ট্রাম্পের যে মন্তব্যকে 'বানানো গল্প' বলে ক্ষোভ ঝাড়লেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনি

জর্জিয়া মেলোনি
ছবির ক্যাপশান, জর্জিয়া মেলোনি
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

একটি মন্তব্যকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মধ্যে বিবাদ সামনে এসেছে।

ইতালির একটি টেলভিশন চ্যানেলকে ট্রাম্প বেলছেন, তার সঙ্গে একটি ছবি তোলার জন্য 'অনুরোধ' করেছিলেন মেলোনি। তবে ট্রাম্পের এই দাবিকে পুরোপুরি 'বানানো গল্প' বলছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে, এই ঘটনার পর ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্তোনিও তাজানি আগামী সপ্তাহের যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিল করেছেন।

এই প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ ইঙ্গিত দেয় যে, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকে তাদের আগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে।

এই সপ্তাহে ফ্রান্সের পূর্বাঞ্চলে এভিয়াঁ লে বাঁ-তে জি-৭ সম্মেলনে ট্রাম্প ও মেলোনিকে ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলতে দেখা গেছে। পরে মেলোনি সাংবাদিকদের বলেন যে তাদের সম্পর্ক অপরিবর্তিত রয়েছে এবং সেখানে 'কোনো তিক্ততা' বা অভিযোগ ছিল না।

তবে এরপর ট্রাম্প ইতালির টিভি চ্যানেলকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, "সে (মেলোনি) আমার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করেছিল, ওর জন্য আমার মায়া লেগেছিল"।

এভিয়াঁয় দুই নেতাকে একাধিকবার একসঙ্গে দেখা যায়। একটি ছোট সোফায় বসে তারা গভীর আলোচনায় মগ্ন ছিলেন এবং কথোপকথনের সময় মেলোনিকে হাসতেও দেখা গেছে।

ট্রাম্প আরও বলেন, "সম্ভবত সে খুশি যে আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি"।

টিভি চ্যানেল লা সেভেন ট্রাম্পের মূল ইংরেজি বক্তব্য প্রচার করেনি, বরং সেটি ইতালীয় ভাষায় ডাব করে সম্প্রচার করেছে।

জি-৭ বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জর্জিয়া মেলোনি
ছবির ক্যাপশান, জি-৭ বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জর্জিয়া মেলোনি
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ট্রাম্পের এই মন্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেন মেলোনি। তিনি ইনস্টাগ্রামে তার প্রায় ৭০ লাখ অনুসারীর উদ্দেশে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সংক্ষিপ্ত এক বক্তব্যে বলেন যে, "খোলাখুলিভাবে বললে, বিস্ময়ে স্তব্ধ" হয়ে গেছেন তিনি।

তিনি বলেন, "আমি জানি না কেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে এভাবে আচরণ করেন"।

তিনি আরও বলেছেন যে এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম নয়।

"আমি শুধু বলতে পারি, এটা দুঃখজনক যে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের শত্রুদের এবং যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের প্রতি একই ধরনের দৃঢ়তা দেখান না। বরং যাদের তিনি শত্রু বলে মনে করার কথা, তাদের নেতাদের প্রতিই তিনি অনেক বেশি নমনীয় ও সহানুভূতিশীল বলে মনে হয়"।

এরপর মেলোনি বলেন, "তবে একটি বিষয় তার মনে রাখা দরকার যে আমি কিংবা ইতালি- কেউ কখনও কারও কাছে ভিক্ষা বা অনুনয়-বিনয়ের মধ্যে নেই"।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউজের সাথে যোগাযোগ করেছে বিবিসি।

ট্রাম্পের আকস্মিক মন্তব্যে মেলোনির স্পষ্ট বিস্ময় এমন সময়ে হলো, যখন ধারাবাহিক কিছু ঘটনার কারণে তাদের একসময়ের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে।

২০২২ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর জর্জিয়া মেলোনি ছিলেন একমাত্র ইউরোপীয় নেতা যিনি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প এর অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক নেতা তাকে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য একটি 'সেতুবন্ধনকারী' হিসেবে দেখতেন।

কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের বিরোধিতায় মেলোনি প্রকাশ্যে অবস্থান নেন।

এর জবাবে এপ্রিল মাসে ট্রাম্প ইতালির একটি দৈনিক পত্রিকাকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেন, "আমি ভেবেছিলাম তার (মেলোনির) সাহস আছে, কিন্তু আমি ভুল ছিলাম"।

অর্থাৎ ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে মেলোনির কাছ থেকে তিনি আরও দৃঢ় সমর্থন আশা করেছিলেন, কিন্তু ইরান ইস্যুতে তার অবস্থান দেখে তিনি হতাশ হয়েছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জর্জিয়া মেলোনি একটি মাঠের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, পেছনে একটি    ব্যাকড্রপে কাগজ দিয়ে সাদা, লাখ ও কালো রংয়ে জি-৭ এর লোগো বানিয়ে বাসানো
ছবির ক্যাপশান, বেশ কয়েকবার দুই নেতাকে ছবি তুলতে দেখা গেছে

ট্রাম্প যখন পোপ লিও চতুর্দশকে "অপরাধ দমনে দুর্বল এবং পররাষ্ট্রনীতিতে ভয়াবহ" বলে অভিযুক্ত করেছিলেন, তখন জর্জিয়া মেলোনি সেই মন্তব্যকে "অগ্রহণযোগ্য" বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

ট্রাম্পের সর্বশেষ সাক্ষাৎকারের প্রতিক্রিয়ায়, ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাট্টারেল্লা ফোন করে সমর্থন জানিয়েছেন মেলোনিকে। একই সঙ্গে ইতালির বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও মেলোনির পক্ষে অবস্থান নেন।

বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামপন্থি সিনেটর ফিলিপ্পো সেনসি বলেছেন, "কোনো ব্যক্তিরই ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভঙ্গিতে কথা বলার অধিকার নেই"।

অন্যদিকে গুসেপ্পে কোঁতে বলেন, "ইতালি এমন অপমানের যোগ্য নয়"।

তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটনের অনুগ্রহ বা সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা কখনোই জাতীয় মর্যাদা ও স্বার্থের বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়।

মেলোনির নিজ দল ব্রাদার্স অফ ইতালি এর সিনেট গ্রুপ নেতা লুসিও মালান বলেছেন, ট্রাম্পের বক্তব্য ইউরোপের বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে তার ধারাবাহিক আপত্তিকর মন্তব্যেরই অংশ। তার মতে, এসব মন্তব্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে ট্রাম্পের নিজের ভাবমূর্তি ও কর্তৃত্বের।

মালান আরও বলেন যে, জি৭ সম্মেলনের ভিডিও ফুটেজে বাস্তবে ট্রাম্প যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তার সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য দেখা যায়। তার ধারণা, ওয়াশিংটনকে প্রয়োজনে 'না' বলার ক্ষেত্রে মেলোনির অতীত অবস্থানই হয়তো ট্রাম্পকে বিরক্ত করেছে।

সরকারি জোটের অংশ মাত্তেও সালভিনি, যিনি লিগ দলীয় নেতা, তিনি বলেন, "যে জর্জিয়াকে (মেলোনিকে) আক্রমণ করে, সে আমাদের সবাইকেই আক্রমণ করে"।

জি-৭ নেতাদের বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জর্জিয়া মেলোনিকে দেখা যাচ্ছে
ছবির ক্যাপশান, জি-৭ নেতাদের বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জর্জিয়া মেলোনিকে দেখা যাচ্ছে

মেলোনি ও ট্রাম্পের মধ্যে এই বিরোধ কেবল একটি সাধারণ ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নয়, এটি একটি রাজনৈতিক প্রবণতার প্রতিফলন।

এক সময় ইউরোপের মিত্র দেশগুলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু এখন তারা তাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানাতে আরও বেশি প্রস্তুত।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার আফগানিস্তানে ব্রিটিশ ও মিত্র বাহিনী সম্পর্কে ট্রাম্পের সমালোচনার বিরুদ্ধে সরাসরি আপত্তি তুলেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে জর্জিয়া মেলোনিসহ আরও কয়েকজন ইউরোপীয় নেতা ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন। তারা মার্কিন বোমারু বিমানকে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের জন্য অনুমতিও দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

কূটনীতিকদের মতে, চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গ্রিনল্যান্ড ঘিরে হুমকি দেওয়ার পর ইউরোপীয় নেতারা আরও দৃঢ় মনোভাব প্রদর্শন করছেন।

ফলে ইউরোপকে আরও কৌশলগতভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার আলোচনা আবারও জোরদার হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানী এখন এমন একটি পথ খুঁজছে, যেখানে তারা আটলান্টিকের ওপারের ক্রমশ অনির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠা মিত্রের ওপর কম নির্ভর করে নিজেদের সক্ষমতা আরও বাড়াতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব নেতা হয়তো মহাদেশজুড়ে আসন্ন নির্বাচনের আগে ইউরোপীয় ভোটারদের পরিবর্তিত মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন।

বিশেষ করে, ইউরোপের ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো- যারা শুরুতে ট্রাম্প শিবিরকে নিজেদের রাজনৈতিক সহযাত্রী হিসেবে বিবেচনা করতো- এখন তারা ধীরে ধীরে তাদের মার্কিন সমমনা দলগুলোর থেকে দূরত্ব তৈরি করছে।