হংকংয়ে গণতন্ত্রপন্থী মিডিয়া টাইকুন জিমি লাই-এর ২০ বছরের জেল

আন্তর্জাতিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মি. লাইয়ের কারাদণ্ডকে 'কার্যত একটি মৃত্যুদণ্ড' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
ছবির ক্যাপশান, আন্তর্জাতিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মি. লাইয়ের কারাদণ্ডকে 'কার্যত একটি মৃত্যুদণ্ড' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

হংকং-এর একটি আদালত দেশটির গনতন্ত্রপন্থী মিডিয়া টাইকুন জিমি লাই-কে কুড়ি বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। গত ডিসেম্বরে তাকে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।

ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী লাই এর আগে পৃথক একটি ঔপনিবেশিক আইনের আওতায় রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে সাজা পেয়েছিলেন। তার পরিবার কারাগারে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

মি. লাই আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং তার সমর্থকদের অনেককে আদালতের বাইরে রাতভর অবস্থান করেছেন। ২০২০ সাল থেকেই তিনি বিভিন্ন অভিযোগে জেলে আছেন।

আন্তর্জাতিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মি. লাইয়ের কারাদণ্ডকে 'কার্যত একটি মৃত্যুদণ্ড' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সংস্থাটি বলেছে, "এমন দীর্ঘমেয়াদি একটি সাজা একই সঙ্গে একটি নিষ্ঠুরতা ও অন্যায়'।

"লাই-এর ওপর বছরের পর বছর চালানো নিপীড়ন চীনা সরকারের স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ধ্বংস করা এবং যারা কমিউনিস্ট পার্টির সমালোচনা করে তাদের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টারই বহি:প্রকাশ," বলেছেন সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলাইন পিয়ারসন।

ওদিকে মি. লাই-এর ছেলে সেবাস্টিয়ান বলেছেন, ব্রিটিশ সরকার তার বাবার মুক্তির জন্য যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি।

তিনি এমন সময় এই অভিযোগ করেছেন যখন মাত্র কয়েকদিন আগেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার বেইজিং সফর করেছেন।

যুক্তরাজ্যের জোরপূর্বক আটক ও জিম্মি বিষয়ক পার্লামেন্টারি গ্রুপও এক বিবৃতিতে বলেছে দুর্বল কূটনীতির কারণে তার মুক্তি নিশ্চিত করার একটি সুযোগ হাতছাড়া হলো।

জিমি লাই ২০২০ সাল  থেকেই বিভিন্ন অভিযোগে জেলে আছেন।
ছবির ক্যাপশান, জিমি লাই ২০২০ সাল থেকেই বিভিন্ন অভিযোগে জেলে আছেন

আদালত যা বলেছে

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

আদালত জিমি লাই-এর অপরাধকে গুরুতর ও পূর্বপরিকল্পিত বলে উল্লেখ করেছে। পুরো রায়টি ৪৭ পৃষ্ঠার হলেও আদালত তার পুরোটা না পড়ে শুধু সাজার অংশটুকু পড়ে শুনিয়েছেন। ফলে মাত্র ৩০ মিনিটেই রায় পড়া শেষ হয়।

মি. লাইকে এ সময় শান্তভাবে ও হাসিমুখে মাথা নাড়তে দেখা গেছে। সাদা জ্যাকেট ও কালো সানগ্লাস পরিহিত জিম লাই ছাড়াও তার আপল ডেইলি নিউজপেপারের ছয়জন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ আদালতে ছিলেন।

তাদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে।

আদালতে বিচারকরা তাদের রায়ে বলেছেন, অন্য কিছু বিষয়ের পাশাপাশি লাই-এর অপরাধগুলো ছিল 'গুরুতর" এবং যে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে তা 'সবচেয়ে গুরুতর' শ্রেণির মধ্যে পড়ে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, বিচারকদের মতে বিদেশি শক্তির সঙ্গে আঁতাতের এসব ষড়যন্ত্র ছিল 'সুপরিকল্পিত এবং পূর্বপরিকল্পিত'।

জিমি লাই সবসময় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন।

ওদিকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় দেওয়া মি. লাইয়ের সাজাকে 'কঠিনতম সাজা' হিসেবে বর্ণনা করছেন অনেকে।

এই আইনের আওতায় সাবেক আইনবিদ বেনি তাইকে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ১০ বছরের জেল দেওয়া হয়েছিল।

৬০ বছর বয়সী এই ব্যক্তি লেজিসলেটিভ কাউন্সিল একটি নির্বাচনের জন্য অনানুষ্ঠানিক 'প্রাইমারি' আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার পর তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছির রাষ্ট্রক্ষমতা ক্ষুণ্ণ করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে।

আদালত বলেছে, মি. লাই অসুস্থ হলেও শুধু সেই কারণ দেখিয়ে তার শাস্তি কমাতে তারা রাজী নন। কারণ আদালতের মতে, যেসব অপরাধ খুব গুরুতর, সেসব ক্ষেত্রে শারীরিক অসুস্থতা সাধারণত সাজা কমানোর কারণ হয় না।

লাই-এর আইনজীবী বলেছেন, তিনি উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসসহ কয়েকটি রোগে ভুগছেন, কিন্তু আদালত তার মুক্তির জন্য এসব কারণকে যথেষ্ট বলে বিবেচনা করেনি ।

হংকং এর আদালতে কারাদণ্ড হয়েছে গণতন্ত্রপন্থী জিমি লাই -এর।
ছবির ক্যাপশান, হংকং এর আদালতে কারাদণ্ড হয়েছে গণতন্ত্রপন্থী জিমি লাই -এর।

'কফিনে শেষ পেরেক'

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে) এক বিবৃতিতে জিমি লাই-এর বিশ বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

"হংকংয়ে আইনের শাসন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে," বলেছেন কমিটির সিইও জোডি গিনসবার্গ।

আজকের এই জঘন্য রায়টি হংকংয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিল।

সারা বিশ্বে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে হলে আন্তর্জাতিক মহলকে জিমি লাইয়ের মুক্তির জন্য আরও জোরালো চাপ দিতে হবে।

সিপিজে সাংবাদিকদের টার্গেট না করা এবং যেসব সাংবাদিক জেলে আছে তাদের মুক্তির জন্য হংকং কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানিয়েছে।

সংস্থাটির হিসেবে চীনে এখন কমপক্ষে ৫১ জন সাংবাদিক জেলে আছে এবং হংকংয়ে আছে ৮ জন।

জিমি লাইকে হংকংয়ে তার সমর্থকদের অনেকে স্বাধীনতার রক্ষক মনে করেন।
ছবির ক্যাপশান, জিমি লাইকে হংকংয়ে তার সমর্থকদের অনেকে স্বাধীনতার রক্ষক মনে করেন

জিমি লাই কে?

চীনের ২০২০ সালে প্রবর্তিত জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে মামলা হওয়া সবচেয়ে সুপরিচিত ব্যক্তি হলেন ৭৮ বছর বয়সী জিমি লাই হলেন । এই আইন তৈরি করা হয়েছিল ২০১৯ সালের হংকংয়ের গণতান্ত্রিক বিক্ষোভের পর।

মি. লাইকে হংকংয়ে অনেকে স্বাধীনতার রক্ষক মনে করেন, কিন্তু বেইজিং তাকে চীনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।

চীনের গুয়াংজুতে জন্ম নেওয়া জিমি লাই বার বছর বয়সে হংকংয়ে এসেছিলেন। পরে এক পর্যায়ে তিনি জনপ্রিয় পোশাক ব্রান্ড 'গিয়র্দানো'সহ কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেন।

পাশাপাশি তিনি নেক্সট ম্যাগাজিন ও আপল ডেইলির মতো গনতন্ত্রপন্থী সংবাদমাধ্যম চালু করেন এবং ১৯৮৯ সালে বেইজিংয়ের তিয়েনআননে স্কয়ারের গণতান্ত্রিক বিক্ষোভ দমনের পর তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কণ্ঠ হয়ে উঠেন।