বাংলাদেশের 'সোয়া এক কোটি' হিন্দুকে কেন একজোট হতে বললেন আরএসএস প্রধান?

আরএসএসের 'সরসঙ্ঘচালক' বা প্রধান মোহন ভাগবত
ছবির ক্যাপশান, মুম্বাইতে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন আরএসএসের সঙ্ঘ-প্রধান
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

ভারতের হিন্দু পুনরুত্থানবাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের প্রধান বাংলাদেশের হিন্দুদের একজোট হয়ে 'লড়াই' করার আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতসহ বিশ্বের হিন্দুরা এতে সমর্থন করবে বলেও ভরসা দিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি এবং ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে মুম্বাইয়ের একটি অনুষ্ঠানে আরএসএসের 'সরসঙ্ঘচালক' বা প্রধান মোহন ভাগবতকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, "এবার বাংলাদেশের হিন্দুরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও না পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন"।

আরএসএসের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে দেওয়া একটি বক্তৃতার পরে শ্রোতাদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন মি. ভাগবত।

তবে বাংলাদেশের হিন্দুদের নিয়ে এই প্রথম যে তিনি মুখ খুললেন, তা নয়। ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় একটি সেমিনারেও তিনি বাংলাদেশের হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হতে পরামর্শ দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে সেদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপরে হামলা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত সরকারও ঢাকার কাছে একাধিকবার আবেদন করেছে।

তবে প্রতিবারই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং এইসব হামলা যে সংগঠিতভাবে হচ্ছে, সেই তত্ত্বও খারিজ করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের হিন্দুদের একজোট হওয়ার কথা ছাড়াও অনুপ্রবেশ, জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতার মতো বিষয় নিয়েও কথা বলেছেন মোহন ভাগবত - ফাইল ছবি
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের হিন্দুদের একজোট হওয়ার কথা ছাড়াও অনুপ্রবেশ, জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতার মতো বিষয় নিয়েও কথা বলেছেন মোহন ভাগবত - ফাইল ছবি

কী বলেছেন মোহন ভাগবত?

মুম্বাইয়ের ওই অনুষ্ঠানে মোহন ভাগবত বলেন, "বাংলাদেশে এখনো সোয়া এক কোটি হিন্দু আছেন। যদি তারা ঐক্যবদ্ধ হন, তাহলে সেখানকার রাজনৈতিক পরিসরকে নিজেদের অনুকূলে, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করতে পারবে। তবে এর জন্য তাদের একজোট হতে হবে"।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

"খুশির খবর এই যে এবার তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে পালাবো না, ওখানেই থাকব আর লড়াই করব। তারা যদি লড়াই করতে যান, তাহলে একতা জরুরি। যত দ্রুত তারা ঐক্যবদ্ধ হবেন, ততই মঙ্গল," বলেন তিনি।

তার কথায়, "বাংলাদেশের বর্তমানে যত হিন্দু আছেন, তারা নিজেদের অবস্থার অনেকটাই উন্নতি করতে পারবেন। এখানে, আমাদের সীমানার মধ্যে থেকে, আর বিশ্বের হিন্দুরা তাদের নিজেদের জায়গা থেকে তাদের জন্য অনেক কিছুই করতে পারবেন, করবেনও। আমি আপনাদের এ ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে পারি"।

"কিন্তু এর জন্য ওখানে সমাজের অভ্যন্তরে একটা শক্তি গড়ে তোলা দরকার," মন্তব্য মোহন ভাগবতের।

একই সঙ্গে তিনি বলেন, "এর লক্ষ্য হবে সমাজে সচেতনতা আর নিরাপত্তার প্রস্তুতি", যার জন্য সিভিল ডিফেন্সের পাঠ্যক্রম আছে।

"সংঘের কর্মকর্তা মুখের ভাষা শুনেই সন্দেহজনক অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে প্রশাসনকে খবর দেয়," বলেও মন্তব্য করেছেন মোহন ভাগবত।

তিনি এও বলেন যে চিহ্নিতকরণ আর নির্বাসনের প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে শুরু হয়ে গেছে এবং এই প্রক্রিয়ার গতি বাড়বে। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বেশ কিছু ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

তবে এর আগে বিহারে বা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গসহ যে ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর প্রক্রিয়া চলছে, তাতে ঠিক কতজন 'অনুপ্রবেশকারী' চিহ্নিত করা গেছে, সেই তথ্য নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে কোনো সাংবিধানিক সংস্থাই জানায়নি।

জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতার জন্য তিনটি মূল কারণকে দায়ী করেন মি. ভাগবত। এগুলো হলো ধর্মান্তকরণ, অনুপ্রবেশ এবং কম জন্ম হার।

এই প্রসঙ্গেই তিনি "তিন সন্তান প্রসব" করার কথাও বলেছেন, তবে সেটা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, তাও বলেছেন তিনি।

বাংলাদেশে দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যার বিরুদ্ধে কলকাতায় বিক্ষোভ হিন্দুত্ববাদীদের - ফাইল ছবি
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যার বিরুদ্ধে কলকাতায় বিক্ষোভ হিন্দুত্ববাদীদের - ফাইল ছবি

বাংলাদেশের ভোটের আগেই আরএসএসের এই বক্তব্য

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন হতে চলেছে দু-দিন পরেই। তারই আগে মোহন ভাগবত বাংলাদেশের হিন্দুদের নিয়ে এই মন্তব্য করায় মনে করা হচ্ছে যে নির্বাচনের দিকে নজর রেখেই তিনি এই কথাগুলো বলেছেন।

তবে বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপরে হামলার বিষয়টি নিয়ে লাগাতার সরব থেকেছে আরএসএস এবং তার সহযোগী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো।

সম্মিলিত সনাতন জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারি হোক বা ডিসেম্বর মাসে হিন্দু গার্মেন্টস শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা – প্রতি ক্ষেত্রেই ভারত থেকে আরএসএস, বিজেপি বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো সংগঠনগুলো রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছে।

দিল্লিতে বাংলাদেশের দূতাবাস বা কলকাতার উপদূতাবাস কিংবা আগরতলার সহকারী রাষ্ট্রদূতের দফতর – বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপরে অত্যাচার হচ্ছে বলে প্রতিবাদ দেখিয়েছে আরএসএসের সহযোগী সংগঠনগুলো।

দীপু চন্দ্র দাসের হত্যার প্রতিবাদ জানাতে সম্প্রতি যে-সব বিক্ষোভ হয়েছে বিভিন্ন শহরের বাংলাদেশের ভিসা অফিস বা দূতাবাসগুলোতে, তার প্রেক্ষিতে অনেক জায়গাতেই বাংলাদেশের ভিসা দেওয়া বন্ধ রেখেছে ঢাকা।

অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ডিসেম্বর মাসে বলেছিল যে 'নিরপেক্ষ সূত্রগুলো' থেকে সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদকালে সংখ্যালঘুদের ওপরে দুই হাজার নয়শোরও বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

এর মধ্যে যেমন আছে হত্যা, তেমনই আছে অগ্নিসংযোগ, জমি দখল করে নেওয়ার মতো ঘটনাও।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে এসব ঘটনা অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে বলে সেগুলোর গুরুত্ব কমিয়ে দেখানো হতে পারে বা এগুলোকে রাজনৈতিক সহিংসতা হিসেবেও দেখানো হতে পারে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য ভারতের ওই বিবৃতি খারিজ করে দিয়ে বলেছিল, তারা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক অপরাধ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত। মন্ত্রণালয় অবশ্য সেই বিবৃতিতে ভারতের সংখ্যালঘুদের ওপরে কিছু হামলার ঘটনার কথাও উল্লেখ করেছিল।