেক্ষেত্রে টিকার কার্যকারিতা পাঁচ বছর থাকবে না বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

ছবির উৎস, Sazzad Hossain/SOPA Images/LightRocket via Getty Images
সমস্যার চেয়ে প্রতিরোধ কি বেশি হচ্ছে?
২০২৬ সালের অগাস্টে কলেরার দুই দশকের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আইসিডিডিআর,বি এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকায় নথিবদ্ধ কলেরা রোগীর মোট সংখ্যা ছিল ছয় হাজার ১৪১ জন। এতে দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ আক্রান্ত হয়। পরে তা কমে এলেও ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা আবারও বাড়তে থাকে।
তবে কলেরায় আক্রান্ত অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি না হওয়ায় বিশ্বব্যাপীই আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
তা সত্ত্বেও আক্রান্তের তুলনায় বেশি সংখ্যক মানুষকে টিকা দেয়া হচ্ছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ।
"ওরস্যালাইন ব্যবহার হচ্ছে, স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়ন হয়েছে, অধিকাংশ টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করছে – সেখান থেকে একটা বিতর্কতো আছেই যে আমাদের রোগের সমস্যার তুলনায় টিকায় বাড়তি খরচ হয়ে যাচ্ছে কি না," বলছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন।
তবে সব মিলিয়ে টিকা দেয়ার পর আগের আক্রান্তের সংখ্যার সঙ্গে টিকা দেয়ার পরে প্রাপ্ত ফলাফলের তুলনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
"যতটুকু এফোর্ট দেবো তাতে কতটা ফলাফল আসবে, সেটা আসলে হবার পরই বোঝা যাবে। আমি মনে করি, দিয়ে দেখা যাক আমরা কতটুকু উপকার পাই। ফলাফল আমরা পরেও বিবেচনা করতে পারবো," বলেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
এদিকে বৈশ্বিক রোডম্যাপের ভিত্তিতে বাংলাদেশে জাতীয় কলেরা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা – এনসিসিপি প্রণয়ন করেছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা।
এই পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদে কলেরা প্রতিরোধে নিরাপদ পানীয় জলের সুবিধা নিশ্চিত করা, স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার মতো ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অধিদপ্তর বলছে, টিকাদানের পাশাপাশি এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে কলেরার প্রাদুর্ভাব ও এর ক্ষয়ক্ষতি কমানোর একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।








