আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
শিশুদের গোপনীয়তার মামলায় মেটা হেরে গেলে চিরতরে বদলে যেতে পারে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক
- Author, ক্যালি হেইস
- Role, টেকনোলজি রিপোর্টার
- Published
- পড়ার সময়: ৪ মিনিট
নিজেদের প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে তরুণ ব্যবহারকারীদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে মেটা ধারাবাহিকভাবে আদালতে পরাজয়ের মুখে পড়েছে।
তবে মঙ্গলবার শুরু হতে যাওয়া একটি জুরি ট্রায়াল সম্ভবত মেটার কার্যক্রমের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
এই বিচার ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টি অঙ্গরাজ্যের করা একটি মামলার ভিত্তিতে শুরু হচ্ছে।
এসব অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কও রয়েছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, শিশুদের ক্ষেত্রে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের বিভিন্ন গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে।
অঙ্গরাজ্যগুলো শুধু মেটার কাছে এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করছে না, তারা ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে পরিবর্তন আনারও দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে "লাইক" সংখ্যা দেখানো বন্ধ করা এবং অবিরাম স্ক্রলিং ফিচার বন্ধ করা।
এত বড় পরিসরের মামলায় শেষ পর্যন্ত মেটা হেরে গেলে তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনতে বাধ্য হতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।
মেটা-এর বিরুদ্ধে মামলা করা অঙ্গরাজ্যগুলো তরুণদের জন্য ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের কার্যক্রমে আরও অনেক পরিবর্তন চায়।
তারা মেটার কাছে দাবি করেছে-
- কিশোর ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে অভিভাবকের পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করা
- ব্যবহারকারীদের মস্তিস্ককে প্রভাবিত করে এমন অ্যালগরিদম পরিবর্তন আনা
- ছবিতে ব্যক্তির চেহারা বদলে দেয় এমন অনেক ইমেজ ফিল্টার সরিয়ে দেওয়া
- ভিডিও কনটেন্টের স্বয়ংক্রিয় প্লে বন্ধ করা
- একাধিক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ নিষিদ্ধ করা
- ইনস্টাগ্রাম স্টোরির মতো নির্দিষ্ট সময় পর অদৃশ্য হয়ে যায় এমন ক্ষণস্থায়ী পোস্টের ব্যবস্থা বন্ধ করা।
মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোতে ব্যবহারকারীদের বর্তমান অভিজ্ঞতার কেন্দ্রীয় অংশই হলো এসব ফিচার।
অঙ্গরাজ্যগুলোর দাবি, এসব ফিচার এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে ব্যবহারকারীরা, বিশেষ করে শিশু-কিশোররা যত বেশি সম্ভব এবং বেশি সময় ধরে প্ল্যাটফর্মগুলোতে থাকে। তাদের দাবি, তরুণদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সময় কমানোও কঠিন করে তুলেছে মেটা। যেমন, তরুণদের বারবার অ্যাপগুলোতে ফিরিয়ে আনতে ঘন ঘন নোটিফিকেশন পাঠানো হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, শিশু ব্যবহারকারীদের লক্ষ্যবস্তু করে মেটা তাদের শোষণ করার পথ বেছে নিয়েছে", যাতে তারা প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আসক্ত হয়ে পড়ে এবং কোম্পানি তার ব্যবহারকারীভিত্তি ও ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে।
বর্তমানে শেয়ারবাজারে মেটার মূল্য প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ডলার। মেটা অবশ্য শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
কোম্পানির একজন মুখপাত্র একটি বিবৃতিতে বলেন, "আমরা এসব অভিযোগের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে দ্বিমত পোষণ করি এবং আমরা আত্মবিশ্বাসী যে প্রমাণেই আমাদের দীর্ঘদিনের অবস্থান স্পষ্ট হবে—তরুণদের সহায়তা ও সুরক্ষায় আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ"।
অঙ্গরাজ্যগুলো তাদের অভিযোগ ক্যালিফোর্নিয়ার প্রধান ফেডারেল বিচারক ইভন গঞ্জালেজ রজার্সের কাছে উপস্থাপন করছে। ইলন মাস্ক বনাম স্যাম অল্টম্যান মামলার বিচারকও ছিলেন তিনি।
প্রায় ২০ বছরের বিচারিক দায়িত্ব পালনকালে তীক্ষ্ণ ও নিরপেক্ষ বিচারিক অবস্থানের জন্য সুনাম অর্জন করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন 'জনদুর্ভোগ'
সম্প্রতি মেটা-র বিরুদ্ধে দেওয়া এক রায়ে , নিউ মেক্সিকোর একজন বিচারক কোম্পানিটিকে মোট ৯৪২ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছেন এবং অন্যান্য রাজ্যগুলো এখন যে ধরনের পরিবর্তনের দাবি করছে, অনুরূপ পরিবর্তন আনার নির্দেশ দিয়েছেন।
বিচারক ব্রায়ান বিডশেইড যে পরিবর্তনগুলো আনার নির্দেশ দিয়েছেন, তার মধ্যে রয়েছে—১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে 'লাইক' সংখ্যা দেখানো বন্ধ করা, কিশোর-কিশোরীদের প্ল্যাটফর্ম দুটির মাধ্যমে নগ্ন ছবি পাঠানো বা গ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং অ্যাপগুলোর পুশ নোটিফিকেশন দিনের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।
বিচারক মেটাকে "জনদুর্ভোগ" হিসেবেও ঘোষণা করেন। তিনি মেটার সঙ্গে এমন একটি কারখানার তুলনা করেন, যা মানুষের শ্বাস নেওয়া বাতাস দূষিত করে এবং এর ফলে "ক্ষতিকর প্রভাব" তৈরি হয়, যা পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব ফেলে। মেটা অবশ্য জানিয়েছে, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে।
যদিও বিচারক বিডশেইডের আদেশ কেবল নিউ মেক্সিকোতে পরিবর্তন আনার কথা বলেছে, তবে মেটা-এর বিরুদ্ধে পৃথক মামলায় যদি ৩০টি অঙ্গরাজ্য জয়ী হয়, তাহলে কোম্পানিটিকে প্রায় নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্ল্যাটফর্মে পরিবর্তন আনতে হবে।
মামলায় যুক্ত অঙ্গরাজ্যগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বসবাস করে।
মেটা যদি সত্যিই এসব পরিবর্তন কার্যকর করে, তাহলে এর প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
সাম্প্রতিক এক ফেডারেল আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি প্রভাবক।
উদাহরণস্বরূপ, "লাইক" সংখ্যা মেটার একেবারে শুরুর বছরগুলো থেকেই এর একটি অংশ ছিল, যখন এর নাম ছিল ফেসবুক এবং সেটিই ছিল এর একমাত্র প্ল্যাটফর্ম।
তবে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে লাইককে নেতিবাচক অনুভূতি তৈরির একটি মাধ্যম হিসেবে ক্রমেই বেশি দেখা হচ্ছে।
এ বছরের শুরুতে মেটার বিরুদ্ধে মামলায় জয়ী হওয়া ক্যালি নামের এক তরুণী আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় জানান, তিনি ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামে ডজন ডজন অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন।
তিনি নিজের পোস্টে লাইক সংখ্যা বাড়াতে এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতেন। তার উদ্দেশ্য ছিল অন্য ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে আরও বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়া এবং এর মাধ্যমে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো।
তখন ক্যালির বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। সে জানায়, তার মনে আছে সে বিষণ্ণতায় ভুগত, যা পরে ১০ বছর বয়সে তার রোগ হিসেবে শনাক্ত হয়।
বিগত কয়েক বছরের গবেষণায় দেখা গেছে যে, লাইক সংখ্যার মতো সম্পৃক্ততার সূচকগুলো কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনুভূতি এবং বিষণ্ণতা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
মেটার বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যগুলোর করা মামলায়, যেখানে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা ২০ লাখেরও বেশি নথি হস্তান্তর করেছে, আইনজীবীরা মেটার নিজস্ব গবেষণার কথাও তুলে ধরেছেন।
ওই গবেষণায় দেখা গেছে, লাইক সংখ্যা মানুষের মধ্যে "সামাজিক তুলনা" বাড়ায়। অর্থাৎ, অন্য কারও ছবি বা পোস্টের সঙ্গে নিজের অবস্থান বা মূল্যায়ন তুলনা করার মানসিক প্রবণতা তৈরি হয়।
মেটার অভ্যন্তরীণ গবেষণা অনুযায়ী, ইনস্টাগ্রাম প্রভাবিত এই সামাজিক তুলনা "দীর্ঘ একাকীত্ব, নিজের শরীর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা এবং নেতিবাচক মেজাজ বা মানসিক অবস্থা"-র সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
বিচারক বিডশেইড তার আদেশে বলেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো যেভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে, তা নিউ মেক্সিকোসহ অন্যান্য জায়গায় বেড়ে চলা "তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের একটি অংশ হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো প্রতিষ্ঠানকে 'জনদুর্ভোগ' হিসেবে ঘোষণা করার ক্ষেত্রে এটিই ছিল প্রথম একটি রায়।
এখন আরও ৩০টি অঙ্গরাজ্যের আইনজীবীরা বিচারক গনজালেজ রজার্সকে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য চাপ দেবেন।