'ওই জামা রংপুরে আমিসহ আরও দুশো লোকের আছে'- বললেন পুলিশ কর্মকর্তা

Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রংপুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চারজনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের হাতে আটক দুই ব্যক্তিকে নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে, নানা প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ।

বিশেষ করে আটককৃতদের একজনের গায়ের জামা এবং রংপুরেরই একজন পুলিশ কর্মকর্তার গায়ের জামা একই ধরনের- এমন ছবি অনেকেই শেয়ার করে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন যে, পুলিশের জামা ওই ব্যক্তির গায়ে গেল কি করে।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা রংপুর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "ওই জামা রংপুরে আমিসহ আরও দুশো লোকের আছে। আমার শার্ট আমারই আছে। এ নিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে"।

এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, আটককৃত দুজন রবিবারই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া রবিবার রাতেই নিহতদের সৎকার সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার।

ওদিকে নিহতদের ময়না তদন্ত করা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস আজ স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রাথমিকভাবে তাদের কাছে মনে হয়েছে যে গণপতি চক্রবর্তীসহ চার জনকে শ্বাসরোধ করেই হত্যা করা হয়েছে।

রংপুর ডিবির উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তারা পুরো বিষয়টি উদঘাটন করে গুছিয়ে এনেছেন এবং খুব দ্রুতই আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার রাতে নগরীর দাসপাড়া মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের মোট চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ।

পরে এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দুজনকে আটক করে পুলিশ দাবি করে, ওই দুই ব্যক্তিই মি. চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রকে একে একে হত্যা করেছে।

আলোচনায় গায়ের জামা

রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী যে মামলা করেছেন তাতে বলা হয়েছে যে, অজ্ঞাতনামা আসামিরা এসব খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, একুশে অগাস্ট শুক্রবার রাত আনুমানিক ২টা ৪০ মিনিট থেকে বাইশে অগাস্ট শনিবার পৌনে নয়টার মধ্যে কোনো এক সময় অজ্ঞাতনামা আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেছে।

এই মামলা দায়েরের আগেই মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুজনকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। রংপুরের পুলিশ কমিশনার নিজেই এক সংবাদ সম্মেলনে জানান যে ওই দুই ব্যক্তি খুনের কথা স্বীকার করে ঘটনাটি কিভাবে ঘটিয়েছে তার বর্ণনা দিয়েছে।

কিন্তু রবিবার রাত থেকেই সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়। কেউ কেউ নিহত ও আটককৃতরা একই ধর্মের মানুষ হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে- আটককৃতদের একজনের গায়ের জামা একজন পুলিশ কর্মকর্তার গায়ের জামা- হুবহু একই হওয়ার ঘটনা।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা হলেন রংপুরের ডিবি ডিসি সনাতন চক্রবর্তী।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন, "এটি কাকতালীয়। আড়ং ব্রান্ডের ওই জামা রংপুরে আমিসহ আরও দুশো জনের আছে। একই ধরনের শার্ট আরও অনেকেরই থাকতে পারে। এটিকে সামনে এনে ঘটনা ভিন্ন ভাবে প্রচারের চেষ্টা চলছে"।

মি. চক্রবর্তীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা যখন ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তদন্ত কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন তখন তিনি ওই জামাটিই পরিহিত ছিলেন।

তখন স্থানীয় কিছু নিউজ পোর্টাল যে লাইভ করছিল তাতেও মি. চক্রবর্তীর গায়ে ওই শার্ট দেখা গেছে বলে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক জানিয়েছেন।

পরে পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে যখন বাইরে আনা হয় তখন সিদ্ধার্থ দাসের গায়েও ওই একই ধরনের শার্ট দেখা গেছে।

সনাতন চক্রবর্তী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "আমরা যখন তাদের আটক করে আমাদের অফিসে এনে বসাই তখনও সিদ্ধার্থ দাসের গায়ে ওই শার্টটিই ছিল"।

যদিও সিদ্ধার্থ দাসের পরিবারের সদস্যদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এমন খবর বেরিয়েছে যে, এ ধরনের শার্ট সিদ্ধার্থ দাসকে তারা আগে পড়তে দেখেননি।

ময়না তদন্ত ও চার্জশিট

রংপুর ডিবির উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আটককৃত দুজনই আরও বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে।

"আমরাও সব দিক থেকে তদন্ত করেছি। তারা ১৬৪ করেছে। সব মিলিয়ে ঘটনার রহস্য উদঘাটিত হয়েছে ও প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ময়না তদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর আমরা দ্রুত চার্জশিট দিয়ে দিবো," বলেছেন মি. চক্রবর্তী।

ওদিকে রবিবারই গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের মরদেহের ময়না তদন্ত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সম্পন্ন হয়েছে।

হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস আজ স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, "আমরা ময়না তদন্ত করেছি। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে শ্বাসরোধ করেই হত্যা করা হয়েছে। শরীর থেকে যেসব নমুনা সংগ্রহ করা যায় তা করেছি। এগুলো এখন সিআইডি ল্যাবে পাঠাবো। সেখান থেকে যে রিপোর্ট আসবে তার ভিত্তিতে আমাদের মতামত দিব"।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান যে, চোয়াল ভাঙ্গার কোনো লক্ষণ তারা পাননি। যদিও এর আগে পুলিশ কমিশনার চোয়াল ভাঙ্গার কথা ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করেছিলেন।

অ্যাসিড ব্যবহার করে মরদেহ বিকৃত করা হয়েছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে মি. বিশ্বাস বলেন, এমন কিছু তারা ময়না তদন্তে পাননি। "পচে যাওয়ার কারণে এমন দেখা যাচ্ছে। অ্যাসিড বা এমন কিছু ছিল না," বলেছেন তিনি।

ওদিকে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাইয়ের মেয়ের জামাই বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে, রবিবার রাতেই নিহতদের সবার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।

এর আগে শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর দাসপাড়া মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের মোট চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ।

রবিবার রংপুরের পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন যে, আটক হওয়া মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসই মাদক সেবন করে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতেই গলায় গামছা পেঁচিয়ে একে একে চার জনকে হত্যা করেছে।

মি. চক্রবর্তী দোতলা বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন। মৃতদেহগুলোতে পচন ধরে পুরো বাড়িতেই দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল।

সেখান থেকেই একে একে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।