ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে শিশুদের ক্ষতি: ১৮০০ কোটি ডলার পরিশোধে সম্মত মেটা

Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল সংস্থা মেটা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আনা অভিযোগের নিষ্পত্তিতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে।

অভিযোগ ছিল, তাদের প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের ক্ষতি করেছে। আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে এই চুক্তি অনুযায়ী, মেটা

কে কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য দৈনিক ব্যবহারের সীমা এবং রাতে ব্লক করার মতো কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম চালু করতে হবে।

একটি বিবৃতিতে মেটা বলেছে, তারা ১৮ বিলিয়ন (১৮০০ কোটি) ডলার পরিশোধে সম্মত হয়েছে, তবে এর ৩০ শতাংশ টিকটক ও ইউটিউবের সঙ্গে সমঝোতা হওয়ার ওপর নির্ভরশীল।

এই অর্থ ১০ বছর ধরে বার্ষিক কিস্তিতে বিতরণ করা হবে বলেও তারা জানিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এই অর্থ "অনলাইন পরিবেশে তরুণদের নিরাপত্তা উদ্যোগসহ অঙ্গরাজ্যগুলোর অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচিতে অর্থায়নের" জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

মামলায় অংশ নেওয়া অঙ্গরাজ্যগুলো ১০ বছরে মোট তহবিলের প্রায় ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার পাবে। বাকি ৩০ শতাংশ কেবল দুটি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হওয়ার পর ছাড়া হবে বলে মেটা জানিয়েছে।

শর্তগুলো হলো–

• মেটার মালিকানাধীন নয় এমন ইউটিউব ও টিকটক দৈনিক এক ঘণ্টার ব্যবহারসীমা, নাইট মোড এবং বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করা।

• ইউটিউব ও টিকটক প্রত্যেকে ওই ৩০ শতাংশ অংশের সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধ করবে। ওই অর্থের অর্ধেক ইউটিউবের এবং অন্য অর্ধেক টিকটকের পরিশোধের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকবে।

মেটা আরও বলছে, এই চুক্তি সংশ্লিষ্ট আইনি ব্যয় হিসেবে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে তারা আনুমানিক ১০ বিলিয়ন ডলার (৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন পাউন্ড) ব্যয় হিসেবে হিসাবভুক্ত করবে বলে আশা করছে।

মেটার এই সমঝোতার মাধ্যমে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে শুরু হওয়া একটি বিচারিক কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘটল। বিচারটি মাত্র এক সপ্তাহের কিছু বেশি আগে শুরু হয়েছিল এবং এটি ছয় সপ্তাহ ধরে চলার কথা ছিল।

মেটার এই সমঝোতার মাধ্যমে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে শুরু হওয়া একটি বিচারিক কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘটল। বিচারটি মাত্র এক সপ্তাহের কিছু বেশি আগে শুরু হয়েছিল এবং এটি ছয় সপ্তাহ ধরে চলার কথা ছিল।

এই বিচার কার্যক্রমের সূত্রপাত হয় ২০২৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্যের দায়ের করা এক মামলার মাধ্যমে।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, শিশুদের গোপনীয়তা-সংক্রান্ত ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের বিভিন্ন আইন বহুবার লঙ্ঘন করেছে মেটা।

এর মধ্যে রয়েছে ফেডারেল চিলড্রেনস অনলাইন প্রাইভেসি প্রোটেকশন অ্যাক্ট লঙ্ঘনের অভিযোগ। এই আইনটি ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রণীত।

অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, মেটা ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামকে এমনভাবে তৈরি করেছে যাতে তা শিশু ও কিশোরদের জন্য আসক্তিকর হয়ে ওঠে। অ্যাপগুলোর বিভিন্ন সুবিধা, যেমন ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হওয়া এবং ইনস্টাগ্রাম স্টোরিজ, ব্যবহারকারীদের যত দীর্ঘ সময় সম্ভব প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

তাদের দাবি, তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার কমিয়ে আনা মেটা কঠিন করে তুলেছে। এর মধ্যে রয়েছে ঘন ঘন নোটিফিকেশন পাঠানোর মতো সুবিধা, যার উদ্দেশ্য তরুণদের আবার অ্যাপগুলোতে ফিরিয়ে আনা।

অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে মেটা ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করেছে।

এছাড়া, মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, কোম্পানির প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার সময় শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য অনুপযুক্তভাবে সংগ্রহ ও ব্যবহার করা হয়েছে।

মেটা ধারাবাহিকভাবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, যা এই মামলায় অংশ নেওয়া অঙ্গরাজ্যগুলোর অন্যতম, জানিয়েছে যে মেটার সঙ্গে সমঝোতা চুক্তির আওতায় নিম্নলিখিত ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:

• ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য প্রতিদিন দুই ঘণ্টার একটি ডিফল্ট ব্যবহারসীমা থাকবে, যা শুধু অভিভাবক তুলে দিতে পারবেন।

• ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ডিফল্টভাবে ব্যবহার বন্ধ থাকবে, যা শুধু অভিভাবক প্রত্যাহার করতে পারবেন।

• ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এবং স্কুল চলাকালীন সময়ে নোটিফিকেশন ডিফল্টভাবে বন্ধ থাকবে।

• সম্ভাব্য ক্ষতিকর কনটেন্ট সম্পর্কে কিশোরদের অভিযোগ জানানোর জন্য আরও উন্নত ব্যবস্থা থাকবে এবং মেটাকে এসব অভিযোগের ৯০ শতাংশের জবাব ছয় ঘণ্টার মধ্যে দিতে হবে।

• ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের কাছে লাইক বা প্রতিক্রিয়ার সংখ্যা প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হবে।

• ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য ইমেজ ফিল্টার (চেহারা পাল্টে ফেলা সংক্রান্ত) নিষিদ্ধ করা হবে।

• ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীরা ব্যক্তিকরণবিহীন (নন-পার্সোনালাইজড) ফিড ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

• অভিভাবকদের তদারকি-সংক্রান্ত টুল আরও উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে, ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় বলেছে যে মেটা নিম্নলিখিত বিষয়গুলোতে সম্মত হয়েছে:

• ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করার জন্য শক্তিশালী বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালু করা, পাশাপাশি ১৩ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের শনাক্ত ও অপসারণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

• তথ্য ও অন্যান্য সম্পদে বিস্তৃত প্রবেশাধিকারসম্পন্ন একটি স্বাধীন নিরীক্ষক নিয়োগ করা।

• নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য নিয়ে "আরও কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা প্রতারণামূলক বক্তব্য" দেওয়া থেকে বিরত রাখতে আদালতের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা।

মেটার অবস্থান হলো, বেশিরভাগ পরিবর্তন ১০ বছর ধরে কার্যকর থাকবে, কিন্তু শিশুদের জন্য দৈনিক সময়সীমার মতো কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন মাত্র পাঁচ বছর স্থায়ী হবে, যদি না এই সামাজিক মাধ্যম 'শিল্পের অন্যান্যরা' একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে সম্মত হয়।

তবে পরিবর্তনগুলো কখন বাস্তবায়িত হবে এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া সাইট টিকটক ও ইউটিউব কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে তা আমরা এখনো জানি না।

মেটার বিরুদ্ধে মামলা করা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলের প্রধান আইন কর্মকর্তারা সমঝোতা চুক্তি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ওয়াশিংটন ডিসির অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রায়ান শয়াল্ব এটিকে "তরুণদের জন্য জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক বিজয়" বলে আখ্যায়িত করেছেন।

তিনি বলেন, "মেটা মুনাফার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুদের ব্যবহার করেছে এবং পরে সে বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তারা দাবি করেছে যে তাদের পণ্য নিরাপদ, অথচ তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ গবেষণায় নিশ্চিত হয়েছে যে এসব প্ল্যাটফর্ম আসক্তি সৃষ্টি করে এবং ক্ষতিকর।"

"মেটাকে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো চালু করতে বাধ্য করা হয়েছে, সেগুলো ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক ব্যবহারে তরুণদের অভিজ্ঞতাকে মৌলিকভাবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তন করে দেবে," বলেন তিনি।

মেটাই "প্রথম প্ল্যাটফর্ম যা আলোচনায় এসেছে" এবং সংস্কারমূলক পদক্ষেপে সম্মত হয়েছে বলেও জানান এই অ্যাটর্নি জেনারেল।

এদিকে, মেটা তাদের বিবৃতিতে এই সমঝোতাকে একটি 'গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ' বলে উল্লেখ করেছে এবং বলেছে, তারা একটি নতুন 'শিল্পখাতের মানদণ্ড' স্থাপন করতে চায়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "আমাদের প্ল্যাটফর্মে কিশোরদের জন্য একটি নিরাপদ ও ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা মেটার জন্য একেবারেই অপরিহার্য। আমরা চাই অভিভাবক ও কিশোরদের জন্য বিষয়টি সঠিকভাবে নিশ্চিত করতে।"

প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি টিকটক ও ইউটিউবের কথাও উল্লেখ করেছে এবং বলেছে, ওই প্ল্যাটফর্মগুলোরও একই ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর করা উচিত।

মেটা বলেছে, "আমরা জানি, যখন একটি অ্যাপে কিশোরদের ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, তখন তারা সহজেই অন্য একটি অ্যাপে চলে যায়।"

মেটা আরও বলেছে, এই চুক্তি "অভিভাবকদের ক্ষমতায়ন এবং কিশোরদের সহায়তায় আমাদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়েছে।"

প্রসঙ্গত, এই মাসের শুরুতে মেটাকে ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার বা ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার জরিমানা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর একজন বিচারক।

এই সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিকে 'জনদুর্ভোগের' বিষয় হিসেবে অভিহিত করে বায়ুদূষণের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন বিচারক ব্রায়ান বিয়েডশেইড। এছাড়া, জরিমানার এই অর্থ, ভবিষ্যৎ ক্ষতি কমানোর উদ্দেশ্যে তৈরি একটি তহবিলে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি।

এই মামলায় প্রতিষ্ঠানটিকে আগেও ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যার অতিরিক্ত হিসেবে এই রায় আসে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৪২ মিলিয়ন ডলারে।

নিউ মেক্সিকোর রায় ছাড়াও, চলতি বছরের শুরুর দিকে লস অ্যাঞ্জেলেসে একই ধরনের একটি মামলায় হেরেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

শিশু সুরক্ষা সংক্রান্ত অভিযোগে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার মামলার মুখোমুখি হচ্ছে মেটা।