এবার শেখ হাসিনার সঙ্গে জয় ও পুতুলের বিচার শুরু, অভিযোগ কী

শেখ হাসিনা, জয়, পুতুল
ছবির ক্যাপশান, প্লট দুর্নীতির অভিযোগে শেখ হাসিনা, তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এবং ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার বাদীরা।
Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ঢাকার পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট দুর্নীতির পৃথক তিন মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এবং ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে মামলার বাদীরা সাক্ষ্য দিয়েছেন।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় কোনো মামলায় বিচার কার্যক্রম শুরু হলো। এর আগে গত সপ্তাহে বিচার শুরু হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলায়।

এখন প্লট দুর্নীতির তিন মামলার তিনজন বাদী আজ আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন, এই প্লট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।

তবে আসামি পলাতক থাকায় সাক্ষীদের জেরা করার কোনো সুযোগ ছিল না এসব মামলায়। এ মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ২৬ শে অগাস্ট।

আজ সোমবার বেলা প্রায় পৌনে বারোটা থেকে প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে তিন মামলার বাদীর জবানবন্দী নেন ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন।

দুপুর সোয়া একটায় তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।

এই তিনটি মামলাতেই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসামি। তার বিরুদ্ধে করা মামলায় মোট আসামি বারোজন।

এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ - পরিচালক ও মামলার বাদী মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে করা মামলার আসামি ১৮ জন। এ মামলার বাদী দুদকের সহকারি পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া সাক্ষ্য দিয়েছেন।

এছাড়া প্লট দুর্নীতির অভিযোগে সজীব ওয়াজেদ জয়সহ ১৭ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন দুদকের সহকারি পরিচালক ও বাদী এস এম রাশেদুল হাসান।

দুদকের আইনজীবী খান মো. মইনুল হাসান পরে সাংবাদিকদের বলেন, " বাদী হিসেবে তারা যে প্রাথমিক অনুসন্ধান করেছেন সেখানে তিনজন বাদীই বলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তিনি দ্য ঢাকা টাউন আইনের বিধি লঙ্ঘন করে মিথ্যা হলফনামা প্রদান করে প্লটগুলো নিজের কাছে এবং ছেলে ও মেয়ের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।"

ঢাকায় তাদের নামে একাধিক বাড়ি, প্লট রয়েছে বলে জানান দুদক আইনজীবী। সুধা সদন তাদের নামে নামজারি করা রয়েছে।

রাজউকের বিধি অনুযায়ী, ঢাকা বা আশেপাশে নারায়নগঞ্জেও যদি নিজেদের নামে, নির্ভরশীল বা পোষ্য কারো নামে কোনো প্লট, ফ্ল্যাট থাকে তবে তারা প্লট পাবে না বলে জানান দুদকের এই আইনজীবী।

এক্ষেত্রে শেখ হাসিনা ক্ষমতার অপব্যবহার করে এ প্লটগুলো পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

মি. হাসান জানান, অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গসহ যে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, এসব অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

শেখ হাসিনা ও জয়
ছবির ক্যাপশান, আসামি শেখ হাসিনা প্লট বরাদ্দের জন্য নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করেননি বলে জানান মামলার বাদীরা।

মামলায় অভিযোগ কী?

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের প্লট দুর্নীতির মামলায় গত ৩১শে জুলাই বিশেষ জজ আদালত শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার সঙ্গে তাদের সন্তানসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয়।

মোট ছয়টি মামলার মধ্যে আজ সোমবার (১১ অগাস্ট) শেখ হাসিনাসহ তার দুই সন্তানের বিরুদ্ধে হওয়া তিন মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।

বাকি তিন মামলায় শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা তার মেয়ে টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও আরেক মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হবে আগামী ১৩ই অগাস্ট।

প্লট দুর্নীতির ছয় মামলাতেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে। প্রতিটি মামলারই বিবরণই প্রায় একরকম।

গণ অভ্যুত্থানের মুখে গত পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর গত ডিসেম্বরে তাদের বিরুদ্ধে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠা করে ছয়টি প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। মোট ৬০ কাঠার প্লট।

এরপর এ বছরের ১২ই জানুয়ারি প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগে পুতুলের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করে দুদক।

পরদিন শেখ রেহানা ও তার ছেলেমেয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে সংস্থাটি। পরে ১৪ই জানুয়ারি শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।

এসব মামলায় শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্য ছাড়াও আরো ১৬ জনকে এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে।

এদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব সালাউদ্দিন, জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার, অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) কাজী ওয়াছি উদ্দিন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সরকার, সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞা।

এছাড়া রাজউক এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রনালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকেও এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে।

আসামিদের অনেকেই একাধিক মামলার আসামি।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা নিজে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকারের সর্বোচ্চ পদাধিকারী পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে দায়িত্বরত ও বহাল থাকা অবস্থায় নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তিনি পরস্পর যোগসাজশে নিজেরা লাভবান হওয়া ও অন্যকে লাভবান করার অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের অতি মূল্যবান কূটনৈতিক এলাকায় ২৭ নং সেক্টরের ২০৩ নম্বর রাস্তার নয় নম্বর প্লট নিজ নামে দখল ও রেজিস্ট্রি করেছেন।

শেখ হাসিনা নিজের পুত্র - কন্যার নামে, নিজ বোন ও বোনের পুত্র - কন্যার নামে পৃথক প্লট বরাদ্দ করিয়ে ও তাদের পৃথক নামে রেজিস্ট্রিমূলে বাস্তব দখলসহ গ্রহণ করিয়ে প্রতারণামূলক অবৈধ পারিতোষিক গ্রহণ, প্রদান ও অপরাধজনিত বিশ্বাসভঙ্গ এবং বেআইনী অনুগ্রহ প্রদর্শন করে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে দণ্ডযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।

২০০৮ সালে রাজউক এ প্রকল্পে প্লট বরাদ্দের জন্য বিজ্ঞাপন দেয়। পরে ২০০৯ সালের ১২ই এপ্রিল সংশোধনী বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।

মামলার তিনজন বাদী তাদের সাক্ষ্যে জানিয়েছেন, এসব প্রকল্পের প্লট বরাদ্দের জন্য বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত সময়ে আবেদন করেননি প্লটপ্রাপ্তরা। এর মাধ্যমে রাজউকের বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে।

আদালতে সাক্ষীরা জানান, রাজউকের বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনের বিপরীতে নির্ধারিত ফরম ছাড়া অন্য কোনো আবেদন গ্রহণ করা হয় না।

একইসাথে নির্ধারিত সময়সীমার পর নির্ধারিত ফরম ছাড়া আকস্মিকভাবে কেউ আবেদন করলে তা বিবেচিত হবে না বলে জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন মামলার বাদীরা।

আসামি শেখ হাসিনা প্লট বরাদ্দের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা ও নির্ধারিত ফরমে আবেদন করেননি বলে জানান তারা।

একইসাথে যথাযথভাবে প্রাপ্ত সব আবেদন প্লটের আকার অনুসারে বিভাগ অনুসারে একটি রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করার বিধান থাকলেও শেখ হাসিনার প্লট বরাদ্দের জন্য কোনো আবেদনের তথ্য রাজউকের কোনো রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ করা হয়নি বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া শেখ হাসিনা মিথ্যা হলফনামা জমা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদকের আইনজীবী মি. হাসান।

তিনি জানান, দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তে পাওয়া গেছে, ঢাকা শহরে সুধা সদন নামের বাড়িটি তাদের নামে রেজিস্ট্রি করা ও নামজারি করা। তারা সে তথ্য গোপন করেছেন হলফনামায়।

টিউলিপ সিদ্দিক
ছবির ক্যাপশান, আমি যেন এক ধরনের কাফকার মতো দুঃস্বপ্নের ভেতর আটকে পড়েছি, দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন টিউলিপ সিদ্দিক

'মুহাম্মদ ইউনূস ও খালার মধ্যে বিরোধে আমি ক্ষতিগ্রস্ত'

শেখ হাসিনার ভাগ্নি ও ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক তার বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগের বিষয়ে দ্য গার্ডিয়ানকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কমপ্লিটলি অ্যাবসার্ড অর্থাৎ একেবারেই হাস্যকর।

তিনিএ-ও বলেছেন, "সত্যি কথাটা হলো, মুহাম্মদ ইউনূস ও আমার খালার (শেখ হাসিনা) মধ্যে বিরোধের কারণে আমি ক্ষতিগ্রস্ত।"

অভিযোগ ওঠার পর গত জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেটের এই এমপি ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ মিজ সিদ্দিক তার প্রভাব খাটিয়ে শেখ হাসিনার ভাগ্নি হিসেবে তার মা, ভাই ও বোনের জন্য পূর্বাচলে একটি জমির প্লট বরাদ্দ করিয়েছেন।

এরই মধ্যে সপ্তাহখানেক আগে মিজ সিদ্দিক আইনজীবীর শরণাপন্ন হয়েছেন।

দ্য গার্ডিয়ানকে সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, এক্সট্রাডিশন বা প্রত্যাবর্তনের কোনো চুক্তি নেই, তিনি নিজে খুঁজে দেখেছেন।

" আমি হুগো কিথ কেসি'র পরামর্শ নিচ্ছি, যিনি আমাকে আমার পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে পরামর্শ দিচ্ছেন " বলেন তিনি।

মিজ সিদ্দিক বলেন, " আমি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সমন দেখিনি(পাইনি)… আই মিন আমি নাকি কয়েক দিনের মধ্যেই একটি বিদেশি দেশে সাজানো বিচারের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি অথচ আমি এখনও জানি না আমার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে এবং আমি এখনো জানি না আমার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ আনা হয়েছে।"

" আমার মনে হচ্ছে আমি যেন এক ধরনের কাফকার মতো দুঃস্বপ্নের ভেতর আটকে পড়েছি। যেখানে আমাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে কিন্তু আমি সত্যিই জানি না অভিযোগগুলো কি অথবা বিচার আসলে কি নিয়ে " বলেন মিজ সিদ্দিক।

আগামী ১৩ই অগাস্ট শেখ রেহানা ও টিউলিপসহ তার তিন ছেলে-মেয়ের বিরুদ্ধে করা প্লট দুর্নীতি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ করা হবে।