জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে ঐক্যমত্য না হলে কি সফল হবে জলবায়ু সম্মেলন?

সিওপি ২৮-স্মমেলনে এক প্রতিবাদী কিশোরী।
ছবির ক্যাপশান, সিওপি-২৮ সম্মেলনে এক প্রতিবাদী কিশোরী।
Published

দুবাইয়ে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনের ‘কপ-২৮’ আলোচনায় অংশ নেয়া দেশগুলির মধ্যে মতবিরোধের কারণে কোন চুক্তি হওয়ার বিষয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর কারণ, বেশ কয়েকটি দেশ জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পর্কিত একটি খসড়া চুক্তিটিকে 'দুর্বল' বলে আখ্যা দিয়ে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

এর আগের একটি খসড়া প্রস্তাবনায় লেখা হয়েছিল, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়া হবে। কিন্তু সর্বশেষ এই খসড়ায় সে কথা রাখা হয় নি।

সম্মেলনে কোন চুক্তি হতে হলে অংশগ্রহণকারী ১৯৮টি দেশের প্রত্যেককেই এই বিষয়ে অবশ্যই একমত হতে হবে।

নতুন করে সংশোধিত প্রস্তাবনার একটি খসড়া মঙ্গলবার প্রকাশ করা হতে পারে, যাতে এই নিয়ে দরকষাকষি অব্যাহত রাখা যায়।

ইতিমধ্যে, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে দেখা গিয়েছে বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কিন্তু কখন বা কীভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার করা হবে সে বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সরকার কখনওই একমত হয়নি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক প্রতিনিধি ওই খসড়াটি ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করে জানিয়েছেন, তারা ওই আলোচনা থেকে সরে দাঁড়াতে পারে।

আয়ারল্যান্ডের পরিবেশমন্ত্রী এবং ইইউ-এর পক্ষে মধ্যস্থতাকারী এমন রায়ান বলেছেন, "আমরা খসড়া প্রস্তাবনািট সমর্থন করি না।”

তবে তিনি এটাও বলেছেন, এই আলোচনার সফল হতে না পারা "বিশ্বের কাছে কাঙ্ক্ষিত নয়"।

দুবাইয়ে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন বা সিওপি২৮।
ছবির ক্যাপশান, দুবাইয়ে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন বা কপ ২৮।

জলবায়ু পরিবর্তনের সামনের সারিতে থাকা দেশগুলির রাজনীতিবিদরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে এমন একটি বছরে এসব ক্রমবর্ধমান সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছে, যে বছরটি এখন পর্যন্ত সব থেকে উষ্ণতম বর্ষ বলে পরিণত হতে যাচ্ছে।

কপ ২৮-এর আলোচনায় সবথেকে বেশি যে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, তা হল তেল, কয়লা এবং গ্যাস পোড়ানোর ফলে যে গ্রিনহাউস গ্যাস উৎপন্ন হয় সে বিষয়ে কী করা উচিৎ।

‘কপ-২৮’-এর বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট সুলতান আল-জাবের জীবাশ্ম জ্বালানির বিষয়ে কোনও বড়সড় চুক্তি করতে পারেন, সে বিষয়ে প্রত্যাশা কমই ছিল। কারণ, তিনি আবুধাবির বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী সংস্থা ‘অ্যাডনোক’-এর সিইও।

কিন্তু যে সমস্ত দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির দ্রুত অবসান চায় তারা আশাবাদী হয়ে উঠেছে, কারণ সুলতান আল-জাবের বলেছেন যে তিনি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ‘পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার’ পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন।

কপ-২৮’-এর প্রেসিডেন্ট সুলতান আল-জাবের।
ছবির ক্যাপশান, কপ-২৮-এর প্রেসিডেন্ট সুলতান আল-জাবের।

শনিবার প্রকাশিত একটি খসড়া প্রস্তাবে একটি বিষয় নিশ্চিত করেছে যে এই আলোচনার ফলপ্রসূ হওয়ার জন্য একটি বিকল্প হল, "সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার থেকে পর্যায়ক্রমে বেরিয়ে আসা"।

এতে যে প্রশ্নগুলি রয়ে যাচ্ছে তার মধ্যে একটি হল এটা কবে সম্ভব? পাশাপাশি অন্য যে প্রশ্নটি উঠে এসেছে তা হল, এটা জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানোর সময় নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড সংরক্ষণের জন্য ব্যয়বহুল এবং পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি ব্যবহারের উপর নির্ভর করবে কিনা।

সোমবার আরেকটি খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে 'ফেজ আউট’ বা ‘পর্যায়ক্রমিকভাবে বন্ধ করার’- কথাটা মুছে ফেলা হয়। এর পরিবর্তে বলা হয়েছে, দেশগুলোর উচিত 'ন্যায়সঙ্গত এবং সুশৃঙ্খল উপায়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও উৎপাদন হ্রাস করা'।

জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন পরিবেশকর্মীরা।
ছবির ক্যাপশান, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন পরিবেশকর্মীরা।
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ভাষার পরিবর্তন ছোট বলে মনে হলেও, জাতিসংঘের নথিগুলিতে সামান্য পার্থক্য কিন্তু আলোচনায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলিকে ‘রাজি’ করানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বৈঠকের আগে অংশগ্রহণকারী দেশগুলির সরকারের কাছে ওই খসড়া প্রস্তাবনাটি পড়ে দেখার জন্য মাত্র এক ঘণ্টা সময় আছে।

ইতিমধ্যে, জলবায়ু পরিবর্তনের সামনের সারিতে থাকা দেশগুলো- যেসব দেশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে, ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং ঝড়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তারা এই-খসড়া চুক্তির নিন্দা করেছে।

"আমরা আমাদের ডেথ সার্টিফিকেটে স্বাক্ষর করব না," অ্যালায়েন্স অফ স্মল আইল্যান্ড স্টেটসের একজন প্রতিনিধি বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন, "জীবাশ্ম জ্বালানী বন্ধের বিষয়ে কোনও দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ছাড়া" তারা কোনও খসড়া চুক্তিতে সম্মত হবে না।

‘কপ ২৮’-এর’ সভাপতি সুলতান আল-জাবের অবশ্য বলেছেন, খসড়া প্রস্তাবনায় প্রতিফলিত হয়েছে ‘তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষার’ এবং একই সঙ্গে এটিকে একটি ‘বড় পদক্ষেপ’ বলেও উল্লেখ করেছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক মুখপাত্রের মন্তব্য, ওই খসড়ায় জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পর্কিত অংশটি “যথেষ্ট শক্তিশালী করা দরকার"।

যুক্তরাজ্য এই খসড়াকে 'হতাশাজনক' আখ্যা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, খসড়াটি ‘আশানুরূপ জায়গায় পৌছয়নি’।

এক মুখপাত্র বলেন, 'আমাদের জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করতে হবে।’

স্বল্পোন্নত দেশগুলির গোষ্ঠীও ওই খসড়ার সঙ্গে সম্মত হয়নি। বরং তারা সিওপি-২৮ এর চেয়ারপার্সনকে প্রশ্ন করেছন খসড়ায় 'উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোথায়?’

সৌদি আরব পুরো আলোচনা জুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধের বিষয়ে ‘কড়া ভাষার’ বিরোধিতা করে এসেছে। এ ব্যাপারে মন্তব্য করার অনুরোধ জানানো হলেও, তারা সাড়া দেয়নি।

সিওপি-২৮ সম্মেলন।
ছবির ক্যাপশান, কপ-২৮ সম্মেলন।

উন্নয়নশীল দেশগুলি যারা জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর অর্থনীতিকে নবায়নযোগ্য শক্তি-ভিত্তিক করতে আরও সহযোগিতা চেয়েছিল, তারাও হয়ত এমন একটি চুক্তিকে সমর্থন করবে যা কয়লা, তেল এবং গ্যাসের দ্রুত ব্যবহার বন্ধ করার বিষয়ে অত্যধিক জোর দেবে।

সর্বশেষ খসড়াতে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষমতা তিনগুণ করার প্রতিশ্রুতির উল্লেখ রয়েছে। ওই অঙ্গীকারে স্বাক্ষর করেছে ১০০টি দেশ।

সোমবার জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সাফল্যের যে মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, তার তুলনায়, এই খসড়া প্রস্তাবনা কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি জানিয়েছিলেন, আলোচনাটি বিচার করা হবে কয়লা, তেল ও গ্যাসের ভবিষ্যত নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশগুলোর সামর্থ্যের নিরিখে।

তিনি বলেন, “বিশ্বের তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি কমানোর সময়সূচীকে মাথায় রেখে জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছালেই তবেই এই বৈঠক সফল বলে মনে করা হবে।”

বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্প স্তরের চেয়ে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দেশগুলি।

মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে দেশগুলি ঐক্যমত না হওয়ার কারণে ওই সময়সীমা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।