দিল্লিতে নারী বিক্ষোভকারীদের 'হেনস্থা', 'দ্বিতীয় যন্তর মন্তরের' ডাক ককরোচ জনতা পার্টির

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে টানা তিন দিন ধরে বিক্ষোভ চলছে দিল্লি ও মুম্বাইতে। সোমবার পাঁচই অক্টোবর দুপুর পর্যন্ত বিক্ষোভের তেজ একটু স্তিমিত থাকলেও ১০ই অক্টোবর মানে শনিবার ফের বিক্ষোভ ও মিছিলের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি ও বামপন্থী ছাত্র সংড়ঠনগুলোর একাংশ।
শুক্রবার দোসরা অক্টোবর, অর্থাৎ 'গান্ধী জয়ন্তী'র দিন শুরু হয়। পরের দুই দিনেও অব্যাহত ছিল এ কর্মসূচি, সাথে পুলিশের আচরণও ছিল মারমুখী।
অনেক প্রতিবাদীকারী এ বিক্ষোভকে যন্তর মন্তর ২.০ বলে অভিহিত করছেন।
যদিও দিল্লিতে এ বার পুলিশকে আগের চাইতে বেশি তৎপর দেখা গেছে। বিক্ষোভকারীদের কাউকেই যন্তর-মন্তরে পৌঁছতেই দেওয়া হয়নি।
রোববার দিল্লিতে সাধারণ মানুষ, সমাজকর্মী ও ছাত্র সংগঠনগুলি ইন্ডিয়া গেট থেকে যন্তর-মন্তর পর্যন্ত 'সিটিজেন্স মার্চ' বের করে। এ কর্মসূচিতে বিপুল সংখ্যক মানুষ যোগ দিয়েছিলেন।
শনিবার দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে নারী সাংবাদিকদের হেনস্থার অভিযোগ ওঠে। তা নিয়ে রোববার আন্দোলন আরও তীব্র হয়।
গত কয়েকদিন ধরেই দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভূক্ত কয়েকটি কলেজ ক্যাম্পাসে নারী সুরক্ষার দাবিতে আন্দোলন করছিলেন ছাত্রছাত্রীরা।
এরই মধ্যে যন্তর মন্তরে নারীদের সঙ্গে দিল্লি পুলিশের ব্যবহারে অনেক বিক্ষোভকারীই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং এই দুই আলাদা প্রতিবাদের মিশে যাওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক মাধ্যমে।
রোববার ইন্ডিয়া গেট থেকে যন্তর মন্তর অভিমুখে মিছিল চলাকালীন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন আইসা-র সভাপতি নেহা বোরা সহ একাধিক নেতাকে আটক করা হয়।

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
নেহা বোরা অভিযোগ করেন, যে গাড়িতে পুলিশ তাকে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে একজনও নারী পুলিশকর্মী উপস্থিত ছিলেন না।
পরে তাকে যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে নারেলা নামক একটি জায়গায় নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আইসা অভিযোগ করেছে, নেহা বোরার সঙ্গে তার ফোনটিও তখন ছিল না।
ছাত্র সংগঠনগুলির এই বিক্ষোভ চলাকালে আরও কয়েকজন নেতা দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন।
এ প্রতিবাদে আম আদমি পার্টির কর্মীরাও বড় সংখ্যায় ইন্ডিয়া গেট এলাকায় উপস্থিত হন।
দলটির দিল্লি প্রদেশ সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজকেও বিক্ষোভের সময়ে দিল্লি পুলিশ আটক করে।
সৌরভ ভরদ্বাজ এক্স-এ একটি ভিডিও পোস্ট করে লেখেন, "এগুলো আমার জুতো, যা হাওয়ায় ঝুলে আছে। আজ ইন্ডিয়া গেটে দিল্লি পুলিশ আমাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, যাতে ক্যামেরায় আমার মুখ ধরা না পড়ে।"
ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশকর্মীরা তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
সমাজকর্মী যোগেন্দ্র ইয়াদভ বলেন, "আজও নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর-মন্তরের দিকে যাওয়ার সময়ে পুলিশ আমাদের জোর করে আটক করেছে।
এটি শুধু এক দিনের প্রতীকী প্রতিবাদ নয়, বরং জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ না করা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।"
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
রোববার সন্ধ্যায় ইন্ডিয়ান ইউথ কংগ্রেস জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মিছিল করে বিক্ষোভ দেখায়। ভোটার তালিকায় কথিত অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ দাবি করা হয়।
ইউথ কংগ্রেস এক্স-এ লিখেছে, "যন্তর-মন্তরকে আবার মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা এবং জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেফতারের দাবিতে আইওয়াইসি কর্মীরা যন্তর-মন্তর রোডে অবস্থান বিক্ষোভে বসেছে।"
এদিকে, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা এবং রাজ ঠাকরের মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা (এমএনএস) রোববার মুম্বাইয়ে 'গর্জনা মোর্চা' আয়োজন করে।
ওই কর্মসূচিতে উদ্ধব ঠাকরে ও রাজ ঠাকরে দুজনেই অংশ নেন।
রোববার সন্ধ্যায় মুম্বাইতে আন্দোলন শুরু করা ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দীপকে আগামী ১০ই অক্টোবর নতুন করে দিল্লিতে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন।
একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি বলেন, "আমার ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছি, আপনিও গুছিয়ে নিন, দিল্লি রওনা হতে হবে।"
শনিবার কী ঘটেছিল?
শনিবার বহু সমাজকর্মী দিল্লির যন্তর-মন্তরে পৌঁছনোর চেষ্টা করলে দিল্লি পুলিশ কেরল হাউসের কাছে তাদের আটকে দেয় এবং আটক করে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত বিবিসি নিউজ হিন্দির সংবাদদাতা দিলনওয়াজ পাশা জানান, বিক্ষোভকারীরা যন্তর-মন্তরের ভিতরে প্রবেশ করতে পারেননি। বিপুল পুলিশবাহিনী তাদের কেরল হাউসের কাছে আটকে দেয়।

ছবির উৎস, Arvind Yadav/Hindustan Times via Getty Images
দোসরা অক্টোবরের বিক্ষোভের পর বামপন্থী ছাত্র সংগঠন আইসা শনিবারও যন্তর-মন্তরে যাওয়ার ডাক দিয়েছিল।
এই বিক্ষোভে আইসা কর্মীদের পাশাপাশি সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল ও প্রশান্ত ভূষণও উপস্থিত ছিলেন। তাদেরও অন্যদের সঙ্গে আটক করা হয়।
নেহা বোরাকেও আটক করা হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, এক নারী পুলিশকর্মী তাকে কনুই এবং নখ দিয়ে আঘাত করেন।
শনিবারের বিক্ষোভের সময়ে দুই নারী সাংবাদিক এবং এক নারী বিক্ষোভকারীকে এক পুলিশ কর্মকর্তা ও আরও কয়েকজন পুলিশকর্মী যৌন হেনস্থা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এক নারী সাংবাদিকের অভিযোগ, আইসা সভাপতি নেহা বোরাকে আটক করার সময়ে এসিপি বিবেক ভগত তার বুকে হাত দেন এবং ধাক্কা দিয়ে সরে যান।
আরও এক প্রবীণ নারী সাংবাদিক ও এক বিক্ষোভকারী তরুণী দিল্লি পুলিশের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে যৌন হামলার অভিযোগ তোলেন।
এর পর শনিবার ও রোববার সাংবাদিকরা পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার বাইরে প্রতিবাদ জানান।
এই অভিযোগ দিল্লি পুলিশ নস্যাৎ না করলেও দিল্লি পুলিশ সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছে যে তারা নারীদের হেনস্থার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছে।

ছবির উৎস, ANI
শুক্রবার মুম্বাইতে সিজেপির বিক্ষোভ
ইংরেজি সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনের পর ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) দোসরা অক্টোবর মুম্বাইয়ে প্রতিবাদের ডাক দেয়।
মুম্বাইয়ে সিজেপির ডাকে শিবাজি পার্কে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হন। পুলিশ অনুমতি না দিলেও বিক্ষোভকারীরা সেখানে পৌঁছে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, "সরকার এতটাই অযোগ্য যে দুই মাসের মধ্যে দ্বিতীয় বার আমাদের বিক্ষোভ করতে হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "গান্ধী যদি এই দেশের আত্মা হন, তবে আম্বেদকর এই দেশের মেরুদণ্ড। ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর এবং নেহরুই আমাদের ভোটাধিকার দিয়েছেন।"
মুম্বাইয়ের কর্মসূচিতে অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি এবং সুরকার-গায়ক বিশাল দাদলানিও উপস্থিত ছিলেন। উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনাও এই আন্দোলনকে সমর্থন জানায়।
একই সময়ে আইসা ও কয়েকজন সমাজকর্মীও দিল্লির যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি চেয়েছিলেন।
দিল্লিতে পুলিশ যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি এবং দিল্লি মেট্রোও ১০টির বেশি স্টেশন বন্ধ করে দেয়।
তবু বিপুল সংখ্যক মানুষ যন্তর-মন্তরে পৌঁছনোর চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের আটক করে।
নেহা বোরা, প্রশান্ত ভূষণ, যোগেন্দ্র যাদব, সৌরভ ভরদ্বাজ এবং সঞ্জয় সিংকে আটক করা হয়। তবে কাউকেই যন্তর-মন্তরে পৌঁছতে দেওয়া হয়নি।
এদিকে নির্বাচন কমিশন শুক্রবার সকালে এক্স-এ পোস্ট করে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এ বাদ পড়া নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিশেষ অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়।

ছবির উৎস, Indranil MUKHERJEE / AFP via Getty Images
এই অভিযানের আওতায় ভোটার তালিকা যাচাই, বাদ পড়া ভোটারদের চিহ্নিত করা এবং ফর্ম সিক্স পূরণ করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের মতে, বুথ লেভেল অফিসাররা বাড়ি বাড়ি যাবেন, তরুণ ভোটারদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং বুথ পর্যায়ে বিশেষ শিবির আয়োজন করা হবে।
কেন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে?
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বাদে আরও যে দুজন নির্বাচন কমিশনার আছেন, তারা গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাদের জানানো হয়নি এবং তারা বারবার আপত্তি তুলেছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, নাম বাদ দেওয়া এবং তথাকথিত "অননুমোদিত ও বেআইনি" পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিরোধী দলগুলো এবং ককরোচ জনতা পার্টি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে।

ছবির উৎস, ANI









