'চাঁদা না পেয়ে' ট্রাক এনে লুটপাট; সরকার কেন চাঁদাবাজি-দখল থামাতে পারছে না?

    • Author, তাফসীর বাবু
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে একটি আবাসন কোম্পানির অফিস, নাম আফসানা হাউজিং। গত রোববার বেলা ১১টা ২৬ মিনিটে ওই অফিসের সামনে এসে থামে একটি খালি ছোট ট্রাক। ততক্ষণে অফিসটিতে ঢুকে পড়েন জনা তিরিশেক যুবক।

অফিসে ঢুকেই তারা বিভিন্ন কক্ষের গেট ভেঙে ফেলেন। অফিসটি তখন ফাঁকা ছিল।

কার্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, রামদাসহ লাঠিসোটা নিয়ে ভেতরে ঢোকা যুবকেরা ভাঙচুর করছে। একপর্যায়ে ভেতরে থাকা সোফাসেট, এয়ারকিন্ডশনার, টিভিসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র বের করে বাইরে রাখা পিকআপ ভ্যানে তোলেন তারা।

এরপর ভ্যানসহ সেখান থেকে চলে যান।

এই ঘটনার কয়েকদিন পর গত বুধবার সরেজমিনে সেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অফিসে গিয়ে দেখা যায়, পুরো অফিসে ভাঙচুরের চিহ্ন।

"এই রুমে এসি ছিল। সেটা খুলে নিয়ে গেছে। এটার আউটডোরও খুলে নিয়ে গেছে। দামি সোফা ছিল, টেবিল, ক্যাশটাকাকা -সব নিয়ে গেছে। টিভি-গিজারও নিয়ে গেছে," বলছিলেন প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মো. নাসির।

তিনি জানান, সেদিন মোট কোটি টাকার মতো সম্পদ লুট হয়। এর মূল কারণ চাঁদার দাবি না মানা।

"ওরা চল্লিশ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিলো। বলেছিলো এখানে ব্যবসা করতে হলে চাঁদা দিতে হবে। আমরা রাজি হই নাই। তারপর এই হামলা। প্রায় এক কোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে।"

ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক সজীব ব্যাপারী। ঘটনার পরদিন তিনি ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে কেরানিগঞ্জ মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

সজীব ব্যাপারী বলেন, "ওরা সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং ভাড়া করে এই হামলাটা করেছে। কারণ আমি ৪০ লাখ টাকা চাঁদা দেই নাই। আমি বলছি যে, আমি চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করবো না। এখন আমি তো ভয়-আতঙ্ক নিয়ে আছি। কাজ বন্ধ। "

বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে চাঁদাবাজি, দখল, ভাঙচুরসহ একের পর এক ঘটনা গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। একের এক ঘটনায় উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও। কারণ সরকার এগুলো থামাতে পারছে না।

বিশেষত ঢাকায় পরিচিতি একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিও এবং মিরপুরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে হামলা-ভাঙচুরের পর সরকারের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপকভাবে প্রশ্ন ওঠে।

বিশেষ করে বিভিন্ন ঘটনায় বিএনপির কোনো কোনো নেতার নাম আসায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে, কারণ এই দলটির সরকার চালাচ্ছে।

'চাঁদাবাজদের জন্য বাড়ি তুলতে পারছি না'

কেরানিগঞ্জ থেকে এবার আসা যাক ঢাকার মিরপুরে।

মিরপুরের রূপনগর এলাকায় চার কাঠার একটি প্লট কিনেছিলেন ব্যবসায়ী মোদাচ্ছের হোসেন। সঙ্গে অংশীদার হিসেবে নেন আরেকজনকে। আশেপাশের প্লটগুলোতে ভবন উঠে গেলেও তার প্লটটি দীর্ঘদিন ফাঁকা পড়ে থাকে।

তবে চারমাস আগে প্লটে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করতে পাইলিংয়ের উদ্যোগ নেন তিনি।

"কাজ শুরু করতে না করতেই দফায় দফায় চাঁদার দাবিতে লোকজন আসতে শুরু করলো। একই গ্রুপ, কিন্তু একেকবার একেজন আসে। আমি চারটা পাইলিং শুরু করে দিলাম। ওরা হুমকি দিলো যে, আগে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। নাহলে সব মালামাল নিয়ে যাবে," বলেন মোদাচ্ছের হোসেন।

চাঁদার দাবিতে অতিষ্ঠ হয়ে একপর্যায়ে কাজ বন্ধ করে দেন মি. হোসেন। ভবিষ্যতে কবে কাজ শুরু করবেন, বুঝতে পারছেন না।

"আমি গ্রাম থেকে জায়গা-জমি বেঁচে টাকা জোগাড় করে নিয়ে আসছি যে, বিল্ডিংটা বানাবো। নিজের বাসায় উঠবো। সেইটা আর হলো না। এখনো ভাড়া বাসাতেই আছি। চাঁদা দিয়ে কাজ করাইতে পারবো না," ক্ষোভ নিয়ে বলেন মি. হোসেন।

তিনি জানান, চাঁদার হুমকি পেলেও এবং কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হলেও তিনি আইনের আশ্রয় নেননি।

"লাভ হবে না। এখানে সবাই সব জানে। কিন্তু কেউ কিছু করবে না। চুপ থাকাই ভালো।"

মিরপুরের রূপনগরেই 'অর্ধশত প্লট ও ভবনে চাঁদার হুমকি'

মোদাচ্ছের হোসেনের সূত্র ধরেই পাশের এলাকায় কথা হয় কয়েকজন প্লট মালিকের সঙ্গে। তারা জানান, চাঁদা না দিয়ে এলাকায় কেউ ভবন নির্মাণ করতে পারছে না।

সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকায় একটি ভবন নির্মাণের কাজ নিয়েছেন ডেফোডিল হোমস কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান।

দশ তলা ভবনের চারটি ফ্লোর নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার পর আর কাজ এগুতে পারেননি তিনি।

আব্দুল মান্নান বলেন, "এখানে তো মাটি কাটার সময় থেকেই চান্দা শুরু হয়ে গেছে। আমি ওদের সঙ্গে অনেকবার বসছি। কিন্তু ওরা একেকবার একেকজন আসে। পরে আর চান্দা দেই নাই। পরে ওরা আমার লোকজনকে কয়েকবার মারধর করছে। মানে ওদেরকে টাকা দিলে আমাকে কাজ করতে দিবে। তখন আর ঝামেলা করবে না।"

কত টাকা চাঁদা চাওয়া হয়েছে এমন প্রশ্নে মি. মান্নান বলেন, তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছিলো।

তিনি জানান, হুমকির মুখে অন্তত চারবার তার কাজ বন্ধ করে দিতে হয়েছিলো। সর্বশেষ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ভবনের কাজ বন্ধ আছে। প্রতিদিনই লোকসান গুনছেন তিনি।

"এটার কাজ তিন বছরের মধ্যেই শেষ করে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে হবে -এভাবেই চুক্তি করা আছে। নাহলে প্রতি মাসে জরিমানা দিতে হবে। কিন্তু এখন তো এটা তিন বছরে শেষ করা অসম্ভব।"

মি. মান্নান এই ঘটনায় মামলা করেছেন।

"মামলা একটা করেছি। কিন্তু কিছু তো হচ্ছে না। থানা যদি ওদেরকে সহযোগিতা না করে, তাহলে এটা একমাসের মধ্যেই কমে যাবে। আর দলীয় লোক যদি সহযোগিতা না করে তাহলেও এসব থাকবে না। অ্যাকচুয়ালি এরা থানারও সহযোগিতা পায়, দলীয় লোকদেরও সহযোগিতা পায়," বলেন তিনি।

এই সম্প্রসারিত রূপনাগর আবাসিক এলাকায় মি. মান্নানের মতো অনেকেই চাঁদা চেয়ে হুমকি পেয়েছেন বলে জানান।

বিষয়টি নিয়ে সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকা প্লট/ফ্ল্যাট/বাড়ি মালিক কল্যাণ সমিতির ব্যানারে গত রোববার ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মলনও করা হয়। যেখানে লিখিত বক্তব্যে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা হয়।

"এলাকায় জমি দখলের পাশাপাশি নতুন করে প্লট মালিকদের কাছে স্থাপনা নির্মাণের সময় শুরু হয়েছে চাঁদাবাজি। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে দলবল নিয়ে নির্মাণ শ্রমিকদের হুমকি-ধামকি ও মারধর করে কাজ বন্ধ করে দিচ্ছে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। এমনকি রূপনগর থানা থেকে পুলিশ এনেও সন্ত্রাসীরা পুলিশের উপস্থিতিতে কাজ বন্ধ করে দেয়। ...থানা পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।"

সমিতির সহ সভাপতি মো. তাওহীদুল ইসলাম তালুকদার বিবিসি বাংলাকে বলেন, চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে তারা প্রেসব্রিফিং করতে বাধ্য হয়েছেন।

"এটা চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর থেকে দেখা যাচ্ছে। ইদানিং এই চাঁদাবাজি, দখলটা আরও বেশি বাড়ছে। ধরেন প্লট মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশটা এমন ভবনে চাঁদা চাওয়া হয়েছে," বলেন তিনি।

বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেও রূপনগর থানার ওসির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে ঢাকায় চাঁদা দাবি, সন্ত্রাস এবং দখলের বিষয়ে পুলিশের গাফিলতি নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে অবশ্য সেটা নাকচ করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ।

"আমাদের এখানে কোনো ধরনের গাফিলতি নাই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যদি গাফিলতি থাকে, সেই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যদি আমাদের কাছে আসে, আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেই। যেখানে অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে তদন্ত করে মামলা নেওয়ার প্রয়োজন হলে আমরা মামলা নেই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসি," বলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি (মিডিয়া) আকতার হোসেন।

চাঁদাবাজি-দখলের পেছনে রাজনৈতিক 'প্রশ্রয়'?

বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে চাঁদাবাজি, দখল, ভাঙচুরসহ একের পর এক ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ঘটনায় সরকারিদলের স্থানীয় নেতাদের নাম আসায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে।

কিন্তু এমন পরিস্থিতি কেন হলো?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, এসব অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে এগুলো সহজে নির্মুল হয় না।

"আমাদের এখানে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, তারা যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন নেতাকর্মীদের একটা অংশ মনে করেন, বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তিনি যে হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন, ক্ষমতায় আসার পর সবগুলো তিনি সুদে-আসলে তুলে ফেলবেন। তো সেটা তুলতে গেলে তো আইন মেনে সেটা সম্ভব না। তখনই আসে শক্তিপ্রয়োগ করে অন্যেরটা দখল বা চাঁদাবাজির কৌশল।"

বাংলাদেশে চাঁদাবাজি বা দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে দলীয় নেতাদের নাম প্রকাশ্যে আসার পর অবশ্য সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে অবশ্য বহিষ্কারের মতো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়।

তবে মি. হক মনে করেন এসব বহিষ্কার খুব একটা কাজে আসছে না।

"সাংগঠনিক ব্যবস্থা যেটা নেওয়া হচ্ছে, সেটা সমঝোতামূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা কি না সেটা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই সাংগঠনিক ব্যবস্থা উদাহরণ তৈরি করতে পারছে না। এখানে আইনের প্রয়োগটাও কঠোর করা প্রয়াজন। যতগুলো ঘটনা ঘটছে, সকল ঘটনায় যখন যথাযথ আইনের প্রয়োগ হবে, তখন সেটা একটা বার্তা তৈরি করবে।"

কিন্তু সরকার কি দল সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে? আর সরকারই বা কেন এসব অপরাধ থামাতে পারছে না?

এমন প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান অবশ্য স্বীকার করছেন, দলের কেউ কেউ অপরাধে জড়িত থাকতে পারে। তবে সরকার প্রশ্রয় দিচ্ছে এমন অভিযোগ নাকচ করেন তিনি।

ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, "সরকার প্রশ্রয় দিচ্ছে না, প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো কারণও নেই। তবে এই অভিযোগ আমি উড়িয়েও দিতে চাই না যে, সরকারি দলের কেউ না কেউ এটার সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত নয়। জনগণ যদি কোনোভাবে সাফার করতে থাকে ক্রমাগত এবং সেটা যদি সরকারি দলের নামে হয়ে থাকে, তাতে যদি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সঠিক ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে তো সরকারকেই এটার মাশুল দিতে হবে। সরকার এটার ব্যাপারে সচেতন আছে।"