ভারতে আজ তৃতীয় দফার ভোট, বিজেপি কি কিছুটা ব্যাকফুটে?

তৃতীয় দফার ভোটগ্রহণের জন্য গুজরাটের গির অরণ্যে নির্বাচনী কর্মকর্তারা
ছবির ক্যাপশান, দেশে তৃতীয় দফার ভোটগ্রহণের জন্য গুজরাটের গির অরণ্যে নির্বাচনী কর্মকর্তারা
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
  • Published

ভারতে লোকসভা নির্বাচনে মোট সাত দফার ভোটগ্রহণে আজ (মঙ্গলবার) তৃতীয় দফা অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম দুটি পর্বে তুলনামূলকভাবে কম ভোটদানের হার, হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনীতি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ খবরের শিরোনাম জুড়ে থাকলেও তৃতীয় পর্বের শেষে ভারতের নির্বাচনী রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, দেশটি এখন সে দিকেই তাকিয়ে।

আজ দেশের আরও ৯৩টি আসনে ভোটগ্রহণ মিটে গেলে সারা ভারতের ৫৪৩টি আসনের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি আসনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়ে যাবে।

তৃতীয় পর্বের এই ভোটগ্রহণের ঠিক আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ফিরে গেছেন অযোধ্যার রামমন্দিরে, গত জানুয়ারিতে ওই মন্দিরের ‘প্রাণপ্রতিষ্ঠা’ করার পর এই প্রথমবার।

রবিবার (৫ এপ্রিল) তিনি রামমন্দির দর্শন করে পূজা দিয়েছেন, সাষ্টাঙ্গে শুয়ে প্রণাম করেছেন এবং সন্ধ্যাবেলায় অযোধ্যার বিজেপি প্রার্থীর সমর্থনে জমকালো রোড শো-ও করেছেন।

ভারতের বিরোধী দলগুলো তথা ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতারা বলছেন, প্রথম দুই দফার নির্বাচনের পর ‘হাওয়া সুবিধের নয়’, এটা বুঝতে পেরেই প্রধানমন্ত্রী মোদী অযোধ্যায় ফিরে গেছেন এবং রামমন্দিরের ধর্মীয় ভাবাবেগকে নতুন করে উসকে দিয়ে ভোটে ফায়দা লুটতে চাইছেন।

রামমন্দির দর্শনের পর অযোধ্যায় নরেন্দ্র মোদী ও যোগী আদিত্যনাথের রোড শো। রবিবার, ৫ এপ্রিল
ছবির ক্যাপশান, রামমন্দির দর্শনের পর অযোধ্যায় নরেন্দ্র মোদী ও যোগী আদিত্যনাথের রোড শো। রবিবার, ৫ এপ্রিল

ক্ষমতাসীন বিজেপির শীর্ষ নেতারা যথারীতি এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে পাল্টা আক্রমণ শানাচ্ছেন কংগ্রেসকে।

উত্তরপ্রদেশে একদা কংগ্রেসের ‘খাসতালুক’ হিসেবে পরিচিত রায়বেরিলি ও আমেথি আসনে দলের হয়ে কারা লড়বেন, সেই সিদ্ধান্ত একেবারে শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত ঝুলিয়ে রেখে কংগ্রেস সেখানে যে প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত করেছে সেটাও বিজেপির আক্রমণের মুখে পড়েছে।

ওই দুটো আসনের কোনওটিতেই যেহেতু প্রিয়াঙ্কা গান্ধী শেষ পর্যন্ত লড়ছেন না – এবং কেরালার ওয়েনাডের পর রাহুল গান্ধী দ্বিতীয় আসন হিসেবে রায়বেরিলিকে বেছে নিয়েছেন, তাই বিজেপি বলছে গান্ধী পরিবার নিশ্চিত হার টের পেয়েই এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

ওদিকে পশ্চিমবঙ্গে সন্দেশখালিতে নারী নির্যাতনের যে ইস্যুতে রাজনৈতিক ঝড় উঠেছিল, তাতে একটি নতুন ‘স্টিং অপারেশন’ এবং রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোসের বিরুদ্ধে একজন তরুণীকে যৌন লাঞ্ছনার অভিযোগ ওই রাজ্যে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে।

সন্দেশখালিতে নারীদের ধর্ষণের অভিযোগ বিজেপির ‘সাজানো নাটক’ এবং কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের নিযুক্ত রাজ্যপাল একজন নারী নির্যাতনকারী – এই মর্মে এখন জোরালো প্রচার চালাচ্ছেন মমতা ব্যানার্জী-সহ তৃণমূলের নেতা-নেত্রীরা।

মা সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে রায়বেরিলি কেন্দ্রে মনোনয়ন জমা দিতে যাচ্ছেন রাহুল গান্ধী। শনিবার, ৪ এপ্রিল
ছবির ক্যাপশান, মা সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে রায়বেরিলি কেন্দ্রে মনোনয়ন জমা দিতে যাচ্ছেন রাহুল গান্ধী। শনিবার, ৪ এপ্রিল

এরকম একটা রাজনৈতিক ঘটনাবহুল পটভূমিতেই ভারতে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে তৃতীয় দফার ভোট – যাতে ৯৩টি আসনে মোট ১৩৫১জন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারিত হবে।

কোথায় কোথায় ভোট, কাদের প্রাধান্য?

ভারতে আজ ভোটগ্রহণ হচ্ছে দশটি রাজ্য ও দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মোট ৯৩টি লোকসভা আসনে।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আজ আসলে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল মোট ৯৪টি আসনে।

কিন্তু গুজরাটের সুরাট আসনে বিজেপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে কংগ্রেস প্রার্থী-সহ যে আটজন দাঁড়িয়েছিলেন, তারা সবাই ‘নানা কারণে’ নিজেদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

ফলে সুরাটের বিজেপি প্রার্থী মুকেশ দালালকে ইতিমধ্যেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়ে গেছে, সুরাটেও ভোট করানোর প্রয়োজন হচ্ছে না।

বাকি যে ৯৩টি আসনে ভোট হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে গুজরাটে ২৫টি, কর্নাটকে ১৪টি, মহারাষ্ট্রে ১১টি, উত্তরপ্রদেশে ১০টি, মধ্যপ্রদেশে ৯টি, ছত্তিশগড়ে ৭টি, বিহারে ৫টি, পশ্চিমবঙ্গে ৪টি, আসামে ৪টি ও গোয়াতে ২টি আসন।

এছাড়া দাদরা নগর হাভেলি এবং দমন ও দিউ – এই দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের দুটি আসনেও আজ ভোটগ্রহণ চলছে।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে সুরাট-সহ মোট এই ৯৪টি আসনের মধ্যে ৮১টিই গিয়েছিল বিজেপি জোট এনডিএ-র দখলে।

হিন্দুদের দেবতা রামচন্দ্রের সঙ্গেই নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহর কাট-আউট। আহমেদাবাদ
ছবির ক্যাপশান, হিন্দুদের দেবতা রামচন্দ্রের সঙ্গেই নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহর কাট-আউট। আহমেদাবাদ
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

অন্য দিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট পেয়েছিল এর মধ্যে মাত্র ১১টি আসন। এছাড়া আসামের একটি আসনে আর দমন ও দিউ আসনে অন্য ছোট দলের বা নির্দল (স্বতন্ত্র) প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন।

ফলে এবারে তৃতীয় দফার নির্বাচনে দেশের যে সব জায়গায় ভোট হচ্ছে, সেগুলো বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা অনেকে আবার বলছেন, এর মধ্যে বহু রাজ্য আছে যেখানে বিজেপি ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ সংখ্যক আসনে জিতে বসে আছে – যেখান থেকে আর আসনসংখ্যা বাড়ার কোনও সুযোগ নেই, বরং কমলেও কমতে পারে।

সেফোলজিস্ট ও রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্ট যোগেন্দ্র যাদব যেমন পরিষ্কার বলছেন, তার ধারণা কর্নাটক, মহারাষ্ট্র ও বিহারের মতো রাজ্যগুলো এই নির্বাচনে সত্যিকারের ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেট’ – আর সেখানে বিজেপির আসনসংখ্যা কমার সম্ভাবনা ষোলো আনা।

কংগ্রেস মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনেতও দাবি করছেন, “এই কোণঠাসা অবস্থাটা আঁচ করতে পেরেছেন বলেই প্রধানমন্ত্রী মোদী নির্লজ্জভাবে আরও একবার রামমন্দির তাস খেলার মরিয়া চেষ্টায় নেমেছেন।”

কংগ্রেস আরও বলছে, ভারতের রাজনীতিতে বা ভোটের প্রচারে ধর্মের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তা সত্ত্বেও দেশের নির্বাচন কমিশন সব দেখেশুনেও প্রধানমন্ত্রী বা শাসক দলের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ হাত গুটিয়ে বসে আছে।

বিজেপির মুখপাত্র শেহজাদ পুনাওয়ালা আবার পাল্টা দাবি করছেন, ব্যাকফুটে তারা নন – বরং কংগ্রেসই!

উত্তরপ্রদেশে নির্বাচনী প্রচারে কংগ্রেসের প্রিয়াঙ্কা গান্ধী
ছবির ক্যাপশান, উত্তরপ্রদেশে নির্বাচনী প্রচারে কংগ্রেসের প্রিয়াঙ্কা গান্ধী

“গান্ধী পরিবারের ‘শাহজাদা’ রাহুল গান্ধী যেভাবে কেরালার ওয়েনাডে হার নিশ্চিত বুঝে এবং আমেঠিতে স্মৃতি ইরানির মোকাবিলা করার সাহস নেই বলে মায়ের আসন রায়বেরিলিতে লড়তে চলে এলেন - তা থেকেই তো বোঝা যাচ্ছে কারা চাপে আছে”, বলছিলেন মি পুনাওয়ালা।

তবে দেশের দুই প্রধান দলের এই বাগবিতন্ডার মধ্যে থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার – প্রথম দফার ভোটের আগেও দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ যে নিরুত্তাপ ছিল তা কিন্তু এখন আর নেই, বরং দেশ জুড়ে তাপপ্রবাহের মতো রাজনৈতিক পারদও কিন্তু চড়তে শুরু করেছে।

লড়ছেন অমিত শাহ, আজমল, সিন্ধিয়া

ভারতে আজকের তৃতীয় দফার ভোটে রাজনৈতিকভাবে ওজনদার ও হাই-প্রোফাইল বেশ কয়েকজন প্রার্থী লড়াইতে আছেন। পার্লামেন্টে তারা যেতে পারবেন কি না, সেটার ফয়সালা এদিনই হয়ে যাবে – যদিও সেই ফলাফল জানা যাবে আগামী ৪ঠা জুন।

এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা নরেন্দ্র মোদি ক্যাবিনেটের ‘অঘোষিত দু’নম্বর’ ব্যক্তি অমিত শাহ।

তিনি পুনর্নিবার্চিত হওয়ার জন্য লড়ছেন গুজরাটের গান্ধীনগর আসন থেকে, যেখান থেকে এক সময় লড়তেন ও বহুবার জিতে এমপি হয়েছিলেন বিজেপির বর্ষীয়ান নেতা লালকৃষ্ণ আডভানি।

আসামের ধুবড়ি আসন থেকে লড়ছেন এইউডিএফ দলের প্রধান, বর্তমান এমপি ও শিল্পপতি বদরুদ্দিন আজমল। ‘আজমল’ ব্র্যান্ডের নামে সুগন্ধী ও আতর বানায় যে সংস্থাটি, তিনি আবার তার কর্ণধারও বটে।

বিশেষভাবে মুসলিম সমাজের স্বার্থরক্ষার জন্য গঠিত যে কয়েকটি আঞ্চলিক দল ভারতে মোটামুটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে, আসামের এইউডিএফ তার একটি।

আসামে নির্বাচনী প্রচারে বদরুদ্দিন আজমল
ছবির ক্যাপশান, আসামে নির্বাচনী প্রচারে বদরুদ্দিন আজমল

ধুবড়িতে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ভোটারই মুসলিম, ফলে ওই আসনে বদরুদ্দিন আজমলের জয় একরকম নিশ্চিত বলেই তার দল দাবি করছে।

মধ্যপ্রদেশের গুনা আসন থেকে লড়ছেন বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। গোয়ালিয়র রাজপরিবারের এই সন্তান বছর কয়েক আগে কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার ফলেই মধ্যপ্রদেশে বিজেপি তখন কংগ্রেসের নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দিতে পেরেছিল।

মধ্যপ্রদেশেরই বিদিশা আসন থেকে লড়ছেন রাজ্যে বহু বছর মুখ্যমন্ত্রী থাকা শিবরাজ সিং চৌহান – যিনি গত বছর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে জিতিয়েও মুখ্যমন্ত্রীর পদ আর ফিরে পাননি।

বিদিশা থেকে জিতলে বিজেপি তাকে নিশ্চিতভাবেই রাজ্য থেকে সরিয়ে দিল্লির রাজনীতিতে নিয়ে যাবে। এই বিদিশা আসনেই এক সময় জিতেছেন অটলবিহারী বাজপেয়ী বা সুষমা স্বরাজের মতো দলের হেভিওয়েটরা।

কর্নাটকের শিমোগা আসনটিতেও এবার সবার নজর থাকছে জোরদার ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে।

কর্নাটকের ইয়েদিরাপ্পা পরিবারের ‘গড়’ বলে পরিচিত শিমোগায় এবার লড়ছেন প্রবীণ বিজেপি নেতা বিএস ইয়েদিরাপ্পার ছেলে বি ওয়াই রাঘবেন্দ্র। তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন কংগ্রেসের গীতা শিবরাজকুমার – যিনি কন্নড় ফিল্মের সুপারস্টার ড: শিবরাজকুমারের স্ত্রী এবং রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এস বঙ্গারাপ্পার কন্যা।

বিজেপির টিকিট না-পেয়ে দলের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ’ করে শিমোগাতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কে ঈশ্বরাপ্পাও। তবে তিনি আবার ভোটের প্রচার করছেন নরেন্দ্র মোদীর ছবি সামনে রেখেই!