ডারউইনে কোন পাঁচ মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে হারালো বাংলাদেশ

ছবির উৎস, Getty Images
দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের সে ম্যাচটি যে এতটা ঐতিহাসিক হয়ে উঠবে, তা হয়তো ম্যাচ শুরুর আগে খুব কম মানুষই ভেবেছিলেন।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে থাকা এবং টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই মাটিতে রোববার নয় উইকেটে হারিয়েছে বাংলাদেশ।
আর এ জয় শুধু স্কোরবোর্ডের ব্যবধানেই বড় নয়। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ সময়ই অস্ট্রেলিয়ার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশের।
পেসারদের দুর্দান্ত বোলিং, ব্যাটারদের ধৈর্য, তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরি এবং মেহেদী হাসান মিরাজের কার্যকর স্পিন - সব মিলিয়ে ডারউইনে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।
কিন্তু ঠিক কোন মুহূর্তগুলো ম্যাচের গতিপথ বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল?

ছবির উৎস, Getty Images
প্রথম দিনেই হাসান মাহমুদ ঝড়
ম্যাচের শুরুতেই বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিয়েছিল, তারা শুধু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলতে আসেনি, বরং তারা লড়াই করতেই এসেছে।
টস জিতে ব্যাটিং নেওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে শুরু থেকেই চাপে রাখে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ। সামনে থেকে সেই আক্রমণের নেতৃত্ব দেন হাসান মাহমুদ।
ইনজুরি কাটিয়ে ফিরে আসা এই পেসার গতি, নিয়ন্ত্রিত লাইন ও লেংথ এবং সুইং দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের অস্বস্তিতে ফেলেন।
ফলও আসে দ্রুত।
অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস থামে মাত্র ১৯৮ রানে।
নিজেদের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকে ২০০ রানের নিচে আটকে দেওয়া বাংলাদেশের জন্য ছিল বড় সাফল্য। এখানেই ম্যাচের শুরুতে স্বাগতিকদের ওপর চাপ তৈরি হয়।
সাবেক বাংলাদেশ পেস বোলিং কোচ শন টেইটও পরে বাংলাদেশের পেস আক্রমণের প্রশংসা করেছেন। তার মতে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের পেস বোলিং।
ডারউইনে সেই শক্তির সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিলেন হাসান মাহমুদ।
তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরি
বাংলাদেশের টেস্ট দলে তানজিদ হাসান তামিমকে নিয়ে প্রশ্ন ছিল।
সাদা বলের ক্রিকেটে আক্রমণাত্মক ব্যাটার হিসেবে পরিচিত এই ওপেনার টেস্ট ক্রিকেটে কতটা সফল হতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয়ও ছিল।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সে প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন তানজিদ ব্যাট হাতে।
অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে তিনি খেলেছেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। প্রয়োজন অনুযায়ী আক্রমণ করেছেন, আবার পরিস্থিতি বুঝে ধৈর্যও দেখিয়েছেন।
এর ফল, একটি ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি।

ছবির উৎস, Getty Images
তানজিদের এ ইনিংস শুধু বাংলাদেশের স্কোর বাড়ায়নি, দলের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে একজন তরুণ ওপেনারের এমন ব্যাটিং স্বাগতিকদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করে।
অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশের লিড দাঁড়ায় ২২৮ রান।
মেহেদী হাসান মিরাজের পাঁচ উইকেট
বাংলাদেশের জয়ের শেষ বড় অধ্যায়টি লিখেছেন মেহেদী হাসান মিরাজ।
অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের বোলাররা যখন চাপ তৈরি করে রেখেছেন, তখন সেই চাপকে জয়ে পরিণত করার দায়িত্ব নেন মিরাজ।
বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার নিচের সারির ব্যাটারদের একের পর এক ফিরিয়ে দিয়ে তিনি তুলে নেন পাঁচ উইকেট।
মিরাজের এই বোলিংয়ের পর অস্ট্রেলিয়ার সামনে আর ম্যাচে ফেরার কোনো সুযোগ ছিল না।
বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ১৩ রান।
এরপর আর কোনো নাটক হয়নি।
মাত্র একটি উইকেট হারিয়ে সেই রান তুলে নেয় বাংলাদেশ এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় নিশ্চিত করে।
মিরাজের পাঁচ উইকেটের পর তার উদযাপনও হয়ে ওঠে ম্যাচের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য। দুই হাত ছড়িয়ে তার দৌড় যেন ২৩ বছরের অপেক্ষার শেষ হওয়ার ঘোষণা দিচ্ছিল।

ছবির উৎস, Getty Images
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ব্যর্থতা এবং বাংলাদেশের ধৈর্য
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বাংলাদেশের জয়কে শুধু বাংলাদেশের বোলিং ও ব্যাটিং দিয়ে ব্যাখ্যা করলে গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ব্যর্থতাও এই ম্যাচের বড় কারণ।
প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে অলআউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও বড় স্কোর করতে পারেনি তারা। ওপেনার জেক ওয়েদারাল্ড দুই ইনিংসে করেন ২৩ ও শূন্য রান। মার্নাস লাবুশেনও ভালো শুরু পেয়েও সেটিকে বড় ইনিংসে রূপ দিতে পারেননি।
বাংলাদেশের বোলাররা পুরো ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের ওপর ধৈর্য ধরে চাপ তৈরি করেছেন।
অতিরিক্ত কিছু করার চেষ্টা না করে একই জায়গায় বল করেছেন। ব্যাটারদের ভুল করার জন্য অপেক্ষা করেছেন। আর সুযোগ আসার সঙ্গে সঙ্গে সেটিকে কাজে লাগিয়েছেন।
ম্যাচ শেষে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশ সব বিভাগেই তাদের চেয়ে ভালো খেলেছে।
তার মতে, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা ছিলেন ধৈর্যশীল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। একবার পিছিয়ে পড়ার পর অস্ট্রেলিয়ার জন্য ম্যাচে ফেরাটা কঠিন হয়ে যায়।
এই জায়গাতেই বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের বড় পরিবর্তনটি দেখা গেছে।
আগে বড় দলের বিপক্ষে ভালো শুরু করেও চাপের মুখে ম্যাচ হাতছাড়া করার ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন নয়। ডারউইনে সেই গল্পটা বদলে দিয়েছে বাংলাদেশ।
চাপ তৈরি করেছে তারাই এবং শেষ পর্যন্ত সেই চাপ ধরে রেখেছে।

ছবির উৎস, Robert Cianflone/Getty Images
২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান
ডারউইনের জয় তাই শুধু একটি টেস্ট ম্যাচের জয় নয়।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে গিয়ে বাংলাদেশ হারিয়েছে বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট দলকে। সেটিও ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে।
আর জয়টি এসেছে কোনো একক পারফরম্যান্সে নয়। পুরো দল মিলে।
হাসান মাহমুদের পেস আক্রমণ দিয়ে শুরু। তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরিতে বড় লিড। চাপের মুহূর্তে হাসান মাহমুদের ৭৬ বলের প্রতিরোধ। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজের পাঁচ উইকেট।
এই মুহূর্তগুলো একসঙ্গে মিলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের ভিত তৈরি করেছে।
ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত তাই বলেছেন, এটি বাংলাদেশের যেকোনো ফরম্যাটে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জয়।
ডারউইনে বাংলাদেশ শুধু একটি ম্যাচ জেতেনি।
তারা নিজেদের ওপর বিশ্বাসটাও আরও শক্ত করেছে।
বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষে, তাদের নিজেদের মাটিতেও বাংলাদেশ জিততে পারে।
ডারউইনের এই জয় হয়তো বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের নতুন একটি অধ্যায়ের শুরু হয়ে থাকবে।








