'আম্বানি কি ভারতের প্রকৃত বস?'- কেন এই প্রশ্ন ইলন মাস্কের

ছবির উৎস, Getty / Reuters
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি, মার্কিন শিল্পপতি ইলন মাস্ক 'এক্স'-এ একটি পোস্টে অভিযোগ করেছেন যে, কয়েকজন শিল্পপতি ভারতে তার কোম্পানি স্টারলিংকের স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবার প্রবেশে 'বাধা' সৃষ্টি করছেন। এমনকি তিনি মুকেশ আম্বানির নামও এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন।
ভারত সরকার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মি. মাস্কের এই অভিযোগ খণ্ডন করেছে।
বৃহস্পতিবার, আটই অক্টোবর ভারতের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, ভারতের স্যাটেলাইট যোগাযোগ সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাটি নিরপেক্ষ এবং সেখানে কোনো বৈষম্য করা হয় না।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, স্টারলিংক-সহ তিনটি সংস্থা বর্তমানে নিরাপত্তা সংক্রান্ত যাচাইয়ের জন্য একই ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক পর্যায়ে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার, আটই অক্টোবর 'এক্স'-এ দেওয়া এক পোস্টে মি. মাস্ক উল্লেখ করেন, "স্টারলিংক ১৬৫টিরও বেশি দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত। কোম্পানিটি গত পাঁচ বছর ধরে ভারত সরকারের প্রতিটি শর্ত পূরণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে; তা সত্ত্বেও, ভারতে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরুর জন্য কেন এটি অনুমোদন পাচ্ছে না? মুকেশ আম্বানি কি ভারতের আসল বস?"
এর আগে, ভারতে স্টারলিংককে বাধা দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে মি. মাস্ক মন্তব্য করেছিলেন যে, কিছু 'অলিগার্ক'—অর্থাৎ অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যবসায়ী—নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য রক্ষার স্বার্থেই স্টারলিংককে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করতে বাধা দিচ্ছেন।
একটি পোস্টের জবাবে তিনি লিখেছেন, "দুর্ভাগ্যবশত, কিছু শিল্পপতি ভারতীয় জনগণের ওপর নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার স্বার্থে আমাদের পিছিয়ে রাখছেন। তারা কারা, তা আপনারা আন্দাজ করতেই পারছেন... এটি ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ।"
ইলন মাস্কের শেয়ার করা পোস্টে বলা হয়েছে, "ভারতের অনেক গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকায় উচ্চ-গতির ইন্টারনেট সুবিধা এখনো সীমিত। স্টারলিংকের দাবি, তাদের স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এমন সব অঞ্চলে উচ্চ-গতির ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে সক্ষম যেখানে ফাইবার বা মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা কঠিন। এছাড়া কোম্পানিটি ভারতে ২০টি গেটওয়ে সাইটও স্থাপন করেছে।"
স্টারলিংক শিক্ষা, টেলিমেডিসিন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং দুর্যোগকালীন ত্রাণকাজের ক্ষেত্রে সংযোগ সুবিধা প্রদানে সহায়তা করতে পারে। কোম্পানিটি জানিয়েছে যে তারা ভারতে তাদের কাজ চালু করার জন্য প্রস্তুত, তবে এটি অনুমোদন লাভ এবং স্পেকট্রাম বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল।

ছবির উৎস, Smith Collection/Gado/Getty Images
ভারত সরকারের কী প্রতিক্রিয়া?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ভারত সরকার জানিয়েছে যে স্টারলিংকের প্রতি কোনো বৈষম্য করা হচ্ছে না।
একটি বিজ্ঞপ্তিতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দাবি, "স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবা সংক্রান্ত ভারতের নিয়মকানুন সবার জন্য ন্যায্য ও অভিন্ন। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে যেখানে এই নিয়মকানুনের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং অভিযোগ করা হয়েছে যে এগুলো বৈষম্যমূলকভাবে কার্যকর করা হচ্ছে।"
সরকার জানিয়েছে যে, স্যাটেলাইট যোগাযোগসহ সকল টেলিযোগাযোগ সেবার জন্য ন্যায্য ও বৈষম্যহীন নিয়মাবলি প্রণয়ন করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের আরও দাবি, "স্যাটেলাইট যোগাযোগ সেবার জন্য তিনটি কোম্পানিকে টেলিযোগাযোগ লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। লাইসেন্সের শর্তানুযায়ী নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিধিবিধান মেনে চলা এই কোম্পানিগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক।"
ভারত সরকার জানিয়েছে যে, এর উদ্দেশ্য এটা নিশ্চিত করা যেন এই কোম্পানিগুলোর প্রদত্ত পরিষেবা ব্যবহারকারী ও তাদের তথ্যের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সকল বিধিবিধান মেনে চলে।
সরকারের ভাষ্যমতে, "বর্তমানে তিনটি কোম্পানিরই নিরাপত্তা ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। কোনো কোম্পানি এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেই তারা স্পেকট্রাম বরাদ্দের পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হতে পারবে। বর্তমানে কোম্পানি তিনটিই প্রায় একই ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক পর্যায়ে রয়েছে; তাই নিয়মকানুন বা সেগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি বৈষম্যমূলক—এমন দাবি ভিত্তিহীন ও ভুল।"
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Anindito Mukherjee/Bloomberg via Getty Images
রাহুল গান্ধীর মন্তব্যে বিতর্ক
মুকেশ আম্বানিকে নিয়ে ইলন মাস্কের করা মন্তব্যটি পুনরায় শেয়ার করে রাহুল গান্ধী 'এক্স'-এ লেখেন, "ভারতে আপনাকে স্বাগত, ইলন। এখানকার আরেকজনের কথা জানতে পারলে তখন বুঝবেন আসল ব্যাপার কী।"
এর জবাবে মি. মাস্ক লেখেন, "ধন্যবাদ, রাহুল। বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগের।"
রাহুল গান্ধীর এই মন্তব্যকে ইলন মাস্কের প্রতি সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে; অথচ অতীতে 'স্টারলিংক' নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থান মি. মাস্কের অনুকূলে ছিল না।
গত বছর কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ বলেছিলেন, "মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে এয়ারটেল ও জিও—উভয়ই স্টারলিংকের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ঘোষণা দিয়েছে। মনে হচ্ছে, ভারতে স্টারলিংকের প্রবেশ নিয়ে তাদের যাবতীয় আপত্তি দূর হয়ে গেছে, অথচ এতদিন তারা এর বিরোধিতা করে আসছিল।"
মুকেশ আম্বানিকে লক্ষ্য করে ইলন মাস্কের করা মন্তব্যের বিষয়ে রাহুল গান্ধীর বক্তব্য জয়রাম রমেশের ধারণার সঙ্গে না মেলায় কংগ্রেসের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ছবির উৎস, Getty Images
টেলিকম সংস্থা এয়ারটেলের কী বক্তব্য?
টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি ভারতী এয়ারটেলও ইলন মাস্কের এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছিল যে ভারতে তার স্যাটেলাইট যোগাযোগ কোম্পানি 'স্টারলিংক'-এর কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা দেওয়া হচ্ছে।
ভারতী এয়ারটেলের চেয়ারম্যান সুনীল ভারতী মিত্তাল জানিয়েছেন যে, ভারতে পরিষেবা চালুর অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে তাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট যোগাযোগ উদ্যোগ 'ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব'-ও।

ছবির উৎস, Matteo Della Torre/NurPhoto via Getty Images
স্টারলিংক কী?
স্টারলিংক ইলন মাস্কের কোম্পানি 'স্পেসএক্স'-এর একটি স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা। এটি স্থলভিত্তিক মোবাইল টাওয়ার বা ফাইবার-অপটিক কেবলের ওপর নির্ভর না করে মহাকাশে অবস্থিত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা প্রদান করে।
এই প্রযুক্তির প্রধান সুবিধা হলো, এটি এমন সব এলাকায় ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দিতে সক্ষম যেখানে ফাইবার-অপটিক কেবল বসানো বা মোবাইল টাওয়ার স্থাপন করা কঠিন।
ভারত সরকারও জানিয়েছে যে, গ্রামীণ, দুর্গম, পার্বত্য, সীমান্তবর্তী এবং সমুদ্র-সংলগ্ন এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা সহায়তা করতে পারে।

ছবির উৎস, Kent NISHIMURA / AFP via Getty Images
স্টারলিংক কবে থেকে ভারতে আটকে?
সংবাদসংস্থা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, স্টারলিংক ২০২২ সালে ভারতে পরিষেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল। কোম্পানিটি ২০২৫ সালের জুন মাসে টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে জিএমপিসিএস বা স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবা বিষয়ক লাইসেন্স লাভ করে।
পরবর্তীতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য স্পেকট্রাম বরাদ্দ করা হয়। তবে বাণিজ্যিক পরিষেবা শুরু করার আগে নিরাপত্তা ছাড়পত্রসহ আরও কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়া বাকি রয়েছে।

ছবির উৎস, Avishek Das/SOPA Images/LightRocket via Getty Images
এই ঘটনায় জিও ও এয়ারটেল-এর ভূমিকা কী?
সংবাদসংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, একটি বিষয় যথেষ্ট কৌতুহল তৈরি করেছে। ভারতে স্টারলিংকের সম্ভাব্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে অন্যতম রিলায়েন্স জিও এবং ভারতী এয়ারটেলও কোম্পানিটির সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে।
জিও এবং এয়ারটেল ২০২৫ সালের মার্চ মাসে স্টারলিংকের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে।
এই চুক্তিগুলোর আওতায়, উভয় কোম্পানিই তাদের নিজস্ব খুচরা বিক্রয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে স্টারলিংকের সরঞ্জাম সহজলভ্য করার লক্ষ্যে কাজ করবে।
তবে ব্রডব্যান্ড পরিষেবা বাজারে এই কোম্পানিগুলো স্টারলিংকের প্রতিদ্বন্দ্বীও বটে।
বর্তমানে ভারতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের জন্য তিনটি কোম্পানি লাইসেন্স পেয়েছে: স্টারলিংক, রিলায়েন্স জিও এবং ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব (যাতে ভারতী গ্রুপের সমর্থন রয়েছে)।

ছবির উৎস, Sondeep Shankar/Getty Images
স্পেকট্রাম নিয়ে জিও এবং মাস্কের মধ্যে কী বিরোধ ছিল?
স্টারলিংক যখন ভারতীয় বাজারে প্রবেশের উদ্যোগ নেয়, তখন স্পেকট্রাম নিয়ে একটি বড় ধরনের বিরোধ দেখা দিয়েছিল।
মি. মাস্ক চেয়েছিলেন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্যাটেলাইট কোম্পানিগুলোকে স্পেকট্রাম বরাদ্দ করা হোক; অন্যদিকে রিলায়েন্স জিও-সহ ভারতের কয়েকটি কোম্পানি নিলামের পক্ষে ছিল।
শেষ পর্যন্ত ভারত সরকার নিলামের পরিবর্তে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই স্যাটেলাইট স্পেকট্রাম বরাদ্দ করার সিদ্ধান্ত নেয়।









