অসুখী সম্পর্ককে সুখী করা যায় কীভাবে?

দম্পতির মনোমালিন্য
    • Author, সোফি হারডাক
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

আপনি যদি কোনো একটি অসুখী সম্পর্কে থাকেন, তাহলে কষ্টটা আক্ষরিক অর্থেই হৃদয়ের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তীব্র বাকবিতণ্ডা থেকে ঘুমের সমস্যা হতে পারে। এমনকি বুকে ও শরীরের পেশিতেও ব্যথার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, একটা সুন্দর, সুখী সম্পর্ক আপনার স্বাস্থ্য, এমনকি আয়ুও বাড়াতে পারে।

অসুখী সম্পর্কের প্রভাব উল্টো। এটি ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এর ক্ষতি ধূমপান বা ব্যায়াম না করার সমান বা তার চেয়েও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর মনের কষ্ট তো আছেই।

কোনো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পথে থাকলে, সেটি বাঁচানোর জন্য কীভাবে চেষ্টা করা উচিত বলে মনে করেন কাপল থেরাপিস্টরা? কীভাবে একটা অসুখী সম্পর্ককে সুখী করা যায়?

এগুলো নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় কিন্তু কিছু চমকপ্রদ উত্তর পাওয়া যাচ্ছে।

দুই দিকে ফিরে থাকা নারী-পুরুষ, প্রতীকী ছবি

দম্পতিরা কেন ঝগড়া করেন

নতুন সম্পর্কে যাওয়ার পর সঙ্গীর সঙ্গে প্রথম ঝগড়াটা যদি নোংরা বাসন নিয়ে হয়, তাহলে ভবিষ্যতের একটা আভাস হয়তো সেখানেই আছে।

গবেষণা বলছে, একটি সম্পর্কে দম্পতিরা যে বিষয়গুলো নিয়ে ঝগড়া করেন, সেগুলো সাধারণত পুরো সম্পর্কজুড়েই একই ধরনের থাকে। বারবার ফিরে আসা সমস্যাগুলোকে অচলাবস্থা বা 'গ্রিড লকড' বলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে দম্পতিদের থেরাপি নিয়ে কাজ করা গটম্যান ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক ও মনোবিজ্ঞানী ক্যারি কোল বলেন, এসব সমস্যা হতে পারে অর্থ নিয়ে, সন্তান লালন-পালন নিয়ে, অথবা যৌন জীবন বা সম্পর্কে কে কতটা সিদ্ধান্ত নেবেন এমন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। কখনো ঘর কতটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হবে, এমন ছোট-খাটো বিষয়ও হতে পারে।

একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় মনোবিজ্ঞানী জন গটম্যান ও তার দল দম্পতিদের মতবিরোধ পর্যবেক্ষণ করেন। প্রথমবার তাদের মূল্যায়ন করা হয়। এরপর চার বছর পর আবার দেখা হয়।

কাপল থেরাপি

গবেষণায় দেখা যায়, ৬৯ শতাংশ ক্ষেত্রে চার বছর পরও দম্পতিরা একই ধরনের বিষয় নিয়ে ঝগড়া করছেন। অন্য গবেষণাতেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে।

যেখানে অর্থ-সম্পদের মতো কিছু মৌলিক বিষয় পরিবারে সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঘরের কাজ সমানভাবে ভাগ না করাও সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি করে। এতে বিচ্ছেদের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।

তবে মতবিরোধ থাকাটাকে একদম খারাপ বলা যায় না। সুখী ও অসুখী—দুই ধরনের দম্পতিই ঝগড়া করেন। এটি একে অন্যের প্রয়োজন বোঝা এবং সেই অনুযায়ী আচরণ শেখার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশও হতে পারে।

গবেষণা বলছে, আসল পার্থক্য হলো, তারা একে অন্যের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করেন। ঝগড়ার সময় বা তার বাইরে।

যে চার আচরণ 'সম্পর্ক নষ্ট' করতে পারে

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

গবেষণার ভিত্তিতে ক্যারি কোল চারটি নির্দিষ্ট আচরণের কথা বলেন যেগুলো বিচ্ছেদের ইঙ্গিত দেয়। আচরণগুলো হলো-

  • সমালোচনা
  • অবজ্ঞা
  • আত্মপক্ষ সমর্থনের মনোভাব এবং
  • নীরবতা বা 'স্টোনওয়ালিং'

কোল বলেন, "এই চারটি আচরণ সম্পর্ক ধ্বংস করে দিতে পারে।... তবে দুজন এগুলো ঠিক করতে চাইলে করা সম্ভব।"

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সঙ্গীর কাছ থেকে ক্রমাগত সমালোচনা অকালমৃত্যুর সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পর্কিত। এর সাথে আগ্রাসন ও বৈরিতা যুক্ত হলে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তবে গঠনমূলক ঝগড়া সম্পর্ককে শক্তিশালীও করতে পারে। এক্ষেত্রে দুজন সম্মান, কৌতুহল এবং সহানুভূতির সঙ্গে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন।

এখানে একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সংবেদনশীলতা। এই অনুভূতি যে আপনার সঙ্গী আপনার কথা শোনেন, সমর্থন করেন এবং বোঝেন। সঙ্গী সংবেদনশীল হলে জীবনে বেশি সন্তুষ্টি থাকে। এটি প্রদাহ কমাতে এবং শারীরিক স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে। দয়া ও সহযোগিতাও দীর্ঘমেয়াদী ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।

বিবাহিত দম্পতিদের নিয়ে ২০ বছরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ঘরের কাজ সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া বেশি দাম্পত্য সুখের সঙ্গে সম্পর্কিত। এতে ঝগড়াও কম হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে ঝগড়া বেশি তিক্ত হলে ঘুম খারাপ হয়, আর গঠনমূলক বা সমাধানমুখি হলে ঘুম ভালো হয়।

একটি মুসলিম দম্পতি

সহানুভূতি পুনর্গঠন

আপনি যদি একটি অসুখী সম্পর্কে থাকেন, তাহলে তিক্ত ও বৈরী ঝগড়া থেকে সহানুভূতিশীল ও সহযোগিতামূলক কথাবার্তায় যাওয়া প্রায় অসম্ভব মনে হতে পারে।

কিন্তু এমন অনেক প্রমাণ আছে যে এটি সম্ভব। যেমন, থেরাপির সাহায্যে।

গবেষণা বলছে, যারা কাপল থেরাপি নেন, তাদের ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এটি সম্পর্কের সমস্যা কমাতে পারে। মানসিক ঘনিষ্ঠতা বা শারীরিক স্বাস্থ্য সমস্যার উন্নতিতেও সাহায্য করতে পারে।

ইলিনয়ে নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ফ্যামিলি ইনস্টিটিউটের কাপল থেরাপিস্ট ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির অধ্যাপক জে লেবোর মতে থেরাপি কাজ করছে কি না তা বোঝার একটা লক্ষণ হলো কথা বলা ও শোনার ক্ষেত্রে উন্নতি।

লেবো বলেন, "সম্পর্কে যখন অনেক সমস্যা থাকে, তখন মন দিয়ে শোনা খুব কঠিন হয়ে যায়।"

সম্পর্ক নিয়ে কাজ করার অর্থ হলো একটু পিছিয়ে এসে প্রশ্ন করা— "আমার সঙ্গীর সাথে আমার কী সমস্যা?"

সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে দুটি লক্ষণের দিকে জোর দেন লেবো। একটি একজন সঙ্গীর অন্যজনকে বলা যে "তুমি কেন এমন অনুভব করছ, সেটা আমি বুঝতে পারছি"।

অর্থাৎ, নিজের মতের সঙ্গে ভিন্ন হলেও সঙ্গীর দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নেওয়া।

আরেকটি লক্ষণ হলো—তারা কি একে অপরকে নিয়ে জানতে আগ্রহী? সেই আগ্রহ থাকলে, আশার জায়গা থাকে বলে মনে করেন লেবো।

তিনি বলেন, "যদি মানুষ তাদের সমস্যা নিয়ে কাজ করে, তাহলে যে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়, তার যথেষ্ট জোরালো প্রমাণ রয়েছে।"

যুগল

নিজেদের স্বপ্ন বোঝা

বারবার ফেরত আসা, অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে একে অন্যের স্বপ্ন ও লক্ষ্য বোঝা কাজে দিতে পারে বলে মনে করেন কোল।

তিনি একটি দম্পতির উদাহরণ দেন। তারা বারবার আর্থিক বিষয় নিয়ে ঝগড়া করতেন। দুজনেই দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছেন।

কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব ছিল দুজনের জন্য ভিন্ন। স্ত্রীর লক্ষ্য ছিল সঞ্চয় এবং সতর্ক বাজেট করার মাধ্যমে আর্থিকভাবে সুরক্ষিত ও স্বাধীন হওয়া। আর স্বামী তার কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে ভালো ভালো জিনিস কিনে খরচ করতে চাইতেন।

"তারা সারাক্ষণ ওইসব বিষয় নিয়ে তারা ঝগড়া করতেন। আর তারা কেন ঝগড়া করছে, সেই কারণটা তারা কখনোই খুঁজে বের করতেন না," বলেন কোল।

থেরাপিতে তারা একে অন্যের কথা শোনেন।

দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠার কষ্টের অভিজ্ঞতা কীভাবে তাদের জীবনের লক্ষ্য তৈরি করেছে সেগুলো নিয়ে কথা বলেন। একে অপরকে বোঝার ও আপস করার চেষ্টা করেন। সঞ্চয়ের জন্য কত টাকা আলাদা করে রাখবেন ও কত টাকা খরচ করার স্বাধীনতা পাবেন, সে বিষয়গুলো তারা ঠিক করেন। "তারা শেষ পর্যন্ত সমস্যার সমাধান করতে পেরেছিলেন। কিন্তু তার আগে তাদের বুঝতে হয়েছিল, দুজনের কাছে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।"

লেবো আরেকটি বিষয়ে জোর দেন। তা হলো, দম্পতির নিজেদের আগ্রহ ও চেষ্টা।

তিনি বলেন, "পৃথিবীর সেরা কাপল থেরাপিস্ট থাকলেও, যারা সম্পর্ক ঠিক করতে চান না, তাদের ফল ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম।"

অর্থাৎ নিজেদের ইচ্ছা বা আগ্রহ থাকলে অনেক সমস্যাই সমাধান করা যায়।

ভালোভাবে বিচ্ছেদ

সম্পর্কে অনেক সময় বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তেও যেতে হয়। এক্ষেত্রেও কাপল থেরাপি কাজে আসতে পারে মনে করেন লেবো। এটি তাদের বিচ্ছেদ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলা করতে সাহায্য করতে পারে। সন্তান থাকলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ারও বিষয়টিও আসতে পারে।

লেবো বলেন, বিচ্ছেদ বা ডিভোর্সের মতো কষ্টের সময়ে "আপনি নিজের সম্পর্কে অনেক কিছু শিখতে পারেন"।

তবে তার মতে, একে অপরকে শোনা ও সহানুভূতি আসলে এক ধরনের দক্ষতা, যেটা শুধু সমস্যায় থাকা দম্পতিদের জন্য না, এটা "ভালো থাকা মানুষদের সম্পর্ককেও আরও উন্নত করতে পারে"।