তালেবান শাসন ও শরিয়া আইন পাঁচ বছরে আফগানিস্তানে কী পরিবর্তন এনেছে?

    • Author, লিস ডুসেট
    • Role, মুখ্য আর্ন্তজাতিক সংবাদদাতা, কাবুল
  • Published
  • পড়ার সময়: ১১ মিনিট

কাবুলের দক্ষিণে একটি গ্রামে দেয়ালে চুনের প্রলেপ লাগানো বেসমেন্টে প্রায় ১২ জন নারী ফুটন্ত চেরি আর আলুবোখরার রসের পাত্র নাড়তে এবং জ্যামের কাচের জারে লেবেল লাগাতে ব্যস্ত।

তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে, এই ব্যবসাগুলো সেই বিরল সুযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে নারীরা এখনো নিজেদের দক্ষতায় তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে নিতে পারেন।

৪৭ বছর বয়সী নাজিয়া একজন আফগান শিল্পোদ্যোক্তা এবং নয় সন্তানের মা, তিনিই এটি পরিচালনা করেন। ১৪ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল। এখন এখানে যে তরুণীরা কাজ করেন তাদের মধ্যে নাজিয়ার মেয়েও রয়েছে, অন্য মেয়েদের জ্যাম তৈরি শেখাতে কর্মশালাটি চালাচ্ছেন তিনি।

প্রশাসন যদি তরুণীদের মাধ্যমিক স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে বাধা না দিত, তাহলে এখানে কর্মশালায় অংশ নেওয়ার পরিবর্তে সবাই হয়তো তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য পড়াশোনা করতেন।

তবে এখন এই ধরনের কাজের বিষয়েও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি চালু হওয়া নিয়ম অনুযায়ী, নারীদের তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুরুষদের সাহায্য নিতে হবে। বাণিজ্য মেলায় শুধু পুরুষরাই তাদের পণ্য প্রদর্শনের জন্য স্টলে বসতে পারবেন।

এই নিয়ম চালু করার নেপথ্যে তালেবান একাধিক কারণ উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, নারীরা হিজাব বা মাথা ঢাকার নিয়মকানুন সঠিকভাবে অনুসরণ করছে না।

মিজ. নাজিয়া বলেন, "তালেবানের সঙ্গে বাকি বিশ্বের কথোপকথনের পদ্ধতি বদলানো প্রয়োজন। বর্তমান পন্থায় কাজ হচ্ছে না। আফগান নারীদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন প্রয়োজন। না হলে আমরা আশা হারিয়ে ফেলছি।"

এই কট্টরপন্থি ইসলামী গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসার পর পাঁচ বছর কেটে গেছে।

এই সময়ে নারীরা মূলত জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদেরও স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ।

আফগানিস্তানের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই একই প্রশ্ন করছেন– তালেবানের সঙ্গে সংলাপের কোন পন্থাটি সঠিক যার দ্বারা প্রকৃত পরিবর্তন আসতে পারে?

এই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। নারীর অধিকার, তালেবানের খামখেয়ালি নির্দেশ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকটের মধ্যে সবকিছুই ঝুঁকির মুখে।

এই বিষয়ে বিশ্বে নানা মত শোনা যায়।

পশ্চিমের দেশগুলো সাধারণত মানবাধিকারের ওপর জোর দেয়, অন্যদিকে অন্যরা বিনিয়োগের সুযোগে বেশি আগ্রহী। এমনকি পশ্চিমের দেশগুলোর মধ্যেও কোনটা সবচেয়ে ভালো প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

অনেকেই এখন বিশ্বাস করেন যে, এ পর্যন্ত যা করা হয়েছে তাতে কোনো কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না।

আফগানিস্তানকে বিচ্ছিন্ন না করে রেখে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া

বিশ্ব থেকে আফগানিস্তানকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার পক্ষে খুব কম লোকই মতামত দেন।

এর একটি প্রধান কারণ হলো, জাতিসংঘের মতে, দুই কোটি ২০ লাখ আফগান, অর্থাৎ দেশটির জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, বেঁচে থাকার জন্য কোনো না কোনো ধরনের বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগানিস্তান বেশ কয়েকটি বড় সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। দেশটি গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে এবং বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও সম্মুখীন হয়েছে।

প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। উপরন্তু, বিভিন্ন দেশ থেকে বিতাড়িত লাখ লাখ আফগান এই দরিদ্র দেশটিতে ফিরে এসেছেন।

একটি সত্য অনস্বীকার্য তালেবান বর্তমানে আফগানিস্তানের ক্ষমতা ধরে রেখেছে।

২০২১ সালের ১৫ই অগাস্ট তালেবান যোদ্ধারা কাবুলে প্রবেশ করে। তারপর থেকে তারা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়েছে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করেছে।

বিদেশে অবস্থিত সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী এবং ইসলামিক স্টেট যোদ্ধাদের পর্যায়ক্রমিক আক্রমণ সত্ত্বেও এটি ঘটেছে।

তালেবান রাজস্ব থেকে আয় করছে। চীন, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং উজবেকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে খনি, জ্বালানি এবং অন্যান্য খাতে চুক্তিও করছে।

তবে, সন্ত্রাসবাদ ও মানবাধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলোর প্রবল চাপ তাদের ওপর রয়েছে।

রাশিয়া একমাত্র দেশ যে তালেবান শাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে তারা এখনো নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে আসন লাভ করতে পারেনি, যেটিকে তালেবান তাদের বৈধ অধিকার বলে মনে করে।

আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি এখন আর তালেবানের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতিসংঘের একজন প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "স্বীকৃতির ব্যাপারে পশ্চিমের দেশগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।"

তিনি বলেন যে, অনেক দেশ তালেবানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছেছে, তাদের কূটনীতিকদের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং নিজেদের দূতাবাসের মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়েছে। এর ফলে তালেবান কার্যত স্বীকৃতি পেয়েই গেছে।

তিনি বলেন, "তালেবান যে জাতিসংঘের স্বীকৃতি চায়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু শুরুর দিকে চাপ প্রয়োগের জন্য এটি তাদের কাছে যতটা কার্যকর হাতিয়ার ছিল, এখন আর তা নেই।"

কাবুলে তালেবানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আফগান দূতাবাসগুলোর তালিকা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে।

এই দূতাবাসগুলো আগের ক্ষমতাচ্যুত সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন, বিশ্বজুড়ে ৪০টিরও বেশি আফগান দূতাবাস তালেবানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গেছে।

তালেবানের প্রধান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, "আমরা যদি সম্পর্কের উন্নতি করতে চাই, তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে আমাদের একে অপরের কাছাকাছি আসতে হবে।"

বিবিসির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় কান্দাহারে, যেটি দক্ষিণ আফগানিস্তানের একটি শহর যা তালেবানদের ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।

এখানেই তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি সুসংহত করেছেন। তিনিই শতাধিক ফরমান বা ফতোয়া জারি করেছেন।

এই আদেশগুলোর অনেকগুলোই নারীদের স্বাভাবিক জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আখুন্দজাদা একে নারীদের সুরক্ষার প্রতি একটি ইসলামী দায়িত্ব হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন।

তালেবান শাসনের পাঁচ বছর পূর্তিকে অনেকেই একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখছেন। সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক বৈঠকে জাতিসংঘের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রুদ্ধদ্বার আলোচনায় পরিস্থিতিটিকে "অস্থির ও সম্ভাব্য বিপজ্জনক ভারসাম্য" হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তবে আফগানিস্তান বিশ্ববাসীর মনোযোগ অনেকটাই হারিয়েছে। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মনোযোগ আদায় করেছে।

এদিকে, ইউরোপের জন্য জরুরি প্রশ্ন হলো কীভাবে বিপুল সংখ্যক আফগানকে তাদের সীমান্ত অতিক্রম করা থেকে বিরত রাখা যায়। এই পরিস্থিতি আগের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

"২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে পশ্চিমের দেশগুলো যে পরিমাণ নজর দিয়েছে তার নিরিখে এটা আশ্চর্যজনক যে দেশটি এখন এত কম মনোযোগ পাচ্ছে," এমনই মত একজন পশ্চিমী কূটনীতিকের, যিনি সম্প্রতি আফগানিস্তানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যদিও তিনি এখনো কূটনৈতিক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন বলে পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

তিনি বলেন, "প্রকৃত কূটনৈতিক ফাটলটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে।"

তিনি আফগানিস্তানের জন্য বিশেষ দূত পদটি বিলুপ্ত করার বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করছিলেন।

একই সময়ে, ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইউএসএআইডি) সহ বেশ কয়েকটি সংস্থাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

একসময় আফগানিস্তান সম্পর্কিত প্রায় প্রতিটি বিষয়ে বিশ্বের নজর কাড়ার জন্য ইউএসএআইডি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

এমনকি তালেবানের মধ্যেও এমন অনেকেই যারা সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন, তাদের মধ্যেও হতাশা লক্ষ্য করা গেছে।

তারা মনে করেন যে, ভিন্ন ধরনের সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে বিশ্বসমাজ যে খুব একটা আগ্রহী তেমনটা একেবারেই মনে হচ্ছে না।

তালেবানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মোল্লা আব্দুল সালাম জাইফ বলেন, "আমরা আন্তর্জাতিক সমাজের অংশ হতে চাই।"

তিনি এখন কাবুলের উপকণ্ঠে ছেলে ও মেয়েদের জন্য একটি মাদ্রাসা পরিচালনা করেন।

মাদ্রাসা মূলধারার স্কুলের মতো নয়, সেখানে সব বয়সের মেয়েরা পড়াশোনা করতে পারে। কিছু মাদ্রাসায় বিশেষ করে যেগুলো বেসরকারিভাবে পরিচালিত, সেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ও পড়ানো হয়।

তিনি বলেন, "শুধু চাপ প্রয়োগ করলেই কাজ হবে না।"

আফগানিস্তানের ইতিহাসের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা রুশদের কাছে আত্মসমর্পণ করিনি, আমেরিকানদের কাছেও না। তাহলে তালেবান এখন কেন আত্মসমর্পণ করবে?"

যোগাযোগ ও খোলামেলা আলোচনা

জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন যে আফগানিস্তানে তাদের উপস্থিতি কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলে।

তারা কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথা উল্লেখ করছেন।

এর মধ্যে রয়েছে বন্দিদের সঙ্গে আচরণ, 'সৎকাজের প্রচার ও অসৎকাজের প্রতিরোধ' নামে পরিচিত নৈতিক বিধির কঠোর বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার উন্নত করার প্রচেষ্টা।

জাতিসংঘ জানিয়েছে যে গত পাঁচ বছর ধরে তালেবানের সঙ্গে তাদের 'অনিয়মিত সম্পৃক্ততা' রয়েছে।

তার মতে, "আলোচনার গতি ধীর হলেও ধাপে ধাপে অগ্রগতি হয়েছে, তবে মাঝেমধ্যে বাধারও সম্মুখীন হতে হয়েছে।"

তা সত্ত্বেও, জাতিসংঘ মনে করে যে এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া অপরিহার্য।

আফগানিস্তানে জাতিসংঘের মহাসচিবের উপ-বিশেষ প্রতিনিধি জর্জেট গ্যাগনন বলেন, "কোনো প্রক্রিয়া একেবারেই না থাকার চেয়ে ধীরে ধীরে এগোনো ভালো।"

বর্তমানে কাবুলে তিনি জাতিসংঘের মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

জাতিসংঘকেও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। সমালোচকদের মতে, তারা তালেবানের বিরুদ্ধে যথেষ্ট জোরালো অবস্থান নেয়নি। দোহা প্রক্রিয়ার মতো ফোরামগুলোর ক্ষেত্রেও এই সমালোচনা উঠে এসেছে, যেখানে তালেবানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

২০২৪ সালে তালেবানের একটি প্রতিনিধিদল কাতারের রাজধানী দোহা সফর করে এবং সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। তালেবানের শর্ত ছিল, এই বৈঠকে আফগান নারীদের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত থাকতে পারবেন না।

জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, এই বৈঠকগুলোতে সমস্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তারা এও উল্লেখ করেন যে, পরবর্তী বৈঠকগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

বর্তমানে 'মোজাইক' নামে একটি নতুন প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় ছয়টি মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে আরও সুশৃঙ্খলভাবে আলোচনা চালানো হচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার, নারীর অধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রমের মতো বিষয়গুলো।

অন্যদিকে তালেবানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি, আটকে রাখা অর্থ বা তহবিল মুক্ত করা এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মতো বিষয়গুলো।

কাবুলে জাতিসংঘের কঠোর নিরাপত্তায় মোড়া একটি জায়গায় আমরা জর্জেট গ্যাগননের সঙ্গে দেখা করি। তিনি বলেন, "ধীরে ধীরে আস্থা ও পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে উঠতে শুরু করেছে। এটি জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে পারে।"

তিনি এই প্রচেষ্টাকে "দীর্ঘ যাত্রার ক্ষুদ্র পদক্ষেপ" হিসেবে দেখছেন।

গ্যাগনন উল্লেখ করেন যে, কেবল পৃথক দেশগুলোর মধ্যকার আলোচনার মাধ্যমে এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

তিনি বলেন, "এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের চাপই কাজে আসেনি; এমনকি হুমকি-ধমকিতেও কোনো কাজ হয়নি। আমাদের প্রধান আশা, সব দেশ যেন একটি ঐক্যবদ্ধ বার্তা দেয় এবং সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।"

তবে অনেকেরই আশঙ্কা এমনকি খোদ জাতিসংঘের ভেতরেও এমন ধারণা রয়েছে যে এই 'মিশ্র বা বহুমুখী' কৌশলটিও হয়তো সফল হবে না।

তা সত্ত্বেও, অনেকেই মনে করেন যে আফগানিস্তানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। তাই সেখানে উপস্থিত থেকে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া জরুরি বলে মনে করেন অনেকে।

একই সঙ্গে অসুরক্ষিত ও অভাবী জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীদের সহায়তা ও সুরক্ষার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাওয়াকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকেই।

নেপথ্যের কথোপকথন

আন্তর্জাতিক ও আফগান সহায়তা সংস্থাগুলো একেবারে তৃণমূল স্তরে কার্যক্রম পরিচালনা করার উপায় খুঁজে যাচ্ছে।

এই সব জায়গাতেই তালেবানের সর্বোচ্চ নেতার ফরমান বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালানো হয়। এ লক্ষ্যে 'বিকল্প ব্যবস্থা' বা 'অল্টারনেটিভ অ্যারেঞ্জমেন্ট' নামে বিভিন্ন পদক্ষেপের পরিকল্পনা করা হয়।

এই ব্যবস্থার আওতায় কোনো কোনো এলাকার নারীরা ঘরে বসেই কাজ করার সুযোগ পান।

কিছু ক্ষেত্রে, তারা পুরুষ সহকর্মীদের থেকে আলাদা কক্ষে, ভিন্ন তলায় কিংবা পৃথক ভবনে কাজ করেন।

আফগানিস্তানে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্মরত ব্রিটিশ সংস্থা 'আফগান-এইড'-এর প্রধান ক্রিস কিন্ডার বলেন, "আফগানিস্তানে অনেক কিছুই ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে এই সম্পর্কগুলো প্রায়শই কাজকে সহজ করে তোলে।"

তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন যে, কার্যক্রম পরিচালনা ও কাজের সুযোগ বা প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত অধিকাংশ বিষয় অভিজ্ঞ আফগান কর্মীরাই সামলে থাকেন।

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন প্রাদেশিক শহর ও মফস্বল এলাকায় সফরের সময় দেখা গেছে যে, স্থানীয় তালেবান কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করেন।

তবে কেউ কেউ আবার যে কোনো ধরনের বিদেশি সহায়তার বিষয়ে গভীর সংশয় পোষণ করেন।

আরেকটি সহায়তা সংস্থা স্থানীয় পর্যায়ে হওয়া সমঝোতাগুলোকে 'মৌখিক ও ভঙ্গুর' বলে অভিহিত করেছে।

প্রকল্পগুলো চালিয়ে যাওয়ার জন্য সহায়তা সংস্থাগুলোকে তাদের নীতির সঙ্গে আপস করতে হয়েছে - এমন সমালোচনাকে কিন্ডার নাকচ করে দিয়েছেন।

তারা বলেন, "তালেবানদের যেমন সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তেমনি আমাদের এবং আমাদের দাতাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা বিভিন্ন কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করি যাতে উভয় পক্ষই একে অপরের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারে।"

এক্ষেত্রেও একাধিক কর্মকর্তা আরও ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত কর্মপন্থা গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন।

কঠোর অবস্থান গ্রহণের দাবি

জ্যাম প্রস্তুতকারক নাজিয়া বলেন, "আমাদের আলোচনা চালিয়ে যাওয়া উচিত, এবার কিছু সুনির্দিষ্ট শর্তও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।"

বিদেশে বসবাসরত আফগান নারী অধিকারকর্মী এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোও একই মত পোষণ করেন।

তাদের মতে, আলোচনাটি এই পর্যন্ত একপেশে হয়েছে; কারণ তালিবান এর বিনিময়ে কোনো বড় বা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেনি।

তারা মনে করেন, তালেবান যতক্ষণ না দৃশ্যমান ও সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আনছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আলোচনার পরিধি মানবিক সহায়তা সংক্রান্ত বিষয়ের বাইরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়।

সম্প্রতি একটি নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয় যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা জুন মাসে ব্রাসেলসে তালেবানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদলকে বৈঠকে স্বাগত জানান।

তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর এটিই ছিল এই ধরনের প্রথম বৈঠক।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা একদিনের ওই বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে মূলত সেই সব আফগান নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার ওপর আলোকপাত করা হয়, যাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নে বসবাসের আইনি অধিকার নেই।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই আয়োজনটিকে "টেকনিক্যাল পর্যায়ের আলোচনা" হিসেবে অভিহিত করলেও, তালেবান বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেছিল।

তালেবানের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, বৈঠকের আলোচ্যসূচির মধ্যে ইউরোপে সম্ভাব্য কনসালের উপস্থিতি এবং "বিশ্বাস-স্থাপনের পদক্ষেপ" গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আফগান বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক রিনা আমিরি বলেন, "কূটনৈতিক মহল এ বিষয়ে ভালোভাবে অবগত যে, টেকনিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি মাধ্যম এগিয়ে এসেছে।"

রিনা আমিরি ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আফগান নারী, কন্যাশিশু ও মানবাধিকার বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এই সময়ে, তালিবানের সঙ্গে আলোচনার শর্তাবলীও তাদের নির্ধারণ করতে হয়েছিল।

তিনি বলেন, "ব্রাসেলসে বৈঠকটি আয়োজন করা স্পষ্টতই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল, কেবল বাস্তব বা প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়।"

সমালোচকরা এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে "স্বাভাবিকীকরণের দিকে একটি ধীর পদক্ষেপ" হিসেবে বর্ণনা করেন।

কোনো পরিবর্তন আসবে?

কাবুলে আমরা আফগান অধিকারকর্মী মেহবুবা সিরাজের সঙ্গে দেখা করি, যিনি নারীদের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করেন।

তার প্রশ্ন, "আফগানিস্তানে কাটানো গত পাঁচ বছরে আমি কী অর্জন করেছি?"

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর, নারীদের অধিকারের লড়াইয়ে নিজের দেশেই থেকে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে সিরাজ ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন।

তবে ৭৮ বছর বয়সী সিরাজ এখন বলছেন যে, তিনি দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ডিসেম্বরে তার শেষ আশ্রয়কেন্দ্রটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই কেন্দ্রটি পারিবারিক সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা ৩০ জনেরও বেশি আফগান নারীর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল।

নারীদের জন্য ক্লাস পুনরায় চালু করার বিষয়ে বারবার করা আবেদনও তালিবান নেতৃত্ব উপেক্ষা করেছে।

ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি বলেন, "বিশ্বকে দেখানোর আশার আলো, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু সুযোগ, এমনকি মেয়েদের জন্য পরিচালিত গোপন স্কুলগুলোও - আসলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যই করা হয়।"

তা সত্ত্বেও সিরাজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংলাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, "তাদের সঙ্গে কথাবার্তায় অংশ নেওয়া উচিত। কিন্তু তাদের এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে, যখন তারা আলোচনায় বসবেন তখন তা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।"

আরও অনেকে একই কথা বলেন।

আফগানিস্তানের একজন সাবেক কর্মকর্তা, যিনি তালেবান কর্মকর্তাদের সঙ্গে পর্দার আড়ালে আলোচনায় যুক্ত ছিলেন, তিনি বলেন, "আরও দক্ষ কূটনীতি এবং নিভৃত ও গোপনীয় আলোচনার মাধ্যমেই কেবল পরিবর্তন আনা সম্ভব।"

তিনি আশা করেন, জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব যিনি আগামী বছরের গোড়ার দিকে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, তিনি এ ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন।

তবে শেষ পর্যন্ত, পরিবর্তনের চাবিকাঠি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে নেই।

আফগানিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আছে, পশ্চিমের এমন একজন বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন, যেমন এই প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া আরও অনেকেই করেছেন।

তিনি বলেন, "আমি মনে করি না যে তালেবানের সঙ্গে আলোচনার ভাষা যা সারা বিশ্ব খুঁজে বেড়াচ্ছে, তার ভেতরেই এই সমাধান লুকিয়ে আছে।"

তিনি আরও বলেন, "পাঁচ বছর পর এটা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে গেছে যে প্রকৃত পরিবর্তন কেবল ভেতর থেকেই আসতে পারে।"

তালেবানের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মাঝে মাঝে সর্বোচ্চ নেতার কঠোরতম নির্দেশাবলী নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

কিছু কর্মকর্তা দ্বিমত পোষণ করেছেন, বিশেষ করে মেয়েদের স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের বিষয়ে।

খুব কম ক্ষেত্রে হলেও, তারা কিছু নিয়ম বাতিল করানোর উপায় বের করতেও সফল হয়েছেন।

এমনই একটি ঘটনা ছিল গত বছর দেশজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া। সেই সিদ্ধান্তের ফলে জনজীবন থমকে যায়। যা পরবর্তীতে প্রত্যাহার করা হয়।

তালেবানের সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশাবলী চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক হিসেবে গণ্য করা হয়। এই গোষ্ঠীটি সর্বদা ঐক্য ও ক্ষমতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।

এমনকি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামী পণ্ডিতদের পক্ষ থেকে করা আহ্বানও সর্বোচ্চ নেতা ও তার অনুসারীদের নেওয়া সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেনি।

বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে তাদের কঠোর অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো সহজ বা দ্রুত সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

নাজিয়ার জ্যাম তৈরির কর্মশালায় একটি টেবিলের ওপর তার প্রশিক্ষণের বেশ কয়েকটি সার্টিফিকেট সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় আফগান সংস্থার দেওয়া সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে বর্তমানে দেশটিতে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউএসএআইডি-এর সার্টিফিকেটও রয়েছে।

এই নথিপত্রগুলো প্রমাণ করে যে, নানাবিধ বিধিনিষেধ ক্রমাগত বাড়তে থাকা সত্ত্বেও একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার প্রচেষ্টায় তিনি অবিচল থেকেছেন।

প্রতি বছরই সমাজের এক নতুন রূপ বা চিত্র সামনে আসে। তা সত্ত্বেও, অনেক আফগান একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় সংগ্রাম ও প্রার্থনা চালিয়ে যাচ্ছেন - এই আশায় যে, বিশ্ব তাদের ভুলে যাবে না।