যে দুজন ‘কিংমেকারে’র ওপর ভারতে বিরোধীদের নজর থাকবে

লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর আপাতত কিং মেকার হিসাবে বিবে ছোঁয়া করা হচ্ছে এন চন্দ্রবাবু নাইডু এবং নীতীশ কুমারকে।
ছবির ক্যাপশান, লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর আপাতত কিং মেকার হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে এন চন্দ্রবাবু নাইডু এবং নীতীশ কুমারকে।
    • Author, রূপসা সেনগুপ্ত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
  • Published

ভারতে টানা তৃতীয় দফায় সরকার গঠনের দিকে এগোচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী। বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার শরিক দলগুলির মধ্যে আলাপ আলোচনা হওয়ার আগেই, একেবারে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বুধবার তিনি সেরে ফেলেছেন এনডিএ জোটের শরিকদের সঙ্গে বৈঠক।

কারণ একটাই, এইবারে বিজেপির হাতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন জোটসঙ্গীরা। এবং এই জোট সরকারে বিরোধীরা ‘ভাঙন' ধরানোর সুযোগ পাক, তা নরেন্দ্র মোদী চাননি।

বুধবার মি. মোদী এবং বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে এনডিএ-র বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শরিক শিবসেনার একনাথ শিন্ডে, এলজেপির চিরাগ পাসোয়ান, আরএলডির জয়ন্ত চৌধুরি, জনসেনা দলের পবন কল্যাণ-সহ আরও অনেকে।

তবে বলা বাহুল্য এই জোটের প্রাণভোমরা হতে চলেছেন তেলুগু দেশম পার্টির সভাপতি এন চন্দ্রবাবু নাইডু এবং বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও জনতা দল (ইউনাইটেডের) প্রধান নীতিশ কুমার, যাদের ঝুলিতে রয়েছে যথাক্রমে ১৬টি এবং ১২টি আসন।

এনডিএ জোটকে ইতিমধ্যে তারা সমর্থনপত্রও দিয়ে ফেলেছেন, একই সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর সামনে রেখেছেন তাদের একাগুচ্ছ দাবিদাওয়াও। যার মধ্যে রয়েছে নিজেদের রাজ্যের জন্য বিশেষ প্যাকেজ এবং নিজ দল থেকে একের বেশি পূর্ণমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পদ ইত্যাদি।

সরকার গঠনকে ঘিরে ইতিমধ্যে চাপে থাকা বিজেপির উপর আরও চাপ বাড়িয়ে এনডিএ-তে এই দুই প্রবীণ নেতা যে জাঁকিয়ে বসতে চাইবেন, সে বিষয়ে অনুমান করেছিলেন অনেকেই।

এদিকে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এই দুই 'কিংমেকারের' দিকে তাকিয়ে কিন্তু বিরোধী ইন্ডিয়া জোটও। ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই বিজেপি বিরোধী জোটের শরিকদের তরফে এই দুই প্রবীণ রাজনীতিবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল বলে খবর।

এদিকে, বুধবার সন্ধ্যায় ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেসের সোনিয়া গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী, ডিএমকের এমকে স্তালিন, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ ইয়াদব, উদ্ধব ঠাকরের ঘনিষ্ঠ সঞ্জয় রাউত, তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিষেক ব্যানার্জী-সহ অন্যান্য শরিক দলের নেতারা। সেখানে ঠিক হয়, আপাতত বিরোধী দলের ভূমিকাতেই থাকবে ইন্ডিয়া জোট।

বৈঠক শেষে কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে জোটের প্রতিনিধি হিসাবে জানিয়ে দেন, সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বিরোধী জোট হিসাবে যে সমস্ত দাবি দাওয়া নিয়ে তারা লড়াই করে এসেছেন, সেই পথেই আগামী দিনে এগিয়ে যাবে ইন্ডিয়া।

বৈঠক শেষে ইন্ডিয়া জোটের নেতারা।
ছবির ক্যাপশান, বৈঠক শেষে ইন্ডিয়া জোটের নেতারা।
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে আরও বলেছেন, "যথোপযুক্ত সময়ে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"

একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরিস্থিতি তেমন হলে সরকার উল্টে দিতেও পিছপা হবে না ইন্ডিয়া জোট।

রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষককের অনেকেই মনে করছেন ইন্ডিয়া জোটের নজর আপাতত থাকবে বিজেপির জোটসঙ্গীদের উপরে।

আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে জনতা দল ইউনাইটেড এবং তেলেগু দেশম পার্টির উপর। কারণ (দুটি দল মিলিয়ে) ২৮টি আসন ঝুলিতে রাখা এন চন্দ্রবাবু নাইডু এবং নীতিশ কুমারের সমর্থন ছাড়া সরকার গড়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক শিখা মুখার্জী বলেন, "জোটের রাজনীতির অঙ্ক খুব সহজ। যে দল সমর্থন করছে, সেই সমর্থনের বদলে তারা কিছু সুযোগ সুবিধা পেতে চায়। এখন সেই দাবিদাওয়া না মিটলে তারা অন্যদের দিকে তাকাবে।"

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলেন, "চন্দ্রবাবু নাইডু এবং নীতিশ কুমারের কাছ থেকে কংগ্রেস প্রত্যাশা করতেই পারে। এর কারণ খুব সহজ। এরা দুজনেই নিজেদের স্বার্থ ভাল বোঝেন এবং তার উপর ভিত্তি করে অতীতে বারবার তাদের জোট বদল করতেও দেখা গিয়েছে।"

“এই স্বার্থ পূরণ না হলে তারা বেরিয়ে আসতে দ্বিধা করবেন না।”

মি. ভট্টাচার্য ব্যাখ্যা করেছেন, এ ক্ষেত্রে স্বার্থ বলতে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা এবং তাদের রাজ্যের জন্য বিশেষ সুবিধা বোঝানো হচ্ছে।

এনডিএ-র সঙ্গে চন্দ্রবাবু নাইডুর সম্পর্ক নতুন নয়।
ছবির ক্যাপশান, এনডিএ-র সঙ্গে চন্দ্রবাবু নাইডুর সম্পর্ক নতুন নয়।

কিংমেকার চন্দ্রবাবু ও নীতিশ

অন্ধ্রপ্রদেশে একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন ছিলেন চন্দ্রবাবু নাইডু।

শুধু রাজ্য রাজনীতি নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। অতীতে কংগ্রেস ও বিজেপি দু'দলের সঙ্গেই সম্পর্ক ছিল মি. নাইডুর।

তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু কংগ্রেসের হাত ধরে। পরে শ্বশুর এনটি রামারাও-এর প্রতিষ্ঠিত তেলুগু দেশম পার্টিতে যোগ দেন তিনি।

১৯৯৬ সালে প্রথম ইউনাইটেড ফ্রন্ট সরকারের আহ্বায়ক হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি।

১৯৯৯ সালে এনডিএ-কে সমর্থন করেন তিনি। যদিও সরাসরি তাতে যোগ দেননি।

সেই থেকে জাতীয় স্তরের রাজনীতিতে তার গুরুত্ব বোঝা যেতে থাকে।

২০১৪ সালে মোদী সরকারকে সমর্থন করেন তিনি। যদিও ২০১৮ সালে বেরিয়ে আসেন। ২০১৮ সালে তার দল এনডিএ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর নির্বাচনে ভরাডুবি হয় তেলুগু দেশম পার্টির।

২০১৮ সালে টিডিপি তেলেঙ্গানা বিধানসভায় মাত্র দুজন বিধায়ক নিয়ে টিঁকে ছিল এবং গত লোকসভা নির্বাচনে তারা মাত্র ৩টি আসন জিতেছিল।

২০২৩ সালে অন্ধ্রপ্রদেশ স্কিল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে জেলে যেতে হয়েছিল তাকে। পরে অবশ্য তিনি জামিন পান।

তার প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়াইএস জগন মোহন রেড্ডির কাছে পরাজিত হওয়ার পর তার রাজনৈতিক কেরিয়ার নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠতে থাকে, ঠিক তখনই আবার চন্দ্রবাবু সমস্ত সমীকরণ পাল্টে দেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আবার এনডিএ-তে যোগ দেয় তার দল। এরপর অন্ধ্রপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে ১৭৫টি আসনের মধ্যে ১৩৫টি এবং লোকসভা নির্বাচনে ১৬টি আসন তাদের ঝুলিতে আসে।

আপাতত তিনি জাতীয় রাজনীতির অন্যতম কিংমেকার হিসাবে বিবেচিত হচ্ছেন।

একসময় এনডিএ-র সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কে ইতি টেনে ছিলেন নীতীশ কুমার পরে যদিও ফায়ার আসেন।
ছবির ক্যাপশান, একসময় এনডিএ-র সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কে ইতি টেনে ছিলেন নীতীশ কুমার পরে যদিও ফিরে আসেন

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারকে বিজেপির জোট এবং বিজেপি বিরোধী জোট, দুই শিবিরেই দেখা গিয়েছে।

১৯৯৬ সালে অটল বিহারী বাজপেয়ীর আমলে এনডিএ জোটে যোগ দেন তিনি।

২০১৩ সালে নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য মনোনীত করার পর তিনি সম্পর্ক ছিন্ন করেন ওই জোটের সঙ্গে। নাম লেখান বিরোধী শিবিরে।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে অবশ্য নীতিশ কুমার বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এরপর ২০২০ সালে এক সঙ্গে বিহার বিধানসভা নির্বাচনে লড়েছিলেন তিনি।

২০২২ সালে বিজেপির সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি আরজেডির (যারা কংগ্রেসের সঙ্গে জোটে ছিল) সঙ্গে হাত মেলান।

নীতিশ এক সময় ইন্ডিয়া জোটেরও অংশ ছিলেন।

গত বছর জুন মাসে পাটনায় ইন্ডিয়া জোটের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এর উদ্যোগ নিয়েছিলেন নীতীশ কুমার এবং এই বৈঠকটি পাটনায় তার বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

সেই সময় তিনি জোটের শরিক ছিলেন এবং বলেছিলেন, "কেন্দ্রের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে সমস্ত নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে সম্মত হয়েছেন।"

এরপর সেই জোট ভেঙে বেরিয়ে আসতেও দ্বিধা করেননি তিনি।

মাস ছয়েক যেতে না যেতেই বিজেপিকে সঙ্গে নিয়ে রাজ্যে সরকার গড়েন নীতীশ কুমার। এখন তিনি আবারও নরেন্দ্র মোদীর প্রতি আস্থা দেখিয়েছেন।

নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে চন্দ্রবাবু নাইডু এবং নীতীশ কুমার।
ছবির ক্যাপশান, নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে চন্দ্রবাবু নাইডু এবং নীতীশ কুমার।

এনডিএ শরিকদের দাবিদাওয়া

মঙ্গলবার ফল প্রকাশের নীতিশ কুমার, চন্দ্রবাবু নাইডুকে দিল্লিতে এনডিএ-র বৈঠকে আসার অনুরোধ জানানো হয় মি মোদীর তরফ থেকে।

শরিকরা যে তাদের দাবিদাওয়া সামনে রাখবেন, বিশেষত যখন বিজেপির ঝুলিতে গরিষ্ঠতা নেই, এই বিষয়টা আন্দাজ করাটা কঠিন ছিল না।

শোনা গিয়েছে বুধবারের বৈঠকে নীতীশ কুমার তার দলের জন্য চারটি পূর্ণমন্ত্রী ও একটি প্রতিমন্ত্রী পদ চেয়েছেন। সূত্রের খবর, তার প্রথম দাবি ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু বিজেপি এই মন্ত্রণালয় হাতছাড়া করতে রাজি নয়।

তাই কৃষি, গ্রামোন্নয়ন ও রেল মন্ত্রণালয় চেয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে চেয়েছেন বিহারের জন্য 'বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা', যা তার অনেক আগে থেকেই দাবি ছিল।

অন্য দিকে, চন্দ্রবাবু নাইডু তিনটি পূর্ণমন্ত্রী ও চারটি প্রতিমন্ত্রীর পদ চেয়েছেন। একই সঙ্গে স্পিকার পদেও দাবি জানিয়েছেন।

শোনা গিয়েছে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অন্ধ্রপ্রদেশের জন্য স্পেশাল প্যাকেজও চেয়েছেন। অন্ধ্রপ্রদেশের জন্য বিশেষ রাজ্যের তকমারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, লোক জনশক্তি পার্টির সভাপতি চিরাগ পাসোয়ান পূর্ণ ও রাষ্ট্রমন্ত্রী মিলিয়ে খান তিনেক পদের দাবি জানিয়েছেন। একনাথ সিন্ধে চেয়েছেন দু’টি পূর্ণমন্ত্রীর পদ।

এখন কেন্দ্রে সরকার তৈরির জন্য প্রয়োজন ২৭২টি আসন। কিন্তু বিজেপির ঝুলিতে রয়েছে ২৪০। কাজেই জোট সরকার গড়তে শরিকদের ভূমিকা অপরিহার্য।

আর নিজেদের দাবি দাওয়া আগেই স্পষ্ট করে বিজেপিকে কিছুটা চাপেই রেখেছে এনডিএ-র শরিকরা। বিজেপির সামনে এখন মুখ্য হলো জোট রাজনীতির ধর্ম পালন করা, অর্থাৎ শরিকদের সন্তুষ্ট রাখা।

আর এই পরিস্থিতিকেই কাজে লাগাতে পারে কংগ্রেস-সহ ইন্ডিয়া জোট।

আস্থা ভোটের প্রসঙ্গ উঠলেই, শরিকদের মতিগতির ওপর নজর রাখা এবং সুযোগ মতো সরকার উল্টে দেওয়াই এখন বিরোধী শিবিরের একমাত্র লক্ষ্য হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

২০১৯ সালে একটি বিজেপি বিরোধী মঞ্চে অখিলেশ ইয়াদবের সঙ্গে চন্দ্রবাবু নাইডু।
ছবির ক্যাপশান, ২০১৯ সালে একটি বিজেপি বিরোধী মঞ্চে অখিলেশ ইয়াদবের সঙ্গে চন্দ্রবাবু নাইডু।

বিরোধীদের নজর যাদের ওপর

এখন বিজেপির এই দুই শক্তিশালী জোটসঙ্গীর অতীতের ভোলবদলের ঘটনা অজানা নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলেন, "অতীত ঘাঁটলে দেখা যাবে, নীতিশ কুমার এবং চন্দ্রবাবু নাইডু একাধিকবার দিকবদল করেছেন। চন্দ্রবাবু ২০১৪ সালে বিজেপির শরিক ছিলেন, ২০১৮-তে ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন। ২০১৯ সালে ভোটে তার ভরাডুবি হয়।"

"নীতিশ কুমারের ক্ষেত্রেও তাই। উনি ইন্ডিয়া জোটের অংশ ছিলেন। সেখানে তার রাশ সেই ভাবে থাকছে না দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এবং ইঙ্গিত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজেপি তার সঙ্গে যোগাযোগ করে।"

দুই শরিকের সঙ্গে বিজেপির সমীকরণ ও সেটির পরিবর্তনের কথাও ব্যাখ্যা করেছেন মি. ভট্টাচার্য।

তিনি বলেন, "এক্ষেত্রে উল্লেখ করতে হয়, অন্ধ্রপ্রদেশে বিজেপি কিন্তু একা লড়ারই পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু চন্দ্রবাবু নাইডু চাইছিলেন এইটা নিশ্চিত করতে যে ওয়াইএস জগন মোহন রেড্ডির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অন্য কোনো শক্তি যাতে ভোট না কেটে নেয়।"

"তাই উনি জনসেনার সঙ্গে হাত মেলানোর পর নিজে থেকে বিজেপির সঙ্গে জোট করেন। সে সময় চন্দ্রবাবুর উদ্যোগ বেশি ছিল।"

যদিও এখন পরিস্থিতি বদলেছে। বিষয়টি বিশদে ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "কিন্তু ২০২৪ সালের ভোটের ফল প্রকাশের পর চন্দ্রবাবুর যতটা না বিজেপিকে দরকার, তার চাইতে তাকে অনেক বেশি প্রয়োজন বিজেপির। এই পরিস্থিতিতে চন্দ্রবাবু একটা বড়সড় দরকষাকষি করতে চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক।"

"নীতীশ কুমারও একই কাজ করবেন। কারণ তাদের উপর বিজেপির সরকার নির্ভর করছে। "

এর কারণও ব্যাখ্যা করেছেন মি. ভট্টাচার্য।

"এর কারণ হল দরকষাকষি করে তারা যাতে নিজের দলের জন্য যতটা সম্ভব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেন। এবং নিজ রাজ্যের জন্যও কিছু করতে পারেন, যাতে সেখানে তাদের গুরুত্ব বজায় থাকে।"

"আর তারা দেখতে পারেন যে এনডিএ জোটের অংশ হওয়ার দরুন তারা রাজ্যের জন্য কিছু বিশেষ সুযোগ সুবিধা আনতে পারছেন", বলছিলেন তিনি।

তবে আপাতত এই দুই জোটসঙ্গী এই মুহূর্তে তাদের সিদ্ধান্ত বদল করবে না বলেই মনে করেন তিনি। মি. ভট্টাচার্যর কথায়, "এই মুহূর্তে এরা জোট বদলাবেন না বলেই মনে হয়। তারা দেখবেন এনডিএ জোটে তাদের অবস্থা কী দাঁড়ায়।”

“ওদিকে ইন্ডিয়া জোট ইতিমধ্যে যথোপযুক্ত সময়ে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলে বিজেপির স্নায়ুচাপ বাড়িয়ে রেখেছে।"

যার অর্থ, নীতিশ কুমার ও চন্দ্রবাবু নাইডুর জন্য তাদের দরজা খোলা।

"এই ইঙ্গিতের অর্থ হলো শরিকদের যদি বিজেপি সন্তুষ্ট না করতে পারে তাহলে আমরা শরিকদের টেনে নেব। চন্দ্রবাবু বা নীতিশ কুমার পরিস্থিতি তাদের পক্ষে না হলে যে কেউ যে কোনও মুহুর্তে বেরিয়ে যেতে পারেন।"

"অতীতেও এমনটা দেখা গিয়েছে। আর বিরোধীরা এই দু'জনের সঙ্গে তলায় তলায় যোগাযোগ রাখবেন এমনটা আশা করাই যায়। এবং ইন্ডিয়া জোটকে সব সময় এই শরিকদের উপর নজর রাখতে হবে।"

হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন মি. ভট্টাচার্য। তিনি মনে করেন বিজেপির সঙ্গে নীতিশ কুমার এবং চন্দ্রবাবু নাইডুর মতাদর্শগত পার্থক্য হতেই পারে, বিশেষত ইস্যু ভিত্তিক বিষয়ে।

তিনি বলেছেন, "বিজেপির যে সমস্ত হিন্দুত্ব ভিত্তিক ইস্যু রয়েছে, তাতে ওদের সমর্থন না-ই থাকতে পারে। চন্দ্রবাবুর জনভিত্তি আলাদা। সেটা হিন্দু ন্যাশনালিস্ট জনভিত্তি নয়। নীতিশ কুমার এখনও মুসলিম ভোট পান। তাই মুসলিম বিরোধী প্রসঙ্গে তিনি সমর্থন করতে পারবেন বলে মনে হয় না।"

"অন্য দিকে, ধর্ম নিয়ে উন্মাদনাও করতে পারবেন না। হেইট স্পিচ-এর সমর্থন করতে পারবেন না ,কারণ চন্দ্রবাবু নাইডুর জনভিত্তি সেটা পছন্দ করবে না। এমন একাধিক ফ্যাক্টর রয়েছে এবং কংগ্রেস সেগুলো জানে।"

বুধবারের বৈঠকে ইতিমধ্যে এনডিএ-র শরিকরা তাদের দাবিদাওয়া জানিয়েছেন।
ছবির ক্যাপশান, বুধবারের বৈঠকে ইতিমধ্যে এনডিএ-র শরিকরা তাদের দাবিদাওয়া জানিয়েছেন।

জোট সরকার ও নরেন্দ্র মোদী

শরিক নির্ভর সরকারে নরেন্দ্র মোদীর কর্তৃত্ব অটুট থাকবে কি না সে নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে জোটনির্ভর সরকারে শরিকদের চাপে কতটা 'নরম' হতে হবে তাকে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জী বলেন, "২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত মোটামুটি বিজেপির একাধিপত্য ছিল। যার সম্পূর্ণ সুযোগ মোদী নিয়েছেন। এইবার তারা জোট সরকার গড়ছে ... মানে গড়তে বাধ্য হচ্ছে। কারণ গরিষ্ঠতা নেই।"

একই মত প্রকাশ করেছেন মি. ভট্টাচার্যও। তিনি বলেছেন, "নরেন্দ্র মোদীর কিন্তু অভিজ্ঞতা নেই জোট সরকার চালানোর। এতদিন এনডিএ সরকার থাকলেও সেটা নামেই ছিল। তার গুরুত্ব ছিল না।"

"অধিকাংশ বড় সিদ্ধান্ত বিজেপি নিজে নিত। কিন্তু এখন তাদের শরিকদের কথাও শুনতে হবে এবং গুরুত্ব দিতে হবে। এই বিষয়টা মোদী কতটা সামলাতে পারেন সেটা দেখার। এবং এর অপেক্ষায় বিরোধীরাও থাকবে এবং শরিকদের সঙ্গে তলায় তলায় যোগাযোগও রাখবে।"

জোট সরকারের অন্য একটি বিষয়ের কথা বলেছিলেন শিখা মুখার্জী।

তিনি বলেন, "জোট রাজনীতির ধর্ম একটা সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। হয় মোদী নীতিশ কুমার এবং চন্দ্রবাবুর চাহিদা মেটাবেন অথবা তারা বিজেপির উপর থেকে সমর্থন তুলে নেবেন।"

"কারণ, তাদের কাছে কতগুলো আসন রয়েছে এবং তাদের ক্ষমতা কতটা সেটা তারা দুজনেই জানেন!"