আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
নেপালের বন্যায় সেই বাড়িটির বারান্দায় আটকে পড়াদের শেষ পর্যন্ত কী হলো?
হঠাৎই চারদিক দিয়ে তুমুলবেগে ধেয়ে আসছে কাদা পানির স্রোত। তীব্র গতিতে ধেয়ে আসা পানির তাণ্ডবে ভেসে যাচ্ছে বাড়ি গাড়ি, স্থাপনাসহ সব কিছু। ভেঙে পড়েছে আশপাশের বাড়িঘর। এর মধ্যেই হালকা সবুজ রঙয়ের একটি বাড়ির বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কয়েকজন মানুষ।
সামাজিক যোগাযোগ এই ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিবিসি ভেরিফাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই ভিডিও ফুটেজটি নেপালের ত্রিশূলী নদী সংলগ্ন এলাকার।
সেই সময় ওই বাড়িতে থাকা ব্যক্তিরা একটি বারান্দায় আটকা পড়েছিলেন। এ সময় বাড়িটির ছাদে থাকা একজনকে সাহায্যের জন্য লাল একটি কাপড় নাড়তে দেখা যায়।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে শেষ পর্যন্ত তাদের পরিণতি কী হয়েছিল সেটি দেখা যায়নি।
বিবিসি ভেরিফাই ওই ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করেনি। তবে ভিডিওটি প্রকাশ করে বলা হয়েছে, কোনোভাবে ওই পরিবারটি বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিল।
বন্যার পানির স্রোত থেমে যাওয়ার পর লোকজন সাহায্যের জন্য সেখানে পৌঁছায়।
ভিডিওতে অন্তত তিনজনকে দেখা যায়। তাদের একজন পুরুষ, একজন নারী এবং একটি শিশু, যাকে সম্ভবত একটি ছোট মেয়ে বলেই মনে হচ্ছে।
ওই বাড়ির দোতলায় বেলকনিতে তাদের আটকা পড়ে থাকতে দেখা যায়।
সে সময় তাদের চারপাশ দিয়ে তীব্র বেগে কাদামাটির স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। সেই স্রোতের সঙ্গে বড় বড় পাথর, ধ্বংসাবশেষ ও বাড়িঘরের টিনের চালও ভেসে যেতে দেখা যায়।
তীব্র স্রোতের সাথে ভেসে আসা বিভিন্ন বস্তু একের পর এক ওই বাড়িটিতে আঘাত করছিল। ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিওটি দেখে মনে হচ্ছিল পানির তাণ্ডব যেন ওই বাড়িটিকেও ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
সে সময় বাড়িটিতে আটকা পড়া মানুষদের অসহায়ভাবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তখন একজন নারী বাড়িটির ছাদে উঠে সাহায্যের জন্য লাল কাপড় নাড়ছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভিডিও নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক এরিক চেন ওই ভিডিও ফুটেজটি শেয়ার করে লিখেছেন, "সাম্প্রতিক সময়ে দেখা সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের একটি এটি। চারপাশের সবকিছু নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া প্রবল স্রোতের মধ্যেও একটি বাড়ি এখনো দাঁড়িয়ে আছে।"
তিনি আরও লিখেন, "মানুষগুলো কোনোভাবে বারান্দা ও ছাদে টিকে আছেন। আর কাদা, বরফ, পাথর ও পানির বিশাল ঢেউ নেপাল-তিব্বতের এই উপত্যকা চিরে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা কেবল কোনো পরিসংখ্যান নয়। এটি একটি পরিবার, যারা অপেক্ষা করছে পানির পরবর্তী ঢেউ এসে তাদের বেঁচে থাকার শেষ নিরাপদ জায়গাটুকুও ভাসিয়ে নিয়ে যাবে কি না। প্রার্থনা করি তারা যেন বেঁচে থাকেন। পানির আরেকটি ঢেউ আসার আগেই উদ্ধারকারীরা যেন তাদের কাছে পৌঁছাতে পারেন।"
বেঁচে ফেরাদের অভিজ্ঞতা
বুধবারের বন্যার পর থেকেই ব্যাপকভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। দুর্গত এলাকায় সেনাবাহিনীর যে ক্যাম্প খোলা হয়েছে সেখানে প্রতিনিয়ত জড়ো হচ্ছেন অনেকে মানুষ, বিশেষ করে নিখোঁজদের স্বজনেরা।
অনেকে পরিবারের সদস্যদের খুঁজে খুঁজে হতাশ হয়ে ফিরছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ত্রিশূলী গ্রামের বাসিন্দারা তাদের বাড়িঘরের জিনিসপত্রও খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
৪৩ বছর বয়সী সরস্বৈত ঘালে সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে বলছিলেন, "ঘোলা পানি প্রবল বেগে ধেয়ে আসছিল এবং যাওয়ার সময় "ভূমিকম্পের মতো মাটি কেঁপে উঠেছিল"।
তিনি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, তাদের আশপাশের পাহাড়ের ঢালগুলো পানিতে ডুবে গিয়েছিল। তিনি ভেবেছিলেন যে তারা এই দুর্যোগ থেকে বাঁচতে পারবেন না।
ঘালে বলছিলেন, তিনি কোনোমতে দ্রুত একটি উঁচু জায়গায় ছুটে যান। সেখান থেকেই তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন যে তার চারপাশে কাদা পানির স্রোতে সবকিছু ভেসে যাচ্ছে। তিনি জানান, এই ঘটনাটি তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।
ঘালে বলেন, "এখন যেন কোনো পৃথিবী নেই। আর কী বাকি আছে? মনে হচ্ছে আমি মরে গেছি"।
একই গ্রামের ১৭ বছর বয়সী কিশোরী ঋষিকা কালওয়ার জানান, তাদের পৈত্রিক বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।
তিনি বলছিলেন, "যে জায়গায় আমরা জন্মেছি এবং দীর্ঘদিন বসবাস করেছি। আমাদের বাবা-মা অনেক যুদ্ধ করে অনেক সংগ্রাম করেছেন। আমার মনে হয় আমি এই সংগ্রামগুলো কখনো ভুলতে পারব না"।
এখনো নিখোঁজ অনেকেই
বিবিসি সংবাদদাতা আজাদেহ মোশিরি নেপালে ভুক্তভোগী বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের অনেকেই পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন।
অনেকেই নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে ফিরছেন। কেউ আবার তাদের বেঁচে ফেরার গল্পগুলোও তুলে ধরেছেন বিবিসির কাছে।
এমনই একজন নারীর সঙ্গে কথা বলেছেন আজাদেহ। যিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, "আমার দুইটা ছেলেকে পানিতে ভাসিয়ে নিয়ে গেছ। এখন একটাই মাত্র ছেলে আছে"।
তিনি আরো জানান, তার দুইজন সন্তানসহ পরিবারের মোট চারজন সদস্য এখনো নিখোঁজ। তাদের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওই নারীর ভাই জানাচ্ছিলেন, কীভাবে তিনি তার স্ত্রী ও বোনের সন্তানকে নিয়ে বাড়ি থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন।
তিনি বলেন, "আমি তাকে তাড়াতাড়ি করতে বলেছিলাম, কিন্তু তারা ঘর তালা দিচ্ছিল, তখনই হঠাৎ স্রোত এসে তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়"।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার পর তাদের তাদের আত্নীয় স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
যুক্তরাজ্যে নন-রেসিডেন্ট নেপালি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রাজেন্দ্র পুদাসাইনি শনিবার বিবিসি ব্রেকফাস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ওই দুর্ঘটনার ৫৬ ঘণ্টা পর তিনি তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছেন।
তিনি জানান, আকস্মিক বন্যার সময় তার তা হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। বন্যার তীব্র স্রোতে একটি সেতু উড়ে যায়, যে কারণে তার মা আর বাড়ি ফিরতে পারেননি। হাসপাতালে আটকা পড়েছিলেন। পরে নেপালের সেনাবাহিনী তাকে উদ্ধার করে।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর
অ্যাকশনএইড নেপাল-এর নির্বাহী পরিচালক সুজীতা মাথেমা বুধবারের আকস্মিক বন্যাকে একটি 'সুনামি'-র কাছাকাছি ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বিবিসি ব্রেকফাস্ট-কে বলেন, "আমাদের কল্পনারও অতীত ছিল এই বন্যা।"
"আমরা সত্যিই খুব খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে আছি।"
মাথেমা জানান, সড়ক ও সেতুগুলো "সম্পূর্ণভাবে ভেসে গেছে" এবং কতজন মানুষ "কাদার নিচে" চাপা পড়েছেন, অথবা সুড়ঙ্গ ও ভবনের ভেতরে আটকা পড়েছেন, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত নয়।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মানুষ বিদ্যুতের জন্য জেনারেটর বা সৌর প্যানেলের ওপর নির্ভর করছে।
তবে এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও পরিচালক বলেন, মাঠপর্যায়ে দলগুলো কাজ করছে এবং আরও সফল উদ্ধারকাজ হবে বলে তিনি "খুবই আশাবাদী"।
নেপালে বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান চলছে যেখানে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন এবং প্রায় ৪০টি হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে।
উদ্ধারকারীদের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো কাদায় আক্রান্ত এলাকাগুলোতে এখনো জীবিত থাকতে পারেন এমন মানুষদের খুঁজে বের করা।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই বর্তমানে দেশের "তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার"।
এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, চার হাজার ৪৫১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৮৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
তিনি আরো জানান, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হলো হেলিকপ্টার। তবে কিছু এলাকা 'জলাভূমিতে' পরিণত হওয়ায় সেখানে হেলিকপ্টার অবতরণ করাও সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টা নাগাদ নেপাল সরকার সর্বশেষ তথ্যে জানিয়েছে এখন পর্যন্ত ৪২০ জনেরও বেশি পর্যটক নিখোঁজ রয়েছে।
চলছে নিখোঁজদের সন্ধান
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যায় এখন পর্যন্ত ৬২৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ জানিয়েছে এখন পর্যন্ত দুই হাজার ৪০০ এর বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।
নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিখোঁজদের উদ্ধারে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। ত্রিশূল থেকে বিবিসি সংবাদদাতা জানিয়েছে উদ্ধার তৎপরতার মধ্যেই তুমুল বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উদ্ধারকাজ।
এদিকে চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে মৃতের সরকারি সংখ্যা বেড়ে সাতজনে দাঁড়িয়েছে। এখনো ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার কারণ হিসেবে প্রাথমিক তদন্তে একটি হিমবাহ ধসে পড়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নেপালি পক্ষের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রবল বন্যার স্রোতের উৎপত্তি তিব্বতের দিকে ভোটেকোশী নদীতে। সেখানে একটি হিমবাহ ভেঙে পড়ার পর বিপুল পরিমাণ কাদা পানি নদীতে গিয়ে পড়ে।
সেখানকার নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী বাসিন্দারা বলছেন, ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা আধাঘণ্টার মধ্যে নয় মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই আধাঘণ্টা অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর সুযোগই পায়নি অনেকে। কেউ পথে, কেউ বাসাবাড়িতে আটকা পড়ে তীব্র গতিতে ছুটে আসা সেই পানির তাণ্ডব দেখেছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ নেপালকে ত্রাণসামগ্রী অথবা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
জাতিসংঘের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ১০ হাজারেরও বেশি পরিবারের এখনই খাবার ও নিরাপদ পানির প্রয়োজন।