'জেন-জি'-র আন্দোলন শেষ, তারা কত বড় ধাক্কা দিতে পারলো নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে?

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘোষণার পরে উচ্ছাস দিল্লির যন্তর মন্তরে
ছবির ক্যাপশান, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘোষণার পরে উচ্ছাস দিল্লির যন্তর মন্তরে
Published
পড়ার সময়: ৮ মিনিট

দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন শেষ করার ঘোষণা করল 'ককরোচ জনতা পার্টি' বা সিজেপি। এর আগে ক্রমশ বাড়তে থাকা আন্দোলনের চাপের মুখে শনিবার দুপুরে পদত্যাগ করেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন তার পদত্যাগ একদিকে যেমন 'জেন-জি'র বিজয়, তেমনই নরেন্দ্র মোদীর সরকারের কাছে তা এক বড় ধাক্কা।

মি. প্রধান পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরেও তখনও পর্যন্ত দুটি অমিমাংসিত দাবিতে অনড় ছিল সিজেপি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পূর্ব নির্ধারিত বৈঠকে বসেন সরকারের দুই শীর্ষ মন্ত্রী এবং সিজেপির দুই প্রতিনিধি।

দাবিগুলো সরকার মেনে নেওয়ার পরেই আন্দোলন শেষ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তারা।

সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা 'নিট' এর প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তার জেরে অন্তত ২০ জন পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার প্রতিবাদ দিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল এক মাসেরও বেশি আগে, তার অন্তিম পর্যায়ে, শনিবার দুপুর থেকে ঘটনাক্রম নাটকীয় মোড় নেয়।

শুক্রবার রাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশের যুব সম্প্রদায়ের উদ্দেশে যে বক্তব্য রাখেন, তখনও কেউ আন্দাজ করতে পারেননি কী ঘটতে চলেছে পরের দিন।

অন্যদিকে, সকাল থেকেই যন্তর মন্তরে সুরক্ষা ব্যবস্থা আঁটোসাঁটো করা হয়েছিল। উপস্থিত অনেকেই ভাবতে শুরু করেছিলেন সেখানে কী হতে চলেছে।

এর মাঝেই 'ব্রেকিং নিউজ' আসে যে পদত্যাগ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী।

মি. প্রধানের ইস্তফার পরই যন্তর মন্তরে আন্দোলনরতদের মধ্যে ব্যাপক উল্লাস দেখা দেয়।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ধর্না মঞ্চ থেকে ঘোষণা করেন, "প্রথমে কী বলেছিল ওরা, যে এই সরকারের আমলে পদত্যাগ হয় না। কিন্তু শেষপর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। আসলে দুনিয়া ঝুঁকতে বাধ্য হয়, (তার জন্য) ঝোঁকানোর মতো লোক দরকার।"

এর আগেও বেশ কয়েকটি ব্যাপক আন্দোলনের মুখে পড়তে হয়েছে নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে, তবে এবারই প্রথম আন্দোলনের চাপে কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হলো।

আন্দোলনকারীদের উল্লাসের ছবি
ছবির ক্যাপশান, 'আমরা জিতে গেছি' - পোস্টার হাতে আন্দোলনকারীদের উল্লাসের ছবি

'ককরোচ' মন্তব্য থেকে যে আন্দোলনের শুরু

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

যে সিজেপির নেতৃত্বে এই আন্দোলনের সূচনা এবং দেশজুড়ে তার ক্রমবিস্তার - সেই প্ল্যাটফর্মের শুরুটা হয়েছিল একটা 'অনলাইন স্যাটায়ারের' হাত ধরে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এক মামলায় উল্লেখ করেছিলেন, কিছু 'পরজীবী' সিস্টেমকে আক্রমণ করছে।

তিনি বলেছিলেন, "ককরোচের মতো কিছু তরুণ রয়েছে, যারা কোনো চাকরি পায় না এবং পেশাতেও তাদের কোনো জায়গা নেই। তাদের মধ্যে কেউ গণমাধ্যমকর্মী হয়, কেউ সোশ্যাল মিডিয়ার, কেউ আরটিআই কর্মী, কেউ অন্য কর্মী, এবং তারা সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে।"

তিনি এই বিষয়ে বিশদে ব্যাখ্যা দেওয়ার আগেই কিছুটা শ্লেষাত্মক ব্যঙ্গের আকারে জন্ম নেয় 'ককরোচ জনতা পার্টি'।

ব্যঙ্গ করেই এর শুরুটা করেছিলেন অভিজিৎ দীপকে।

নিজেকে তিনি প্রথম তুলে ধরেন, 'আমিও আরশোলা' বলে। সেই পোস্ট ব্যাপক ভাইরাল হয়ে যায় এবং কয়েকদিনের মধ্যেই গড়ে ওঠে 'ককরোচ জনতা পার্টি' নামে এক ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন দল।

দ্রুত তাদের ফলোয়ারের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় বিজেপির অনলাইন ফলোয়ারের সংখ্যা।

তখনো কেউ ভাবতে পারেনি এর ভবিষ্যৎ কী বা রূপরেখাই বা কী হবে। অভিজিৎ দীপকে নিজেও সংবাদ মাধ্যমের কাছে বহুবার তা স্বীকার করেছেন।

মাস খানেক আগে দিল্লিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনের সময়ে সামনে আসেন এর কয়েকজন সদস্য।

তারপর শিক্ষা ব্যবস্থা, মূলত সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা, যাতে ২২ লক্ষেরও বেশি পড়ুয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং যে পড়ুয়ারা আত্মহত্যা করেছেন - সমস্ত ঘটনার জন্য সরকারের জবাবদিহিতা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ, শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং সর্বোপরি মি প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সরব হয় সিজেপি।

জুন মাসের গোড়ার দিকে দিল্লির যন্তর মন্তরে ধর্না শুরু করেন অভিজিৎ দীপকে।

জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে সেখানে একটু করে সেখানে জমায়েত বাড়তে থাকে যা ক্রমে ব্যাপক আকারে বেড়ে যায়।

জুন মাসের শেষের দিকে ওই মঞ্চে অনির্দিষ্ট কালের জন্য অনশন শুরু করেন শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ কর্মী সোনাম ওয়াংচুক।

যন্তর মন্তরে বিভিন্ন সময়ে আপ, কংগ্রেস-সহ বিরোধী নেতাদের দেখা যায়।

মি. ওয়াংচুকের অনশনের ২০ দিনের মাথায় জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। এরপর আন্দোলনের আঁচ আরো বাড়তে থাকে।

ডাক দেওয়া হয় ২০শে জুলাই সংসদ অভিযানের।

সেদিনের জনসমাবেশে ব্যাপক লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোঁড়া, নারীদের প্রতি অসম্মানসহ একাধিক অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে।

সরকারকে কড়া সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।

এরই মাঝে একবার সরকারের সঙ্গে বৈঠক হয় সিজেপির সেখানে তারা নিজেদের দাবিতে অনড় থাকার কথা জানিয়ে দেয়।

কোলাকুলি করছেন বিক্ষোভকারীদের কয়েকজন
ছবির ক্যাপশান, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের খবরে যন্তর মন্তরে উল্লাস শুরু হয়

সরকারের ওপরে চাপ বাড়ছিল

সিজেপি যেমন দিল্লিতে জমায়েত করছিলো, সেই আন্দোলনের সমর্থনে নিজেদের 'জেন-জি' বলে দাবি করা হাজার হাজার মানুষ দেশের বিভিন্ন শহরে পথে নামতে থাকেন। কলকাতা, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর, পাটনা-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদ কর্মসূচি দেখা দেয়।

শুক্রবারও সিজেপির ডাকে বিভিন্ন রাজ্যে রাস্তায় নামেন ছাত্র, যুব ছাড়াও রাস্তায় নামেন বহু মানুষ।

অন্যদিকে নানা সামাজিক মাধ্যমেও চলতে থাকে বাগ-বিতণ্ডা। 'জেন-জি' রা যেমন কটাক্ষ করতে থাকেন কেন্দ্রীয় সরকারকে, অন্যদিকে বিজেপি-পন্থি সামাজিক মাধ্যমে হ্যান্ডেলগুলো থেকেও এই আন্দোলনকারীদের কখনও 'চীনের দালাল', 'দেশ-বিরোধী', 'ডিপ স্টেটের চক্রান্ত' ইত্যাদি বলে অভিহিত করা হতে থাকে।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও নানান কর্মসূচি করতে থাকে। এরফলে অনেকেই মনে করেন সরকারের উপর চাপ ক্রমশ বাড়ছিল।

তবে আন্দোলনের চাপে যে নরেন্দ্র মোদীর সরকার এই প্রথমবার পড়ল, তা নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সিএএ, এনআরসি বিরুদ্ধে শাহীনবাগের প্রতিবাদ, বিজেপির ব্রিজভূষণ সিংয়ের বিরুদ্ধে নারী কুস্তিগীরদের যৌন হেনস্তার অভিযোগে দিল্লিতে ভারতীয় কুস্তিগিরদের অন্দোলন বা পাঞ্জাব-হরিয়ানা-উত্তর প্রদেশের হাজার হাজার কৃষকের দিল্লি ঘেরাও করে রাখা মাসের পর মাস - এরকম একাধিক প্রতিবাদ কর্মসূচির মোকাবিলা করতে হয়েছে বিজেপিকে।

তাই নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর দাবিতে ক্রমশ দেশজুড়ে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে সে বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন অনেকেই।

সরকারের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন সোনাম ওয়াংচুক
ছবির ক্যাপশান, সরকারের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন সোনাম ওয়াংচুক

'সরকারের জন্য একটি বড় ধাক্কা'

বৃহস্পতিবার রাতে সোনাম ওয়াংচুক তার অনশন ভাঙার পর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও নিজেদের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করে সিজেপি।

সরকারের সঙ্গে শুক্রবার দ্বিতীয় দফা বৈঠকেও একই কথা জানানো হয়।

বৈঠকের পর সিজেপির প্রতিনিধিরা জানান, অন্য দুই দাবিতে সরকার আশ্বাস দিলেও শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা না মেলা পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালাবেন।

দাবি করেন, যে এই বিষয়ে জানানোর জন্য শনিবার দুপুর অবধি সময় চাওয়া হয়েছে।

তবে সাংবাদিকদের সামনে শনিবারের বৈঠকের কথা উল্লেখ করলেও সিজেপি দাবির বিষয়ে কিছু বলেননি বৈঠকে উপস্থিত জেপি নাড্ডা।

তার আগে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নপত্র ফাঁসের রুখে করা বিল-আনাসহ একাধিক পদক্ষেপ নেন, শিক্ষা সচিবকেও সরানো হয়।

অবশেষে, কিছুটা নাটকীয়ভাবেই শনিবার দুপুরে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।

কিন্তু এই পদত্যাগ সরকারের জন্য কত বড় ধাক্কা?

প্রবীণ সাংবাদিক নীরজা চৌধুরীর মতে, এটা বিরোধী দল থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রী-সকলের জন্যই লাভজনক পরিস্থিতি।

তিনি বলেন, "এটা প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং সরকারের জন্য একটি বড় ধাক্কা। ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করলে এই আন্দোলন আরও বেড়ে যেত। যুবকদের ক্ষোভ প্রশমিত করার জন্য তার পদত্যাগ জরুরি ছিল।"

নীরজা চৌধুরী বলেন, "এটা যুবসম্পরদায়ের জন্য একটা বড় জয়। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতা তৈরি হয়েছে। এটা গণতন্ত্রের পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোকেও সুযোগ দেবে।"

সাা পাঞ্জাবি ও ধুসর কোটি পরা ধর্মেন্দ্র প্রধান মুখে হাত দিয়ে আছেন। তার চোখে চশমা
ছবির ক্যাপশান, শনিবার দুপুরে পদত্যাগ করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান, ফাইল ছবি

চাপ ছিল আরএসএসেরও?

ধর্মেন্দ্র প্রধান বিজেপির নেতা হলেও তার রাজনীতির শুরুটা ছিল আরএসএসের ছাত্র সংগঠন এবিভিপির মধ্যে দিয়ে।

তাই মি. প্রধানকে আরএসএস ঘনিষ্ঠ বলেও মনে করা হয়ে থাকে।

তবে 'জেন-জি'র আন্দোলনে সরকারের ওপরে যে ব্যাপক চাপ পড়ছে, তা অনুধাবন করতে পেরেছিল আরএসএস-ও।

সিনিয়র সাংবাদিক লভ কুমার মিশ্র বলেন, "আমি বিশ্বাস করি যে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পেছনে আরএসএস-এর চাপ এবং মোহন ভাগবতের বিবৃতিও কাজ করেছে। এই আন্দোলন কোনো রাজনীতিবিদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়নি। এটি ছিল ছাত্রদের আন্দোলন, ছাত্রদের জন্য এবং ছাত্রদের দ্বারা পরিচালিত, এবং এই অর্থে এটা ছিল অনন্য।"

দিল্লিতে আয়োজিত 'বিশ্ব মাঙ্গল্য সভা' অনুষ্ঠানে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, "আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন বাবা-মায়ের কথার সঙ্গে তর্ক করতাম না। নীরবতা মানে নীরবতা। কিন্তু এখন আর তেমনটা নেই, নতুন প্রজন্ম প্রশ্ন করে, তাদের কারণটা বলে দিতে হয়।"

তিনি বললেন, "আজকের প্রজন্মকে আরও বেশি স্নেহ দেওয়া দরকার। আমাদের তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে। আমাদের তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।"

লভ কুমার মিশ্রের মতে, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করলে তা সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারত।

তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন সত্তরের দশকের জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী আন্দোলনের কথাও।

মি. মিশ্রের মতে, "এটা ছাত্রদের জন্য একটা ঐতিহাসিক সাফল্য। জেপির আন্দোলনও তিন বছর পর সাফল্য পেয়েছিল, যখন তিনি ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে পরাজিত করেছিলেন। অথচ এখানে, মাত্র ৩৬ দিনের মধ্যেই তারা সরকারকে নিজেদের দাবির কাছে মাথা নত করতে বাধ্য করেছে।"

তিনি বলেন, "মূলত, গত চার-পাঁচ দিনের চাপেরই এটা সাফল্য। ছাত্রদের সমর্থনে দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল। মুম্বাই, পুনে, লক্ষ্ণৌ, জয়পুর সর্বত্র প্রতিবাদ শুরু হয়। বিহারে, পাটনার মতো বড় শহর তো দূরের কথা, খাগাউলের মতো ছোট জায়গাতেও যুবকরা রাস্তায় নেমেছিল। দারভাঙ্গা, সিওয়ান, ছাপড়া, ঔরঙ্গাবাদ, জেহানাবাদ, শেখপুরার মতো অনেক জায়গায় ছাত্ররা রাস্তায় ছিল।"

সাংবাদিক রশিদ কিদওয়াই এই পদত্যাগকে সরকারের জন্য একটা ধাক্কার পাশাপাশি সুযোগ হিসেবেও দেখছেন।

তিনি বলেন, "এই পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে মোদী সরকারের জন্য একটা বড় ধাক্কা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদীর জন্য সুযোগও বটে। এর কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য যদি ছাত্র ও বিরোধী দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তবে সরকার এই বিভেদ আরও বাড়াতে দ্বিধা করবে না।"

রশিদ কিদওয়াই আরও বলেন, "এমনটা হলে কেন্দ্রীয় সরকার সংসদের এই অধিবেশনেই সীমানা পুনর্নির্ধারণের মতো অনেক বিল পাস করিয়ে নেবে এবং এটা তাদের জন্য হেরে যাওয়া খেলা জেতার মতোই হবে।"

'জেন-জি'-র জয় হিসাবেই দেখছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলিও
ছবির ক্যাপশান, 'জেন-জি'-র জয় হিসাবেই দেখছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলিও

যা বললেন অভিজিৎ দীপকে

মি. প্রধানের পদত্যাগের পর যন্তর মন্তরের মঞ্চ থেকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, "ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, কারণ এটা গণতন্ত্র। গণতন্ত্রে যদি কথা বলতেই আমাদের ভয় লাগে, তাহলে এটা কেমন গণতন্ত্র? আমরা যদি আওয়াজ তুলি, তাহলে এই লোকেরা সঠিক পথে থাকবে এবং তাদের সঠিক পথে রাখাটাই জরুরি। যারা নিজেদের রাজা মনে করে, তারা আমাদের কারণেই ওখানে বসে আছে।"

ছেলের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন অভিজিৎ দীপকের মা অনিতা দীপকে।

বার্তা সংস্থা এএনআইকে তিনি বলেন, "তিনি বলেন, 'সারারাত আমাদের ঘুম হতো না, ভোর তিনটে পর্যন্ত ঘুমাতাম না, ভাবতাম ছেলের কী হচ্ছে না হচ্ছে, খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আজ খুব ভালো লাগছে। ওর পরিশ্রম সার্থক হয়েছে...ওর কষ্ট আজ সার্থক হলো।'

পদত্যাগের কথা প্রকাশ্যে আসার পরই একে গণতন্ত্রের জয় বলে আখ্যা দেন সোনাম ওয়াংচু্ক।

তিনি এক্স-এ লিখেছেন, "এটা গণতন্ত্রের বিজয়, সরাসরি রাজপথ থেকে আসা গণতন্ত্রের জয়। এটা শান্তি, ধৈর্য এবং অধ্যবসায়ের জয়। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং দেশের 'জেন জি'-কে অভিনন্দন। এছাড়াও, সেই সমস্ত নাগরিকদের ধন্যবাদ, যারা ভয় ও ভীতি প্রদর্শন উপেক্ষা করে দেশের প্রতিটা কোণ থেকে সোচ্চার হয়েছেন।"

একই সঙ্গে এও ইঙ্গিত করেছেন যে "এবার জবাবদিহিতা থেকে সংস্কার"-এর যে কাজ এখনো বাকি আছে সে দিকে নজর থাকবে।

সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক সাংবাদিকদের বলেছেন, "আমি সরকার এবং ধর্মেন্দ্র প্রধানের গৃহীত পদক্ষেপকে স্বাগত ও সম্মান জানাই এবং সকল দেশবাসীকে অভিনন্দন জানাই। আজ আমরা গণতন্ত্রের এক জয় প্রত্যক্ষ করলাম।"

"সবচেয়ে বেশি অভিনন্দন জানাব সিজেপিকে যারা এই ইস্যুকে প্রকাশ্যে এনে আন্দোলন শুরু করেছিল এবং তার স্বেছছাসেবকদেরও অভিনন্দন জানাই।"

"তবে জয়ের সময়েও বিনম্রতা বজায় রাখা দরকার।"

জেপি নাড্ডা, ডা. জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে সিজেপির সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা
ছবির ক্যাপশান, জেপি নাড্ডা, ডা. জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে সিজেপির সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা

এরপরে কী?

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল যে এরপরও কী আন্দোলন চলবে? সিজেপি এবং দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মধ্যে তৃতীয় দফা বৈঠকের পর অবশ্য তাতেও ছেদ পড়ে।

বৈঠক শেষে দুইপক্ষ যৌথ ভাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে। সেখানে মি নাড্ডা বলেন, "আমরা দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেছি এবং সব বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে আলাপ হয়েছে।"

সিজেপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সমস্ত অভিযোগ তুলে নেওয়া হবে, ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে না এই আশ্বাস দিয়েছে সরকার।

সৌরভ দাস বলেন, "শুধু দিল্লিতে নয়, বিজেপি শাসিত যে সমত রাজ্যে আন্দোলনে সামিলদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তা তুলে নেওয়া হবে এবং সন্তান হারাদের জন্য সরকারের নিয়ম মেনে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। মঙ্গলবার এই বিষয়ে লিখিতভাবে আমাদের জানানো হবে।"

আন্দোলনকারীদের শান্তি বজায় রেখে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আর্জি জানান তারা।

যন্তর মন্তরের মঞ্চে ফিরে গিয়ে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে সৌরভ দাস বলেন, "বন্ধুরা খুবই আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি আমাদের সমস্ত দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়া হয়েছে। এটা আমাদের কাছে বড় জয়। আপনারা সকলে শান্তিপূর্ণভাবে ফিরে যান কিন্তু তার আগে আমরা এক মিনিটের নীরবতা পালন করব সেই সব শিক্ষার্থীদের জন্য যারা এই দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য নিজেদের প্রাণ দিয়েছেন।"